যেখানে কেপ ভার্দে একটা ‘ডায়াসপোরা মডেল’ তৈরি করে ইউরোপের ঘরানায় দল গড়েছে, সেখানে ভারত এখনও ন্যাশনাল লিগে আলো নিভে যাওয়ার সমস্যায় জেরবার!

গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 14 October 2025 18:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সাগরের বুক জুড়ে খানদশেক আগ্নেয় দ্বীপ। মোট জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে পাঁচ লক্ষ। নামটা গতরাতেও অনেকের জানা ছিল না—কেপ ভার্দে (Cape Verde)। কিন্তু সেই ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জই আজ সকাল হতেই সটান উঠে এল ফুটবল-মানচিত্রের উপরের সারিতে। কারণ একটাই: বিশ্বকাপের (FIFA World Cup 2026) টিকিট পকেটে পুরে ইতিহাস গড়েছে আফ্রিকার ‘ব্লু শার্কস’।
১৫ হাজার দর্শক যখন প্রাইয়ার (Praia) জাতীয় স্টেডিয়ামে (Estádio Nacional de Cabo Verde) উল্লাসে গর্জে উঠলেন, তখন শুধু ফুটবল ম্যাচ জেতার আনন্দে নয়, এক লহমায় গড়ে উঠল প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্বপ্নপূরণের দৃশ্যও। কেপ ভার্দে তিন গোলে হারিয়েছে এসোয়াটিনিকে (Eswatini)। আর এতেই নিশ্চিত হয়েছে বিশ্বকাপের টিকিট। ছোট্ট দেশ দেখেছে বিরাট স্বপ্ন, পেয়েছে চূড়ান্ত সাফল্য!
অবহেলা থেকে বিশ্বমঞ্চে
২৫ বছর আগেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে কেপ ভার্দের নাম খুঁজে পাওয়া যেত না। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে (FIFA Rankings) ১৮২-তম স্থানে। ফুটবল ছিল নিছক বিনোদন, পেশাদারিত্বের সামান্য ছোঁয়া পর্যন্ত আসেনি। আজ সেই দেশ দাঁড়িয়ে ৭০-তম স্থানে, আফ্রিকার বাছাইপর্বে এমন এক গ্রুপ থেকে শীর্ষে উঠে এসেছে, যেখানে ছিল ক্যামেরুন (Cameroon)। একটা দেশ, যাদের বিশ্বকাপ-অভিজ্ঞতা আটবারের!
২০০০ থেকে ২০২৫—এই সময়পর্বে ঘটেছে এক বিপ্লব। কোচ পেদ্রো লেইতাঁও ব্রিটো, যিনি অনুরাগীদের মুখে মুখে ‘বুবিস্তা’ (Bubista) নামে পরিচিত, তিনিই লিখেছেন এই রূপকথা। ৪–১ ব্যবধানে ক্যামেরুনের কাছে হারের পর দেশজুড়ে হতাশা। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। টানা পাঁচ ম্যাচে জয়—আঙ্গোলাকে (Angola) হারানো, ক্যামেরুনকে পরাস্ত করা—ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে আত্মবিশ্বাস! শেষ ম্যাচে দাইলন লিভ্রামেন্তো (Dailon Livramento), উইলি সেমেডো (Willy Semedo) ও সিনিয়র খেলোয়াড় স্টোপিরার (Stopira) গোল লিখে দেয় নয়া ইতিহাস। ২৩ পয়েন্ট নিয়ে শেষ করে বাছাইপর্বের শীর্ষে, চার পয়েন্ট পিছনে ক্যামেরুন!
‘ডায়াসপোরা ড্রিম’: যে অস্ত্র ভারত ধার করতে পারে না
কেপ ভার্দের সাফল্যের গোপন রহস্য লুকিয়ে তাদের প্রবাসী সম্প্রদায়ে (Diaspora Network)। প্রায় এক মিলিয়ন কেপ ভার্দিয়ান রয়েছেন ইউরোপ ও আমেরিকায়—যা দেশের আসল জনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। এই ছড়িয়ে থাকা প্রতিভাকেই একত্রিত করে গড়ে তোলা হয়েছে ‘ব্লু শার্কস’ দল। ফাইনাল ম্যাচের তিন গোলদাতাই জন্মেছেন বিদেশে—রটারডাম, প্যারিস, লিসবনে। দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ের বেড়ে ওঠা ইউরোপের ফুটবল অ্যাকাডেমিতে। তারা সপ্তাহে সপ্তাহে খেলছে প্রতিযোগিতামূলক লিগে। যে কারণে কেপ ভার্দের জাতীয় টিমে একসঙ্গে মিলেছে আফ্রিকার উন্মাদনা ও ইউরোপের প্রযুক্তি।
সবচেয়ে বিস্ময়ের গল্প যদিও রবার্তো ‘পিকো’ লোপেসের (Roberto "Pico" Lopes)। আয়ারল্যান্ডে জন্ম। মা আইরিশ, বাবা কেপ ভার্দিয়ান। একদিন লিংকডইনে (LinkedIn) ভেসে এল বার্তা—“তুমি কি আমাদের হয়ে খেলতে চাও?” প্রথমে ভেবেছিলেন মজা করছে কেউ। পরে উত্তর দেন। আজ তিনিই কেপ ভার্দের ডিফেন্সের স্তম্ভ! পর্তুগিজ ভাষা ঠিকমতো জানেন না ঠিকই। কিন্তু যখন প্রাইয়ার গ্যালারি থেকে তাঁর নামে নিয়ত স্লোগান ওঠে, চোখের পাতা আপনা থেকেই ভিজে যায়!
