হোম অ্যাডভান্টেজ, নতুন প্রযুক্তি আর বিপুল মার্কেটিং বাজেট থাকলেও, একটিমাত্র ভুল বা ভুল বার্তা সব হিসেব ওলটপালট করে দিতে পারে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 2 January 2026 18:23
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ (FIFA World Cup) শুরু হলে চোখ থাকবে শুধু ট্রফির দিকেই—এমনটা ভাবা ভুল। মাঠের বাইরেও চলবে সমান দ্বন্দ্ব। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়বে দু’টি স্পোর্টসওয়্যার জায়ান্ট—নাইকি আর অ্যাডিডাস। কে বেশি জার্সি বিক্রি করবে, বেশি করে তরুণকে কাছে টানবে, ফ্যাশন আর পারফরম্যান্স—দু’টোই একসঙ্গে মেলাতে পারবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে আগামী গ্রীষ্মের বিশ্বকাপে। ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণ বলছে, এই লড়াইয়ে আপাতত এগিয়ে নাইকি। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, আসল ‘ম্যাচ’ এখনও শুরুই হয়নি!
হোম অ্যাডভান্টেজ নাইকির
এই বিশ্বকাপ বসছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—নাইকির ‘হোম মার্কেট’-এ। উত্তর আমেরিকাই তাদের সবচেয়ে বড় বাজার, যেখানে মোট বিক্রির ৪০ শতাংশের বেশি আসে। সাম্প্রতিক আর্থিক বছরে এই অঞ্চলে নাইকির মুনাফা আবার চড়তে শুরু করেছে—যা সংস্থার জন্য বড় স্বস্তি। উপরন্তু, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা জাতীয় দলের স্পনসরও তারা। ফলে চোখে পড়ার আর প্রভাব—দুই-ই তাদের হাতে।
নাইকির বর্তমান সিইও এলিয়ট হিল (Elliott Hill) ২০২৪ সালের অক্টোবরে দায়িত্ব নিয়েছেন। নতুন পণ্য ডিজাইন থেকে দোকানের তাক পর্যন্ত পৌঁছতে সাধারণত ১৮ মাস সময় লাগে। সেই হিসেবে ছাব্বিশের বিশ্বকাপ তাঁর প্রথম বড় পরীক্ষা। নাইকি ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, এই টুর্নামেন্টে তারা নতুন ‘এরো-ফিট’ কুলিং ফ্যাব্রিক আনছে—যাকে হিল বলেছেন ‘শরীরের জন্য এয়ার কন্ডিশনিং’। তীব্র গরমে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স ধরে রাখতেই এমন প্রযুক্তি।
এ ছাড়াও নতুন টিয়েম্পো বুট, যা পরছেন ব্রাজিলের উদীয়মান তারকা এস্তেভাও উইলিয়ান (Estevao Willian), আর গোলকিপার-অনুপ্রাণিত স্ট্রিটওয়্যার কালেকশন ‘হলিউড কিপার্স’—সব মিলিয়ে নাইকি চাইছে মাঠ আর মাঠের বাইরের ফ্যাশনকে এক সুতোয় বাঁধতে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু এই বিশ্বকাপ থেকেই সংস্থার অতিরিক্ত আয় হতে পারে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার!
অ্যাডিডাসের ঐতিহ্য বনাম নাইকির তারকা-রাজনীতি
তবে ফুটবল মানেই অ্যাডিডাস—এই ধারণাটা এখনও অনেকের মাথায় গেঁথে। ইতিহাস, ঐতিহ্য আর খেলাটার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক—এই তিনটে অ্যাডিডাসের শক্তির জায়গা। ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বলও বানাচ্ছে তারাই।
সিইও বোয়েরেন গুলডেন (Bjoern Gulden) জানেন, ফুটবল পারফরম্যান্স গিয়ারের বাজারে লড়াই কঠিন। তাই তিনি খেলাধুলোর পোশাককে আরও স্টাইলিশ করে তুলতে চাইছেন। কৌশল স্পষ্ট—অ্যাডিডাস অরিজিনালস, যেটা এতদিন ক্যাজুয়াল বা লাইফস্টাইল ফ্যাশনের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তাকে পারফরম্যান্স স্পোর্টসের সঙ্গে মেলানো। অর্থাৎ, জার্সি কিনতে না চাইলেও, অনেকেই যেন দলের রঙে স্নিকার্স কিনতে আগ্রহী হন। জামাইকার মতো দলের ক্ষেত্রে এই রঙিন কালেকশন বিক্রির বড় সুযোগ দেখছে অ্যাডিডাস। গালডেনের দাবি, বিশ্বকাপ থেকে অ্যাডিডাসের বিক্রি হতে পারে প্রায় এক বিলিয়ন ইউরো।
মাঠে নামছে আরও অনেক ব্র্যান্ড
এই লড়াই কিন্তু শুধু নাইকি বনাম অ্যাডিডাসে আটকে নেই। পুমা পর্তুগাল দলকে স্পনসর করছে। নতুন সিইও আর্থার হোল্ডের লক্ষ্য—পুমাকে বিশ্বের সেরা তিন স্পোর্টস ব্র্যান্ডের একটায় পরিণত করা। পাশাপাশি স্কেচার্সও (Skechers) ফুটবলে ঢুকে পড়েছে, হ্যারি কেনকে স্পনসর করে তারা। নিউ ব্যালান্স (New Balance) বুকায়ো সাকার সঙ্গে যুক্ত। এমনকি রিবকও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে।
এই সব ‘চ্যালেঞ্জার ব্র্যান্ড’ বিশ্বকাপকে ব্যবহার করবে নিজেদের নাম ছড়াতে। তারকাকেন্দ্রিক খেলাধুলোর যুগে একজন খেলোয়াড়ের একটিমাত্র মুহূর্তও পুরো ব্র্যান্ড স্ট্র্যাটেজি বদলে দিতে পারে—ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর কোকা-কোলা সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা আজও মার্কেটিংয়ের কেস স্টাডি।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ নাইকির কাছে সুবর্ণ সুযোগ—কিন্তু ঝুঁকিও সমান। হোম অ্যাডভান্টেজ, নতুন প্রযুক্তি আর বিপুল মার্কেটিং বাজেট থাকলেও, একটিমাত্র ভুল বা ভুল বার্তা সব হিসেব ওলটপালট করে দিতে পারে। অন্যদিকে অ্যাডিডাস ঐতিহ্য আর স্টাইলের জোরে লড়াই জমিয়ে রাখতে প্রস্তুত। এই বিশ্বকাপ শেষে কে জিতবে—ট্রফি নয়, বরং ব্র্যান্ড-যুদ্ধ—সেদিকে তাকিয়ে সকলে।