শুরুটা সহজ ছিল না। দিল্লির নাংলই গ্রামের একঘরে ছোট্ট ঘরে একসঙ্গে থাকতেন মেয়েরা। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে চড়ে যেতেন প্রশিক্ষণে। রান্না করতেন নিজেরাই, গরমের রাতে ঘেমে উঠতেন, তবু মনোবল ছিল অটুট।

এফসি গারওয়াল
শেষ আপডেট: 17 August 2025 16:49
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দীর্ঘদিন ধরে গারওয়াল এফসি মূলত পুরুষদের ক্লাব হিসেবেই পরিচিত ছিল। মহিলাদের দল গড়া মানে ছিল, বছরে এক-আধটা টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া, তাও নিয়ম মাফিক। কিন্তু ২০২১ সালে সেই ছবি বদলাতে শুরু করে। তখনকার কোচ চলে গেলে, ক্লাব কর্তারা দায়িত্ব দেন অক্ষয় মেননকে। ভট্টাচার্য ভুটিয়া ফুটবল স্কুলের (বিবিএফএস) কোচিং অভিজ্ঞতা নিয়ে মেনন শুরু করেন গারওয়ালের প্রথম মেয়েদের দল গড়ে তোলার কাজ।
দল গড়তে গিয়ে মেনন চোখ রাখেন উত্তর-পূর্ব ভারতে। মণিপুর কিংবা মিজোরামের বদলে বেছে নেন মেঘালয়কে। বন্ধুর পরামর্শে তিনি খুঁজে আনেন এমন কয়েকজন কিশোরী ফুটবলার, যাদের পরিবার চরম অভাবের মধ্যে দিন কাটায়। শর্ত ছিল একটাই— শিক্ষা ও থাকার ব্যবস্থা যদি নিশ্চিত করা যায়, তবে ফুটবলের জন্য মেয়েদের পাঠিয়ে দেবেন তাঁরা।

এইভাবেই ২৬ জন মেয়ে নিয়ে শুরু হয় গারওয়ালের মহিলা দলের যাত্রা। প্রথম মরশুমে ফল আশানুরূপ না হলেও, মেননের লক্ষ্য স্পষ্ট ছিল, ভারতীয় উইমেনস লিগে (আইডব্লিউএল) জায়গা করে নেওয়া। আজ সেই স্বপ্ন অনেকটাই বাস্তব। প্রথম দলে যাঁদের নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে চারজন এখন দেশের অনূর্ধ্ব-২০ দলে।
শুরুটা সহজ ছিল না। দিল্লির নাংলই গ্রামের একঘরে ছোট্ট ঘরে একসঙ্গে থাকতেন মেয়েরা। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে চড়ে যেতেন প্রশিক্ষণে। রান্না করতেন নিজেরাই, গরমের রাতে ঘেমে উঠতেন, তবু মনোবল ছিল অটুট। একসঙ্গে থাকার মধ্যেই তৈরি হয়েছিল পরিবারের মতো বন্ধন।
২০২২ সালে তারা ইতিহাস গড়ল দিল্লি উইমেনস লিগ জিতে। এর পর ধীরে ধীরে দলে যোগ দেন মণিপুরের সংঘাত-কবলিত এলাকা থেকে আসা মেয়েরা, আবার কেউ এসেছে বিহারের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে। ফুটবল তাঁদের কাছে শুধু খেলা নয়, সমাজের বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার এক পথ।

অক্ষয় মেনন বলেন, “অনেক মা-বাবা শুধু নিরাপত্তার জন্যই মেয়েদের পাঠাতে চেয়েছিলেন। খেলাধুলো ওদের জীবনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।”
খেলাধুলো মেয়েদের হাতে তুলে দিয়েছে আত্মনির্ভরতার সুযোগ। শুধু খ্যাতি নয়, এর মাধ্যমে মিলতে পারে সরকারি চাকরিও— রেল, সিআরপিএফ বড়জোর বিভিন্ন রাজ্য সংস্থায়। গারওয়ালের মেয়েদের অনেকে সেটা লক্ষ্য করেই এগোচ্ছেন।
রুবি গাংতে, মণিপুরের কুকি সম্প্রদায়ের কিশোরী। জাতিগত সংঘর্ষে ক্ষতবিক্ষত শৈশব পেরিয়ে তিনি এখন ফুটবলে খুঁজে পেয়েছেন নতুন আশ্রয়। অন্যদিকে, মেঘালয়ের ফ্র্যাগরেন্সি রিওয়ান বলেন, “খেলা আমার জীবনের অংশ। গারওয়াল আমাকে দেখিয়েছে, স্বপ্নকে পেশা করা যায়।”
ভারতে মহিলাদের ফুটবল এখনও অবকাঠামো, অর্থ ও প্রচারের অভাবে পিছিয়ে। তবু ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া আইডব্লিউএল সেই পথে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। গারওয়াল এফসি এখন সেই মঞ্চে নামতে প্রস্তুত। তবে চ্যালেঞ্জও আছে— বাইরে ম্যাচ খেলতে গেলে ভ্রমণ, থাকা-খাওয়ার খরচ সামলানো সহজ নয়। কর্পোরেট স্পনসর নেই, ভরসা বলতে ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ও সিএসআর প্রকল্প।
আজ দলের গড় বয়স মাত্র ১৭। কারও কারও ঝুলিতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও আছে। কেউ জাতীয় দলে সুযোগ না পেলে কোচিং বা অন্য পেশায় যাওয়ার পথও খোলা রাখছেন মেনন। তাঁর কথায়, “ফুটবল শুধু খেলার সুযোগ নয়, জীবন গড়ার এক বিকল্প রাস্তা।”