ছোট দেশ, বড় মঞ্চ—পরিকাঠামোর গুরুত্ব
চীনের সহায়তায় তৈরি হয় দেশের একমাত্র আধুনিক স্টেডিয়াম—১৫ হাজার আসনের ‘এস্টাদিও ন্যাসিওনাল’। ২০১৩ সালে উদ্বোধনের সময় অনেকেই ঠাট্টা করেছিলেন, “এত বড় মাঠে কে খেলবে?” আজ উত্তরটা মাঠেই মিলেছে। সরকারেরও আধঘণ্টার ছুটি ঘোষণা সার্থক! সব দোকান বন্ধ, সমস্ত ক্লাস বাতিল—দেশের তামাম টিভির সামনে। ছোট্ট জাতি। একটাই বিনোদন—ফুটবল। আর সেই আবেগই তাদের জিতিয়ে দিল!
তাহলে ভারত পারছে না কেন?
আবেগের সূত্রেই সওয়াল জেগেছে: যখন পাঁচ লক্ষ জনসংখ্যার একটা দেশ করে দেখায়, তখন ১৪০ কোটির ভারত পারে না কেন? উত্তরটা তেতো হলেও বাস্তব। যা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই!
প্রতিযোগিতার স্তর: আফ্রিকায় বিশ্বকাপের কোটা বেড়ে হয়েছে নয়। মানে, তুলনামূলক সহজ পথ। কেপ ভার্দেকে কেবল ক্যামেরুনকে হারাতে হয়েছে। কিন্তু এশিয়ায় ভারতের পথ আটকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ।
ক্রিকেটের ছায়া: কেপ ভার্দেতে ফুটবলই একমাত্র ধর্ম। ভারতে সেটা ক্রিকেট। পরিকাঠামো, পুঁজি, প্রচার—সবই বাইশ গজে। ফলে ফুটবল থেকে দূরে সরে যায় দেশের সম্ভাবনাময় প্রতিভারা!
জনসংখ্যার প্যারাডক্স: ছোট দেশের সুবিধে: সেরা প্রতিভাকে সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। ভারতে সম্ভাবনা অনন্ত, কিন্তু সবই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। যথাযথ স্কাউটিং আর পরিকল্পনার অভাবে হাজারো প্রতিশ্রুতি অঙ্কুরেই বিনষ্ট। ফলে যেখানে কেপ ভার্দে একটা ‘ডায়াসপোরা মডেল’ তৈরি করে ইউরোপের ঘরানায় দল গড়েছে, সেখানে ভারত এখনও ন্যাশনাল লিগে আলো নিভে যাওয়ার সমস্যায় জেরবার!
সমুদ্রে ঘেরা একটি ছোট্ট দ্বীপ প্রমাণ করেছে—আকার নয়, দৃষ্টিভঙ্গিই আসল। সংগঠিত পরিকল্পনা, অভিবাসী প্রতিভার সঠিক ব্যবহার আর চূড়ান্ত আত্মবিশ্বাসই ঘুরিয়ে দিতে পারে ভাগ্যের চাকা। ভারতের ফুটবলকে এখন সেই আয়নায় নিজেকে দেখা দরকার। কেপ ভার্দে তাদের আকারের গণ্ডি পেরিয়ে ‘ব্লু শার্ক’ হয়ে উঠেছে, আর ভারত এখনও ‘স্লিপিং জায়ান্ট’। প্রশ্নটা বাস্তব:“জেগে ওঠার সময় কি এখনও আসেনি?” এর জবাবে ‘অপেক্ষা’ ছাড়া আপাতত কিছু হাতে নেই।