পির্লো মাথা দিয়ে খেলতেন, ত্রাওরে খেলেন শরীর দিয়ে। কিন্তু দুজনের বক্তব্যের সারাৎসার একটাই—যে অস্ত্র তোমার, সেটাকেই শাণিয়ে নাও। বাকিটা মাঠ বলে দেবে।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 10 March 2026 18:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ইতালীয় ফুটবল-মায়েস্ত্রো আন্দ্রে পির্লো একবার তাঁর টেকনিকের কারণ-প্রকরণ নিয়ে বেশ চটকদার মন্তব্য করেছিলেন৷ মোটাদাগের বাংলা তর্জমা করলে বক্তব্যটা দাঁড়ায় এমন: 'পা দুটো তো স্রেফ উপকরণ মাত্র। আমি তো ফুটবল খেলি মাথা দিয়ে!'
পির্লোর মতামতের অতিশয়োক্তি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে৷ সবক্ষেত্রে কি মাথাই একমাত্র অস্ত্র হতে পারে? হওয়া সম্ভব? গোললাইনে শরীর ছুড়ে যে ডিফেন্ডার অবধারিত গোল আটকান, তাঁর আস্ত শরীর ফিট না হলে কি বল ক্লিয়ার করা সম্ভব? তরুণ উইঙ্গার, প্রান্ত বেয়ে ছুটে চলেন যিনি, তাঁর কাছে দুই পা ভিন্ন কোনও বিকল্প আয়ুধ রয়েছে কি?
উত্তর 'হ্যাঁ' বা 'না'—যা-ই হোক না কেন, এটা মেনে নিতে কারও অসুবিধা থাকার কথা নয়, যে ফিটনেস একজন ফুটবলারের সাফল্যের অন্যতম রসায়ন৷ যে মন্ত্রে দীক্ষিত ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো৷ চল্লিশ পেরিয়েও বল্গা হরিণের মতো ক্ষিপ্র, শিকারী চিতার মতো গোল-বুভুক্ষ! কিংবা পাওলো মালদিনি৷ কেরিয়ারের গোধূলিতেও ইউরোপের সর্বোচ্চ মঞ্চে যিনি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতে নেওয়ার ধক দেখাতে পারেন!
কিন্তু ফিট শরীরের অর্থ কী? শক্তপোক্ত কাঠামো, তুখোড় উদ্যমের কারখানা নাকি স্রেফ পেশির উদ্ধত প্রদর্শনী? আধুনিক 'ডেটা-ড্রিভেন', প্রযুক্তিসর্বস্ব ও গতিময় ফুটবলে এই প্রশ্নটা নতুন করে সামনে এসেছে। সহজ বাংলায় ভেঙে বললে: শরীরে পেশির ভরপুর আন্দোলন কি একজন ফুটবলারের জন্য আবশ্যিক শর্ত? নাকি সেটা নিছক-ই শো অফ? কতটা পেশি জরুরি, কতটা জরুরি নয়?
আদামা ত্রাওরে: পেশির মানচিত্র গায়ে আঁকা ফুটবলার
বিতর্কটা নতুন করে উস্কে দিয়েছেন ওয়েস্ট হ্যামের কোচ নুনো এস্পিরিতো সান্তো। দলের উইঙ্গার আদামা ত্রাওরেকে (Adama Traore) তিনি সরাসরি নিষেধ করেছেন জিমে ঢুকতে। বলেছেন, ‘ওর পেশি দেখলে অবাক লাগে। জিনগত ব্যাপার। ওকে বলেছি, জিমে যাওয়ার দরকার নেই। যা আছে, এটুকুই যথেষ্ট!’
স্পেনীয় খেলোয়াড় ত্রাওরের শরীর ফুটবলের মাঠে রীতিমতো ব্যতিক্রম। বাহুতে বেবি অয়েল মেখে মাঠে নামেন, যাতে প্রতিপক্ষ ধরতে না পারে। কিন্তু এত পেশি নিয়ে কি সত্যিই সুবিধা হয়? নাকি বাড়তি ভারটাই হয়ে ওঠে বাধা?

