বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস আসলে ফুটবলের ইতিহাসেরই প্রতিচ্ছবি। ছোট শুরু, বড় স্বপ্ন, নাটকীয় ঘটনা, নিরাপত্তা আর ঐতিহ্যের বিকাশ।

বিশ্বকাপ ট্রফি
শেষ আপডেট: 12 January 2026 18:20
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফুটবল দুনিয়ায় যত ট্রফি আছে, তার মধ্যে একটা এক্কেবারে আলাদা। ঝকঝকে সোনায় মোড়া, কোটি কোটি স্বপ্নের ভার বইছে যে কাপ—সেটাই ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি (FIFA World Cup Trophy)। চার বছর অন্তর গোটা পৃথিবী যার দিকে তাকিয়ে থাকে, সেই ‘আসল কাপ’ কিন্তু খেলোয়াড়রা সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে যান না। তাঁরা তোলেন, চুমু খান, উদযাপন করেন—তারপর ফেরত দিতে হয়। বদলে হাতে আসে নিখুঁতভাবে বানানো সোনালি রেপ্লিকা।
এই ট্রফির ইতিহাস শুধু ফুটবলের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে শিল্প, রাজনীতি, চুরি, রহস্য আর বারবার নিয়মবদলের গল্প।
জুলে রিমে ট্রফি: গৌরব আর জনশ্রুতি
বিশ্বকাপ ট্রফির প্রথম অধ্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৩০ সালে। তখনকার ফিফা (FIFA) প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে-র উদ্যোগেই সামনে আসে এই ট্রফি। শুরুতে নাম ছিল ‘ভিক্টরি’ (Victory)। পরে তাঁর সম্মানেই নাম হয় জুলে রিমে ট্রফি (Jules Rimet Trophy)। যার নকশা এঁকেছিলেন ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্লর। গ্রিক দেবী নাইকি হাতে কাপ তুলে ধরছেন—এমন মোটিফ-খচিত স্মারকের উচ্চতা ছিল ৩৫ সেন্টিমিটার, ওজন প্রায় ৩.৮ কেজি। খাঁটি সোনা নয়, সোনালি প্রলেপ দেওয়া রুপোর কাপ। নিচে নীল রঙের ল্যাপিস লাজুলি পাথর। তখন নিয়ম ছিল—যে দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিতবে, তারা এই ট্রফির স্থায়ী মালিক।
এই ট্রফির ইতিহাস নাটকে ভরা। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ডে প্রদর্শনীর সময় চুরি যায়। দেশজুড়ে হইচই। শেষ পর্যন্ত এক পোষা কুকুর—পিকলস—বাগানের ঝোপে খবরের কাগজে মোড়া কাপটি খুঁজে পায়। এহেন অদ্ভুত ঘটনা ট্রফিকে প্রায় রূপকথার ঐশ্বর্য এনে দিয়েছে।
১৯৭০ সাল। ব্রাজিল তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জেতে। নিয়ম অনুযায়ী ট্রফিটি পাকাপাকিভাবে প্লেনে করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্য তখনও তাড়া করছে। ১৯৮৩ সালে রিও ডি জেনেইরো থেকে ট্রফিটি আবার চুরি যায়। এবার আর ফেরেনি। কোনও দিন নয়! লোকমুখে ধারণা, কাপ নেই। গলিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে! আজ জুলে রিমে ট্রফির স্মৃতি বলতে শুধু তার বেসটুকুই টিকে, যা ২০১৫ সালে ফিফার এক স্টোররুম থেকে উদ্ধার করা হয়।
নতুন যুগ, নতুন ট্রফি: ১৮ ক্যারেট সোনার বিশ্বকাপ
জুলে রিমে-র আভা নিভে যাওয়ার পর ফিফার দরকার পড়ল নতুন এক ট্রফির। এর জন্য ১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক নকশা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সাতটি দেশ থেকে ৫৩টি নকশা জমা পড়ে। জয়ী ইতালির শিল্পী সিলভিও গাজানিগা। তাঁর স্কেচে ফুটে ওঠে দুই মানব অবয়ব—উল্লাসে পৃথিবীকে তুলে ধরছে। শক্তি, গতি আর জয়ের মুহূর্তকে ফুটিয়ে তোলাই ছিল মূল ভাবনা।
সেই নকশা মেনে বানানো হয় ট্রফি। উচ্চতা ৩৬.৮ সেন্টিমিটার, ওজন ৬.১৭৫ কেজি। কাজে লাগে ১৮ ক্যারেট খাঁটি সোনা। বেসে সবুজ মালাকাইট পাথরের দুই স্তর। নিছক ‘কাপ’ নয়—এই ট্রফি একটি নান্দনিক শিল্পকর্ম। যা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে এবার নিয়ম বদলানো হয়। ফিফার নির্দেশ: এই কাপ আর কোনও দেশ পাকাপাকিভাবে রাখতে পারবে না। আসল ট্রফি থাকবে ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থার মালিকানায়, সুইৎজারল্যান্ডের ফিফা ওয়ার্ল্ড ফুটবল মিউজিয়ামে।
আসল ট্রফি নয় কেন? রেপ্লিকার রহস্য
ফাইনালের দিন জয়ী দল আসল ট্রফিটাই তোলে। সেই ছবি ইতিহাসে থেকে যায়। কিন্তু উৎসব শেষ হলে খেতাব ফেরত দিতে হয়। বদলে বিজয়ী দল পায় সোনালি প্রলেপ দেওয়া ব্রোঞ্জের রেপ্লিকা। যেখানে খোদাই করা থাকে—কোন দেশ, কোন বছরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে—তার খতিয়ান। ক্লাব অফিস, মিউজিয়াম বা ফেডারেশন ভবনে সেই ট্রফিই রেখে দেওয়া হয়।
আসল কাপ খুব কম সময়ই বাইরে আসে—বিশ্বকাপ ড্র, ফাইনাল ম্যাচ আর অফিসিয়াল ফিফা ট্রফি ট্যুর (FIFA World Cup Trophy Tour) ছাড়া প্রায় কখনও নয়। কারণ পরিষ্কার—এর আর্থিক মূল্য অস্বাভাবিক চড়া, ঐতিহাসিক মূল্য তার থেকেও কয়েক গুণ বেশি।
শুধু ধাতু নয়, বিশ্বজোড়া স্বপ্ন
বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস আসলে ফুটবলের ইতিহাসেরই প্রতিচ্ছবি। ছোট শুরু, বড় স্বপ্ন, নাটকীয় ঘটনা, নিরাপত্তা আর ঐতিহ্যের বিকাশ। জুলে রিমে-র চুরি আর হারিয়ে যাওয়া আমাদের শিখিয়েছে—রোম্যান্টিসিজ়মের সঙ্গে নিরাপত্তা জরুরি। সেই ভুল থেকেই জন্ম নিয়েছে ১৮ ক্যারেটের সাম্প্রতিকতম ট্রফি। চার বছর অন্তর কোটি কোটি ফুটবলার আর সমর্থকের স্বপ্ন গিয়ে আটকে থাকে ওই সোনালি অবয়বে। কেউ তোলে আসলটা, কেউ ঘরে রাখে রেপ্লিকা। কিন্তু অর্থ একটাই—বিশ্বজয়ের স্বীকৃতি।