যতদিন না তারা এই সাংস্কৃতিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠছে, ততদিন ‘স্পার্সি’ তকমা গায়ে লেগেই থাকবে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—এই দাগ মুছতে শুধু খেলার শুরু নয়, শেষটাও নিখুঁত হওয়া জরুরি।

টটেনহ্যাম হটস্পার
শেষ আপডেট: 14 August 2025 14:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জেতা ম্যাচ হেরে বসা—বোঝাতে বাংলা বাগধারায় সুন্দর বিকল্প রয়েছে—‘তীরে এসে তরী ডোবানো’। ইংল্যান্ডের ময়দানে একেই ঘুরিয়ে এবং এক শব্দে বলা হয় ‘স্পার্সি’। টটেনহ্যাম হটস্পার, নামান্তরে ‘স্পার্স’, লন্ডনের জনপ্রিয় ক্লাব। দশকের পর দশকজুড়ে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ লড়াই খেলতে নেমে যারা নিজেদের দোষে হেরে ভূত হয়। কালক্রমে বিদ্রুপ, সমালোচনা, ট্রোলিং মিলেমিশে জন্ম নিয়েছে এই চটুল কয়েনেজ—‘স্পার্সি’! অর্থ: নিশ্চিত সুযোগ হাতছাড়া করা, তীরে এসে তরী ডোবানো!
ম্যানেজার বদলায়। দল ঢেলে সাজানো হয়। পুরনোর বিদায়ে নতুন তারকার উত্থান—সবই ঘটে নিয়ম মেনে। কিন্তু বেনিয়ম রয়ে যায়। ফাইনালে উঠে কিংবা ম্যাচের চূড়ান্ত মুহূর্তে হাতের রাশ আলগা হয়, লড়াই জিতে নেয় প্রতিপক্ষ বাহিনী, যারা হয়তো নব্বই মিনিট সেভাবে দাঁতই ফোটাতে পারেনি।
গতরাতের সুপার কাপে পিএসজির বিরুদ্ধেও ছবিটা বদলাল না। আশি মিনিট পর্যন্ত দু’গোলে এগিয়ে থেকেও লিড ধরে রাখতে ব্যর্থ টমাস ফ্র্যাঙ্কের টিম। ফলাফল? লড়াই গড়াল পেনল্টিতে। এবং সেখানেও ২-০-র লিড খুইয়ে নিশ্চিত জয়, মরশুমের প্রথম খেতাব হাতছাড়া করল টটেনহ্যাম।
বিশ্লেষকদের চোখে অবশ্য এটা নতুন কিছু নয়। এমন আত্মঘাতী অভ্যাস যেন টটেনহ্যামের ডিএনএতে গাঁথা। প্রতিবার যখন মনে হয় লন্ডনের এই দলটা বদলে গেছে, ঠিক তখনই পুরনো ব্যথা জেগে ওঠে। গতকাল পিএসজির বিরুদ্ধে ইউরোপীয় সুপার কাপে যেন মর্মান্তিক ইতিহাসেরই চিরচেনা রিপ্লে। বছরের পর বছর ধরে একই গল্প। কোচ বদলায়। জোসে মোরিনহো, আন্তোনিও কন্তে, এঞ্জ পোস্টেকগ্লু—সবাই নিজেদের কায়দায় দল গড়েছেন। তবুও শেষ মুহূর্তে হেরে যাওয়ার অভ্যাস বদলায়নি। প্রশ্ন একটাই—কেন?