একই প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকু (Romelu Lukaku)। ২০১৮ বিশ্বকাপের পর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে ফিরে বুঝেছিলেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্য যে পরিমাণ পেশি বাড়িয়েছিলেন, প্রিমিয়ার লিগে সেটা বিপদ বাড়াচ্ছে। স্বীকারোক্তির সুরে বলেন, ‘ফিরে এসেই বুঝলাম, এই শরীর নিয়ে এই লিগে খেলা সম্ভব নয়। পেশি কমাতে হবে। জিম বন্ধ, জল বেশি, শাকসবজি আর মাছ!’
‘গোল্ডিলক্স জোন’: যেটুকু পেশি, ঠিক ততটুকুই
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, প্রতিটি ফুটবলারের শরীরের একটা আদর্শ মাত্রা থাকে। গো পারফর্মের পারফরম্যান্স প্রধান ট্রিস্টান বেকার এর নাম দিয়েছেন ‘গোল্ডিলক্স জোন’— না বেশি, না কম, ঠিক মাঝামাঝি একটা ‘সুইট স্পট’! আধুনিক ফুটবলে একজন খেলোয়াড়কে নব্বই মিনিটে দশ কিলোমিটার বা তারও বেশি দৌড়াতে হয়। বিভিন্ন গতিতে, বিভিন্ন দিকে। স্প্রিন্ট, বাঁক, লাফ, ধাক্কা—সব একসঙ্গে। এই চাহিদা মেটাতে শরীরকে হতে হবে ঝরঝরে, পেশিবহুল কিন্তু হালকা।

বেকারের ব্যাখ্যা চমৎকার। তাঁর তত্ত্ব: পা ও গোড়ালির কাজ দেখলেই বোঝা যায় কেউ সেই আদর্শ মাত্রায় আছে কি না। সঠিক শরীরে পা মাটি ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্প্রিং-এর মতো ছিটকে যায়। বাড়তি ওজন থাকলে সেই স্প্রিং চ্যাপ্টা হয়ে যায়, গতি কমে, মোড় নেওয়া কঠিন হয়। দিয়েছেন উপমাও: ‘রেসিং কারের সাসপেনশন হতে হবে, স্লিংকি খেলনার মতো নয়!’ অর্থাৎ শক্ত ও প্রতিক্রিয়াশীল… নরম ও নাদুসনুদুস গোছের নয়।
পেশি মানেই ধীরগতি—এই ধারণা ভুল!
ফুটবল মহলে দীর্ঘদিনের একটা বিশ্বাস রয়েছে—বেশি পেশি মানে কম গতি। কোচ ড্যানিয়েল বুথের নজরে, এই ধারণাটা আসলে ভুল বোঝাবুঝি থেকে জন্ম নেওয়া। তাঁর ব্যাখ্যা সহজ। পেশি বাড়লে গতি কমে না, যদি সেই পেশি শক্তি উৎপাদনেও সমানতালে এগোয়। আসল সমস্যা হয় তখনই, যখন শরীরের ভর বাড়ে কিন্তু শক্তি উৎপাদন সেই হারে বাড়ে না। তখন অনুপাতটা ভেঙে পড়ে। ফলে স্প্রিন্ট কমে, লাফ কমে, গতি কমে।
তাই ‘বেশি পেশি মানেই বোঝা’— এই সরল সমীকরণও বেঠিক। ঠিক প্রশ্ন হওয়া উচিত: পেশিটা কি কাজের? সে পেশি কি গতি ও শক্তি বাড়াচ্ছে, নাকি শুধু ওজন বাড়াচ্ছে?
