২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের উৎসব নয়—আসলে ফিফা ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর জন্য এক বড় ‘স্ট্রেস টেস্ট’।

ট্রাম্প ও ইনফান্তিনো
শেষ আপডেট: 14 January 2026 14:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ময়দানে গোল, গ্যালারিতে উল্লাস—বিশ্বকাপ মানেই ফুটবলের মহাযজ্ঞ। কিন্তু ফিফার মহা আয়োজন যত এগিয়ে আসছে, ততই ঘনীভূত হচ্ছে প্রশ্ন, যার সিংহভাগের এপিসেন্টার মাঠের বাইরে রাজনীতির আঙিনা। আরেকটু ভেঙে বললে: আয়োজক দেশের রাজনীতি। বিশেষ করে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি। ভেনেজুয়েলায় সেনা অভিযান, অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রকাশ্য হুমকি, কড়া অভিবাসন নীতি—সব মিলিয়ে ফুটবল আর ভূরাজনীতির মধ্যেখানে এক অস্বস্তিকর ধূসর রেখা তৈরি হয়েছে। সেই রেখাই কি ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে বড় সংকটের ইঙ্গিত মেলে ধরছে?
কেন এত বিতর্ক?
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে (Nicolas Maduro) ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা। চলতি মাসে রাজধানী কারাকাসে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে মাদুরো আটক হওয়ার পরই প্রশ্নের ঝড় ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অভিযান’ বলে দেগে দিলেও ভেনেজুয়েলা একে দেখছে সার্বভৌম রাষ্ট্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে। যার জেরে ব্রিটিশ সংসদের একদল সাংসদ—লেবার, লিবারাল ডেমোক্র্যাট, গ্রিন পার্টি ও প্লেইড কামরু—এক যৌথ প্রস্তাব পর্যন্ত এনেছেন। তাঁদের দাবি, আন্তর্জাতিক আইন ও অন্য দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা না দেখানো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি ভেবে দেখা উচিত। যুক্তি পরিষ্কার—খেলার আসর যেন শক্তিশালী রাষ্ট্রের বেআইনি পদক্ষেপ ‘স্বাভাবিক’করে তোলার হাতিয়ার না হয়ে ওঠে।
ফিফার দ্বিধা: নীতি বনাম রাজনীতি
ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ফিফা (FIFA) প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মুখ খোলেনি। অথচ কিছুদিন আগে তারাই বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে ‘শান্তি পুরস্কার’ দিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়! ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ানি ইনফান্তিনোর (Gianni Infantino) সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও নতুন নয়। আর যাবতীয় সমস্যার গোড়াও ঠিক এখানেই। আমেরিকা ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রধান আয়োজক। অধিকাংশ ম্যাচ সেখানেই অনুষ্ঠিত হবে। এমন দেশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া বাস্তবে কতটা যুক্তিযুক্ত? অনেকের মতে, প্রায় অসম্ভব। ২০১৮ সালে রাশিয়ায় বিশ্বকাপ হয়েছিল, তখনও ক্রিমিয়া দখল-সহ একাধিক অভিযোগ ওঠে। আবার ২০২২ সালে ইউক্রেনে পুরোদস্তুর হামলার পর রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করা হয়। এই দুই অবস্থানের ফারাক তুলেছে প্রশ্ন—ফিফা কি নীতিগতভাবে একরকম আচরণ করছে?
অলিম্পিকের অবস্থান: খেলাধুলা কি রাজনীতির ঊর্ধ্বে?
শুধু বিশ্বকাপ নয়, প্রশ্ন উঠছে অলিম্পিক নিয়েও। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (International Olympic Committee) বা আইওসি (IOC) রাশিয়ার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিলেও, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়নি। যুক্তি—রাজনৈতিক সংঘাত মেটানো তাদের কাজ নয়, খেলাধুলার মাধ্যমে বিশ্বকে একত্র করাই আসল লক্ষ্য।
যদিও সমালোচকেরা বলছেন, এই ‘নিরপেক্ষতা’র বুলি আসলে মুখেই। আদতে সবকিছু ক্ষমতার ভারসাম্যের উপর দাঁড়িয়ে। যে কারণে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের কড়া অভিবাসন নীতি ও সামরিক হস্তক্ষেপের প্রশ্নে নীরবতা চোখে পড়ার মতো। ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকের আগে এই বিতর্ক আরও তীব্র হবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বকাপের সামনে ‘স্ট্রেস টেস্ট’: রাজনীতি বনাম ফুটবল
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই পরিস্থিতির প্রভাব কি পড়বে মাঠের খেলায়? ইতিমধ্যেই ইরান, হাইতি, সেনেগাল ও আইভরি কোস্টের সমর্থকদের ভিসা জটিলতা তৈরি হয়েছে। অভিবাসন নীতি কড়াকড়ি হওয়ায় অনেক অনুরাগীই বিশ্বকাপ দেখতে আসতে পারবেন কি না সন্দেহ। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করছে—বিশ্বকাপ যেন ‘অথরিটেরিয়ান এজেন্ডা’র হাতিয়ার না হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস (Antonio Guterres) পর্যন্ত মুখ খুলে জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা অভিযানে আন্তর্জাতিক আইনের নিয়ম মানা হয়নি। এই মন্তব্য পরিস্থিতির গুরুত্ব বাড়িয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—যদি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র আরও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে কি ইউরোপীয় দেশগুলো ম্যাচ বয়কট করবে? সহ-আয়োজক দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতায় ফাটল ধরবে?
সব মিলিয়ে, ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের উৎসব নয়—আসলে ফিফা ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থাগুলোর জন্য এক বড় ‘স্ট্রেস টেস্ট’। সত্যিই রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকতে পারবে, নাকি বাস্তব রাজনীতির চাপে নীতির ব্যাখ্যা বদলাবে? মাঠে গোল পড়ার আগে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হাতড়াচ্ছে গোটা বিশ্ব।