
ইতালির বিরুদ্ধে গোল করেও জেতাতে পারলেন না মড্রিচ। (ছবিঃ এপি)
শেষ আপডেট: 26 June 2024 20:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সাংবাদিক সম্মেলনের ধরাবাঁধা কেজো ধাঁচের মাঝেও দৃশ্যটা অনেকদিন মনে রাখার মত।
শেষ হয়েছে ক্রোয়েশিয়া-ইতালি ম্যাচ। যে কোনও রোমহর্ষক থ্রিলারকেও হার মানাতে পারত সেদিন। স্পেন উঠে গিয়েছে শেষ ষোলোয়। ইতালির যা পয়েন্ট, তাতে জিততে না পারলেও, ড্র করলেই হবে। কিন্তু হারলেই এগিয়ে যাবে ক্রোয়েশিয়া। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে দশ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি মিস করেও ফিরতি পাসে অনবদ্য গোল করে যান মড্রিচ। এগিয়ে যায় ক্রোয়েশিয়া। একেবারে শেষ অবধি টানটান উত্তেজনা, বোধ হয় ছিটকেই গেল ইতালি। অথচ আট মিনিট ইনজুরি টাইমের একেবারে শেষ কয়েক সেকেন্ডের আগে গোল করে দেয় ইতালি। রূপকথার ম্যাচ শেষ হয় হৃদয়বিদারক হতাশায়।
সেই ম্যাচের পরে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত ক্রোয়েশিয়া অধিনায়ক লুকা মড্রিচ এসেছেন সাংবাদিক সম্মেলনে। সভাকক্ষে উপস্থিত এক ইতালীয় সাংবাদিক ফ্রান্সেসকো রেপিকে মাইক নিয়ে বললেন, 'একজন ইতালীয় সাংবাদিক হিসেবে আমি শুরুতেই তোমাকে সব কিছুর জন্য ধন্যবাদ দিতে চাই। শুধু আজকের ম্যাচ নয়। তোমার সারা কেরিয়ারে তুমি যা যা করেছো, সবকিছুর জন্য। আজ আরও একবার তুমি একজন সর্বোচ্চ মানের ফুটবলার হিসেবে শেষ করলে। পেনাল্টি মিস করেও স্কোর করলে। তোমাকে আমি শুধু একটাই অনুরোধ করতে চাই। তুমি কোনওদিন রিটায়ার কোরো না। তুমি আমার দেখা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠদের মধ্যে একজন, যাকে নিয়ে আমি লেখালিখি করেছি।'
মড্রিচ হেসে ফেলেন। সলজ্জভাবে বলেন, 'গ্রাৎসি' (ইতালীয় ভাষায়, ধন্যবাদ)। বলেন, 'এই অসাধারণ সম্মানের জন্য সত্যিই অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আমিও তো তাই চাই, সারাজীবন খেলে যেতে। কিন্তু একটা সময় তো আসবেই, যখন আমাকে বুট তুলে রাখতে হবে। জানি না, আর কতদিন খেলে যেতে পারব। কিন্তু আপনাকে অনেক ধন্যবাদ!'
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর বয়স ৩৯। এখনও তিনি ইউরোতে কোনও গোল করতে পারেননি। এই মুহূর্তে অতএব লুকা মড্রিচ ইউরোর ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বয়সী গোলদাতা। গোল দিলেন ৩৮ বছর ২৮৯ দিনে। এটাই একটা রেকর্ড। গত বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে হারিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল ক্রোয়েশিয়া। শেষ অবধি সেমিফাইনালে লিওনেল মেসির আর্জেন্তিনার কাছে হারতে হয় তাদের। ভাবা হচ্ছিল, দেশের জার্সিতে আর দেখা যাবে না মড্রিচকে। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধকে যিনি হার মানিয়েছেন, এত সহজে কি তাঁকে শেষ ভেবে নেওয়া যায়?
মড্রিচের জন্ম ১৯৮৫ সালে। ঠাণ্ডা যুদ্ধ তখন শেষ পর্যায়ে, টলমল করছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ক্রোয়েশিয়া তখনও সরকারিভাবে একটা প্রদেশ। যার মাথায় রয়েছে পূর্ব ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র যুগোস্লাভিয়া। বার্লিন প্রাচীরের পতন হতেই যুগোস্লাভিয়ার অন্দরের সমাজতান্ত্রিক জাতিরাজ্যগুলো স্বাধীনতা জানাতে শুরু করে। ক্রোটরা তাদের নিজেদের রাজ্য ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা দাবি করে। রাজি হ'ননি সার্বিয়ার রাষ্ট্রনায়ক স্লোবোদান মিলোসেভিচ। শুরু হয় যুদ্ধ। রেশ গড়ায় ফুটবলেও। যুগোস্লাভিয়ার দুই বড় শহর ছিল রাজধানী বেলগ্রেড ও জাগ্রেব। ঘরোয়া লিগের একটি ফুটবল ম্যাচে মুখোমুখি হয় দুই শহরের দুই ধুন্ধুমার ক্লাব, রেড স্টার বেলগ্রেড ও ডায়নামো জাগ্রেব। তুমুল উত্তেজনা থেকে শুরু হয় সংঘর্ষ। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় জাগ্রেবের স্টেডিয়ামে। দু'পক্ষের সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে নিরাপত্তাবাহিনী।
যুগোস্লাভিয়া ভেঙে টুকরো হয়ে যাওয়ার বছরগুলোয় ছোটবেলা কাটিয়েছেন মড্রিচ। তাঁর চোখের সামনে তাঁর দাদুকে হত্যা করেছিল বিদ্রোহী সার্বরা। আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর বাড়িতে। রিফিউজি হিসেবে কাটাতে হয়েছে বছরের পর বছর। জাদার শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন, ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধে ওই শহরে তুমুল বোমাবর্ষণ করেছিল যুগোস্লাভ বাহিনী। সেইসবকে সঙ্গী করেই ফুটবলে মন দিয়েছিলেন মড্রিচ। ২০০১ সালে বলকান উপত্যকা শান্ত হয়ে এলে ১৬ বছরের কিশোর মড্রিচ যোগ দিয়েছিলেন ডায়নামো জাগ্রেবে। ২০০৮ অবধি সেখানেই খেলেছেন তিনি।
মড্রিচ আর কতদিন খেলবেন, জানা নেই। পরের যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা বিশ্বকাপে তাঁর বয়স হবে ৪০। ততদিন অবধি চূড়ান্ত পর্যায়ে খেলার মত জায়গায় তিনি থাকবেন কিনা, জানা নেই। তাঁর সমবয়সী সতীর্থরা অনেকেই সৌদি আরব বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছেন। সেখানে ৩৮ বছরেও তিনি রিয়াল মাদ্রিদে নিয়মিত খেলছেন। ফলে আশা তো রাখাই যায়। মনে করা যায়, ফুটবলের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হিসেবেই তিনি থেকে যাবেন এইভাবে।