কোনও অতিরঞ্জন নয়। ক্লাব ইতিহাসে এমন শত্রুতা আগে কেউ দেখেনি। এই ক্ষত শুকোয়নি আর। এই ট্রান্সফার বদলে দেয় গোটা ইউরোপিয়ান ফুটবলের মানচিত্র।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 25 July 2025 17:43
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০০০ সালের গ্রীষ্ম।
বার্সেলোনার অন্যতম সেরা ফুটবলার, কাতালান আবেগের মূর্তিমান প্রতীক পর্তুগিজ উইঙ্গার লুইস ফিগো সার্দিনিয়ায় ছুটি কাটাচ্ছেন। ততদিনে গুঞ্জন ছড়িয়েছে: চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ তাঁকে কিনে নিতে চায়।
খবরটা দু-তরফের সমর্থকদেরই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। চক্ষু-কর্ণের বিবাদভঞ্জনে বার্সেলোনার এক সাংবাদিককে ডেকে পাঠান ফিগো। অনেক কথা বলেন। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন।
পরদিন স্প্যানিশ ক্রীড়া দৈনিকের প্রথম পাতায় ছাপা হল আগুন-ঝরানো শিরোনাম: ‘রিয়ালে যাচ্ছি না, আমি কেবল বার্সেলোনাতেই খেলব’।
এই ছিল নাটকের প্রথমাঙ্ক।
কিন্তু কাহিনির ভরকেন্দ্র ছিল মঞ্চের বাইরে। সেই সময় স্পেনের আরেক প্রান্তে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামছেন এক নির্মাণ সংস্থার কর্ণধার ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট হতে চান তিনি। প্রতিদ্বন্দ্বী তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লোরেঞ্জো সান্স, যিনি মাত্র তিন বছরে ক্লাবকে দুটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতিয়েছেন।
পেরেজ জানতেন, সাধারণ প্রতিশ্রুতিতে দেয়াল ভাঙা যাবে না। দরকার এমন কিছু, যা শুধু রিয়াল সমর্থকদের মধ্যে নয়, ফুটবলবিশ্বের মনেও বিস্ফোরণ ঘটাবে।
তখনই পরিকল্পনা ছকে নেন। নির্বাচনী ইস্তেহারে ঘোষণা করেন: চিরশত্রু বার্সেলোনার ঘরে হানা দিয়ে, সুখের সংসারে আগুন ধরিয়ে সেরা খেলোয়াড়টিকে ছিনিয়ে আনবেন। এতটুকু অস্বস্তি ছাড়া বলে দেন: ‘যদি আমি জিতি, তাহলে লুইস ফিগো হবেন রিয়ালের প্রথম ‘গ্যালাক্টিকো’’!
পর্তুগিজ তারকাকে সই করানো রিয়ালের কাছে স্রেফ নৈতিক জয় ছিল না। এটা অনেকটা বিপক্ষ শিবিরের প্রধান সেনাপতিকে সই করানোর সামিল। যা প্রতিপক্ষের অহংকে ধ্বস্ত করে। তাদের সম্মান, অহমিকা মাটিতে মিশিয়ে দেয়।
যে মানুষটা কিছুদিন আগেই স্টেডিয়ামের বাইরে সমবেত কাতারে কাতারে সমর্থকদের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন ‘রিয়ালের বাচ্চারা, চ্যাম্পিয়নদের স্যালুট দাও!’, সাংবাদিক ডেকে জানিয়ে দেন, সব গুজব, অপপ্রচার… বার্সাতেই থাকছেন, সেই তিনি, লুইস ফিগো, ন’দিন বাদে মাদ্রিদের রাস্তায় রিয়ালের জার্সি হাতে দাঁড়িয়ে ফটো সেশন সেরে ফেলেন।
মাঝের কয়েক দিনে অনেক কিছু ঘটে যায়। ২০০০ সালের ২৪ জুলাই, ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ সভাপতি নির্বাচিত হতেই একটানা ফোন শুরু। এজেন্ট হোসে ভেইগা আর অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ তারকা পাওলো ফুত্রে ময়দানে নামেন। ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের রিলিজ ক্লজ গুনে দেওয়া হয় বার্সাকে, যা ফুটবল ইতিহাসে তখনকার সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি।
বার্সা হতবাক। সমর্থকরা স্তব্ধ। আর ফিগো?
তিনি তখন রিয়ালের হয়ে প্রেস কনফারেন্স করছেন। স্পষ্ট উচ্চারণে বলছেন, ‘আমি পেশাদার, আমি রিয়ালের খেলোয়াড়!’