উপরের শরীর হালকা, পায়ে জোর—এটাই ফর্মুলা
কোথায় পেশি বাড়ছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। এলিট পারফরম্যান্স কোচ নিল পার্সলি ব্রিটিশ সাইক্লিং দলের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়েছেন, সাইক্লিস্টদের কাঁধ ছিল প্রায় হাড়-চামড়ার। কারণ উপরের শরীরের পেশি সাইক্লিংয়ে বাধা।

ফুটবলেও একই কথা। শক্তিশালী পা ও মজবুত কোর দরকার, কিন্তু বাহু ও বুকের বাড়তি পেশি কোনো কাজে আসে না। বরং, বিপদ ডাকে। প্রিমিয়ার লিগে যত উপরে যাওয়া যায়, তত বাড়ে হাই-ইন্টেনসিটি দৌড়। আর সেই দৌড়ই শরীর থেকে পেশি ছিঁড়ে নিয়ে যায়। পার্সলির কথায়, ‘ম্যাচের পর ম্যাচে, ট্রেনিংয়ের পর ট্রেনিংয়ে পেশি ক্ষয় হতে থাকে। সেই ক্ষয় ঠেকাতে খেলার পরেই খাওয়া, সাপ্লিমেন্ট, ঘুমানোর আগে প্রোটিন—এই নিখুঁত রুটিন!’
জেনেটিক্স বনাম প্রশিক্ষণ: পেশি কি আসলে বদলানো যায়?
পারফরম্যান্স নিউট্রিশনিস্ট ড. নেসান কস্টেলোর মতামত সবচেয়ে চিন্তার খোরাক জোগাতে পারে। তাঁর চোখে, একজন খেলোয়াড়ের শরীরের গড়ন আসলে তিনটি জিনিসের ফল—প্রশিক্ষণের চাপ, খাওয়াদাওয়া এবং জিনগত বৈশিষ্ট্য। এর মধ্যে প্রথমটা পেশাদার ফুটবলে নির্দিষ্ট, পরিবর্তন সম্ভব নয়। আর জিনগত বৈশিষ্ট্য—সেটা তো জন্মের সঙ্গেই আসে।
ত্রাওরে যে পেশি নিয়ে জন্মেছেন, সেটা তাঁর শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ। এই পেশি কমাতে গেলে দরকার প্রচণ্ড ক্যালোরি ঘাটতি বা প্রোটিন কমানো। কিন্তু সেটা করলে শরীর নিজের পেশি ভেঙে শক্তি বানাবে। পারফরম্যান্সের দিক থেকে এটা আত্মঘাতী।
যে কারণে কস্টেলোর সিদ্ধান্ত: ‘একজন ফুটবলার ঠিকমতো ট্রেনিং করলে আর সঠিক খেলে ঠিক খেলে, শরীর নিজেই একটা ভারসাম্যে এসে যায়। বাইরে থেকে একটা নির্দিষ্ট শরীর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুধু ভুল নয়, ক্ষতিকর!’
শেষ কথা: মাপটা আসলে মাঠেই নির্ধারিত হয়
তাহলে প্রশ্নের উত্তর কী? কতটা পেশি যথেষ্ট? বুথের সহজ উত্তর: যতটা মাসল পারফরম্যান্স বাড়ায়, ততটাই যথেষ্ট। যেখান থেকে গতি কমে, লাফ কমে, স্প্রিন্ট কমে—সেটাই বাড়তি। ত্রাওরে ব্যতিক্রম। কিন্তু তিনি প্রমাণ, যে নিয়মের বাইরেও মানুষ থাকতে পারে। তাঁর গোড়ালি শক্ত, গতি প্রবল। স্লিংকি নন তিনি, রেসিং কার।
পির্লো মাথা দিয়ে খেলতেন, ত্রাওরে খেলেন শরীর দিয়ে। কিন্তু দুজনের বক্তব্যের সারাৎসার একটাই—যে অস্ত্র তোমার, সেটাকেই শাণিয়ে নাও। বাকিটা মাঠ বলে দেবে।