বিশেষজ্ঞদের চোখে, প্রথম কারণ, আত্মতুষ্টি। অনেক সময় লিড নেওয়ার পরই স্পার্স খেলোয়াড়দের মধ্যে ভর করে এক ধরনের স্বাচ্ছন্দ্য, গা-ছাড়া ভাব। খেলার গতি কমে যায়। সবাই ভেবে নেয়, ম্যাচ শেষ। এঞ্জ পোস্টেকগ্লু ব্রাইটনের কাছে হারের পর বলেছিলেন—‘এটাই আমার কেরিয়ারের সবচেয়ে বাজে পরাজয়!’ প্রথমার্ধে ২-০ এগিয়ে থাকা দল দ্বিতীয়ার্ধে তালগোল পাকিয়ে ৩-২ হেরে যাচ্ছে—টটেনহ্যামের ক্ষেত্রে এটা নিছক কাকতালীয় নয়।
দ্বিতীয়ত, প্রতিপক্ষের জেদ আর কৌশলবদলের মুহূর্তে অস্থিরতা। অপোজিশন যখন রণনীতি পাল্টে নেয়, স্পার্স প্রায়শই তার জবাব খুঁজে পায় না। ২০২৩ সালে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে ২-০ এগিয়ে থেকেও ৪-২ হার এর অন্যতম উদাহরণ। পেপ গোয়ার্দিওলার সিটি দ্বিতীয়ার্ধে ছন্দ আর টেম্পো বদলে ফেলে। আর স্পার্স রক্ষণের ফাঁক মেরামত করার আগেই গোলের পর গোল হজম করে চলে।
তৃতীয়ত, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি। ম্যাচ যত শেষের দিকে গড়ায়, ততই দলের যায় গতি। সুপার কাপে পিএসজির বিরুদ্ধে শেষ ১০ মিনিটে তাদের ছন্দ স্পষ্টত ভেঙে পড়েছিল। ক্লান্তির দোসর মনঃসংযোগের ঘাটতি। এবং সেখানেই ম্যাচ হাতছাড়া।
চতুর্থ কারণ, ইন-গেম অভিযোজনের অভাব। খেলার মধ্যে পরিবর্তন এনে ম্যাচ বাঁচানোর দক্ষতা নেই বললেই চলে। এটাই দেখা গিয়েছিল ২০১২ সালের নর্থ লন্ডন ডার্বিতে। ২-০ এগিয়ে থেকেও আর্সেনালের কাছে ৫-২ ব্যবধানে হেরে যায় টটেনহ্যাম। প্রতিপক্ষের পাল্টা আক্রমণ শুরু হতেই রক্ষণ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
এমন নজির হাতেগোনা নয়। ভূরিভূরি। ২০০১ সালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ৩-০ লিড নিয়েও ৫-৩ হারা, ২০০২-এ ফুলহ্যামের কাছে ২-০ থেকে ৩-২ পরাজয়, ২০১০-এ বার্নলির বিপক্ষে ২-০ লিড নিয়ে ৪-২ পরাস্ত হওয়া। প্রতিবারই গল্প এক—প্রথমে নিয়ন্ত্রণ, তারপর আকস্মিক ধস।
এমন ধারাবাহিক ব্যর্থতা কেবল কোচিংয়ের ত্রুটি নয়, সাংগঠনিক সংস্কৃতির সমস্যাও বটে। স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের বিখ্যাত উক্তি—‘ছেলেরা, এটা টটেনহ্যাম’ (‘Lads, it’s Tottenham’) কিংবা ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড কথিত ‘আমরা হোয়াইট হার্ট লেনকে থ্রি পয়েন্টস লেন বলে ডাকতাম’—এহেন চিন্তা থেকে এসেছে। প্রতিপক্ষও জানে, শেষ মুহূর্তে আলতো চাপ দিলে স্পার্সের ধৈর্যের পালেস্তারা খসে পড়বে!
এই পরিস্থিতিতে রোগ সারাতে চাইলে শুধু খেলোয়াড় বা কোচ পাল্টালেই হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী মানসিক প্রস্তুতি, ম্যাচের শেষ মুহূর্ত সামলানোর প্রশিক্ষণ, আর স্কোয়াডের গভীরতা। ৮৫ মিনিট বাদেও যাদের ফিটনেস, মনোযোগ ও কৌশল অটুট থাকে, তারাই ট্রফি জেতে। টটেনহ্যামের রোগ সেখানেই—শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত লড়াই টেনে নেওয়ার ক্ষমতার একান্ত অভাব!
ফলে যতদিন না তারা এই সাংস্কৃতিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠছে, ততদিন ‘স্পার্সি’ তকমা গায়ে লেগেই থাকবে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—এই দাগ মুছতে শুধু খেলার শুরু নয়, শেষটাও নিখুঁত হওয়া জরুরি। পিএসজি ম্যাচ আরও একটা পরাজয় নয়, আরও একটা সতর্কবার্তাও বটে।
লাখ টাকার প্রশ্ন একটাই: টটেনহ্যাম কি এবার ঠেকে শিখবে, নাকি আবারও তীরে এসে তরী ডোবাবে?