এটাই ছিল খেলা। টাকার অঙ্ক এতখানি বড় যে, ফিগো শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে আসতে চেয়েও পারলেন না। তার উপর পেরেজ চুক্তিতে একটি ধারা রেখেছিলেন—যদি পর্তুগালের উইঙ্গার ফিরে যান, তাহলে তাঁকে নিজের পকেট থেকে ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি ক্ষতিপূরণ বাবদ দিতে হবে! আর্থিক প্রলোভন ও শর্তভঙ্গের সম্ভাব্য দাবি—এই দুইয়ের সাঁড়াশি চাপে ফিগোকে তুলে নেন পেরেজ।
ফ্লোরেন্তিনো কেবল একজন খেলোয়াড় কেনেননি, তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন একটি বার্তা। যা পরের দুই দশকে রিয়ালের গ্যালাক্টিকো সংস্কৃতির বীজ বুনে দেয়। একজন ফুটবলারের পোশাকে আসলে তিনি ছিনিয়ে এনেছিলেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবের আত্মা… বার্সেলোনার সমর্থকদের আবেগ, ভালবাসা। হাতুড়ি মেরেছিলেন ক্লাবের বিশ্বস্ততার দেয়ালে।
যদি আরেকটু ছড়িয়ে ভাবা যায়, তাহলে বলতে পারি: পেরেজ নেমেছিলেন কাতালান জাতিসত্তার বিরুদ্ধে ঘোষিত সংগ্রামে। বার্সেলোনায় গৃহযুদ্ধ ধরিয়ে দেন একা হাতে। বার্সেলোনায় তখন ফিগোর পোস্টার পোড়ানো হচ্ছে, শহরের দেয়ালে আঁকা হচ্ছে ‘জুডাসে’র ম্যুরাল। কেউ বলছেন ‘টাকা-লোভী’, ‘অর্থপিশাচ’, কেউ ‘বিশ্বাসঘাতক’!
আর এই ক্ষোভ, যা তুষের আগুনের মতো জ্বলছিল, দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে ২১ অক্টোবর। ক্যাম্প ন্যু স্টেডিয়ামে রিয়ালের জার্সি গায়ে কাতালোনিয়ায় ফিরে আসেন ফিগো। গোটা ময়দান ততক্ষণে অগ্নিগর্ভ। ভেসে আসছে তীক্ষ্ম শিস, ভয়ঙ্কর বিদ্রূপ, তীব্র কটূক্তি! কর্নার নিতে যাচ্ছেন ফিগো আর আছড়ে পড়ছে গ্লাসের বোতল, কয়েন… এমনকি এক শুয়রের কাটা মাথা। এই অগ্নিবর্ষী ম্যাচ নিয়ে রিয়ালের রবার্তো কার্লোস পরে বলেছিলেন, ‘সেদিন যদি রেফারি ম্যাচ বাতিল করে দিতেন, আমি খুশি হতাম!’
কোনও অতিরঞ্জন নয়। ক্লাব ইতিহাসে এমন শত্রুতা আগে কেউ দেখেনি। এই ক্ষত শুকোয়নি আর। এই ট্রান্সফার বদলে দেয় গোটা ইউরোপিয়ান ফুটবলের মানচিত্র। রিয়াল বুঝে গিয়েছিল, তারকা মানেই কেবল ফুটবল নয়… ব্র্যান্ড, বিপণন, রাজনৈতিক পুঁজিও উত্তর-আধুনিক খেলার আবশ্যক অঙ্গ। বার্সা সবক শিখেছিল, ভালোবাসা দিয়ে সবকিছু আটকানো যায় না। এজেন্টরা হাড়ে হড়ে টের পেয়েছিল, খেলোয়াড়ের ওপর যাঁর হাত, তাঁর কথাই শিরোধার্য। আর সমর্থকরা অনুভব করেছিল, ‘প্রিয় খেলোয়াড়’ তকমাটা আসলে একটা নামেমাত্র চুক্তির উপর দাঁড়িয়ে।
এই নিয়ে পেরেজ খুব বেশি কিছু বলেননি। শুধু উচ্চারিত করেন একটি বাক্য: ‘সবকিছু শুরু হয়েছিল ফিগোর হাত ধরেই!’ মুখে উন্মীলিত ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি। যার কিছুটা আত্মতুষ্টি, কিছুটা অপরাধহীন আত্মপ্রসাদ!