
শেষ আপডেট: 30 December 2023 13:47
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একটা কথা অনেকেই খোঁজ রাখেন না। কলকাতা থেকে ত্রিপুরার আগরতলা বা বাগডোগরার বিমানের টিকিটের সঙ্গে লখনউর টিকিটের দামের বিশেষ ফারাক অনেক সময়েই থাকে না। আগে থেকে টিকিট কাটলে আড়াই হাজার টাকাতেও পাওয়া যায়।
নবাবি লখনউতে ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখা যায়। বড়া ইমামবারা, ছোটা ইমামবারা, রুমি দরওয়াজা, হজরতগঞ্জ, রেসিডেন্সি, কনস্টানশিয়া হাউজ রোদ গায়ে মেখে বসে থাকে সারা বছর। আর বাঙালির তো লখনউর উপর হক আছে। শেষ বয়সে নবাব ওয়াজেদ আলি শা তো কলকাতাতেই ছিলেন। কাকোরি, গালাউটির মতো কাবাবের ছোট কর্তা, বড় কর্তাদের তিনিই আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন বাংলার সঙ্গে। উপরি ছিল নবাবি বিরিয়ানি ও তার মশলাও।
এটা ঠিক যে গালাউটির সঙ্গে উল্টে তাওয়ার পরোটা ছাড়া অন্য কোনও কম্বিনেশন অনেকেই ভাবতেই পারেন না। তবে কাবাবের সঙ্গে অকৃত্রিম প্রেম রয়েছে শিরমলেরই। সুদূর পারস্যে যেখানে আরব রাতে হাজার কাহিনী লেখা হয়েছিল, সেখানেই এই প্রেম কথার শুরু। লখনউতে গোটা একটা গলিই উৎসর্গ করা হয়েছে শিরমলের জন্য। আকবরি গেটের কাছে চাওল ওয়ালি গলিকেই বলা হয় শিরমল ওয়ালি গলি।
শীরমল প্রথাগত ভাবে তৈরি হয় দুধ বা ক্ষীর দিয়ে। শিরমলের মূল মণ্ডটি তৈরি হয় আটা আর ঘি দিয়ে। সঙ্গে কিছুটা ইস্ট। তার পর স্বাদ ও পছন্দমতো এতে আরও উপকরণ মেশানো হয়। সেই আটার লেচি বেলে এর পর সেঁকা হয় লোহার তন্দুরে। তন্দুরের দেওয়ালে একটু দুধও ছেঁটানো হয়, তাতে মেশানো থাকে এলাচ ও কেশর। কাবাব আর নাহারির সঙ্গে শিরমলের স্বাদ স্বর্গীয়। তবে এই রুটি স্বাদে কিছুটা মিষ্টি হওয়ায় অনেকে সকালের চা দিয়েও খান।
View this post on Instagram
শীরমলের আবার প্রকারভেদ রয়েছে। রোজকার খাওয়ার শীরমল (Everyday Sheermal) বানানোর জন্য খুব বেশি পরিশ্রম করা হয় না। দুধ, ক্ষীর দিয়ে মেখে সেই আটার রুটি সেঁকে নেওয়া হয় তন্দুরে। এই রোজকারের শীরমলের মধ্যে বাক্কারখানি (Bakkarkhani Sheermal) আবার হল এক্সেল সাইজের। অন্তত ১০ ইঞ্চি হয় তার ব্যাস।
আবার মহরমের সময়ে অনেকে খুব পাতলা শীরমল বানান। সেটিকে বলা হয় হাজরি শীরমল (Hazri Sheermal)।
তবে শীরমলের মধ্যে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও স্বাদু হল জাফরানি শীরমল (Zafrani Sheermal)। এতে কেশর দেওয়া থাকে। তাই এর রঙ ঈশৎ হলুদ। দেখেই প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতো। কাবাবের সঙ্গে এই জাফরানি শীরমলের স্বাদ অনবদ্য।
শীরমল ওয়ালি গলিতে সবচেয়ে পুরনো দোকান আলি হুসেনের। ইদ্রিস বিরিয়ানের কাছেই এই শীরমলের দোকান। এই ইদ্রিস শুধু বিরিয়ানির জন্য বিখ্যাত নয়, এর কাবাব ও কোর্মারও খ্যাতি রয়েছে।
তবে অনেকের মতে, ইদানীং ইদ্রিসের থেকেও ভাল বিরিয়ানি, কোর্মা ও কাবাব বানাচ্ছে শাবান ননভেজ কর্নার। শাবান ছাড়াও কাছেই রয়েছে মুবীন। এই কাবাবের দোকানও এখন বেশ পপুলার।
এই গলিতে শীরমলের বেশ কয়েকটি দোকান রয়েছে। যেমন, সলমন শীরমলওয়ালে। তবে শীরমলের শিরোপা রয়েছে এক জনের মাথাতেই। তিনি আলি হুসেন জেইনবিয়া। লখনউর খানদানি পরিবারের লোকজনও বলেন, শহরের পাঁচ তারা হোটেলও ফুটপাতের দোকানে তৈরি এই শিরমলের কাছে ফিকে পড়ে যাবে। ১৯০ বছর হয়ে গিয়েছে এই দোকানের। সাত প্রজন্ম ধরে শুধু শীরমল বানিয়ে চলেছে এই পরিবার। এখন যার ব্যটন মহম্মদ উমরের হাতে। লোকে বলে রুটিতে জাফরান আর ঘি দুধের ছাড়াও যেন এক অদৃশ্য স্নেহ মাখিয়ে দেয় হুসেন পরিবার। সেই স্বাদ অনাবিল, অবিষ্মরণীয়।