ধ্বসের মধ্যে খানিক আলো শুধু কেরলে। কেরল সুপার লিগ দেখাচ্ছে কীভাবে রাজ্যস্তরেও ভরা গ্যালারি ফিরতে পারে। লাখ লাখ মানুষ মাঠে আসছে, খেলোয়াড়েরা মরিয়া, প্রতিটি দলের সঙ্গে জেলার আবেগ জুড়ে গিয়েছে।
.jpeg.webp)
ছবি: গুগল
শেষ আপডেট: 19 November 2025 15:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আইএসএল নেই। নতুন মুখ নেই৷ নয়া দিশা নেই৷ সাফল্য নেই৷ নেই উদযাপনও! ভারতীয় ফুটবল আদ্যোপান্ত ‘নেই-রাজ্যে'র চোরাবালিতে খাবি খাচ্ছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে শুরু হওয়া প্রিমিয়াম ফুটবল লিগ অতল আঁধারে ডুবে। কোনও ক্লাব ফুটবলারদের ছেড়ে দিচ্ছে, তো কেউ অনুশীলন স্থগিত রেখেছে৷ আপাতত সবাই বছরশেষে লিওনেল মেসির ভারত-অভিযানের আফিমে বুঁদ। টিকিটের চড়া দামের কৈফিয়ত আর পালটা সমালোচনায় রণং দেহী।
এ সবের অন্তরালে বাংলাদেশের হাতে পরাজয়৷ পাক্কা ৮ হাজার ৩৪০ দিন বাদে পড়শি দেশ বেইজ্জত করল। অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন করে নাগরিকত্ব নেওয়া রায়ান উইলিয়ামসকে ঘিরে যত কৌতূহল আর উদ্দীপনা জেগেছিল, সব মুহূর্তে ভ্যানিশ! ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে খালিদ জামিলের টিমের ফুটিফাটা চেহারা বে–আব্রু করলেন শেখ মোরসালিন।
শুধু র্যাঙ্ক তালিকায় নীচে থাকা দলের হাতে কুপোকাত হওয়া কিংবা দীর্ঘ সময় বাদে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে হার-ই নয়, এই পরাজয় আসলে এক গভীর অসুখের চেনা সিম্পটম! যে দেশের ফুটবল একদিন নিজেদের সোনালি যুগ দেখেছে, আজ সেখানে ভবিষ্যৎ বলতে শুধু একটা শব্দই মুখে আসে—‘অন্ধকার’!
সমস্যার শুরু অনেক আগে। আইএসএল যেদিন আরম্ভ হয়েছিল, সেদিন থেকেই বড় বড় ক্লাব, বড় বড় বিনিয়োগকারী, টিভি–রাইটস, ঝলমলে আলো—সব মিলিয়ে একটা কৃত্রিম আবহ তৈরি হয়। কিন্তু মাঠে কী হচ্ছিল? ভারতীয় খেলোয়াড়রা কোন জায়গায় ফুটবল শিখছিল? কোন প্রতিযোগিতায়? কার থেকে? কোন চাপের মধ্যে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেনি কেউ। কারণ খেলোয়াড়রা মাঠে নামলেও মূল দায়িত্ব ছিল বিদেশিদের হাতে—স্ট্রাইকার বিদেশি, উইঙ্গার বিদেশি, প্লেমেকার বিদেশি, মাঝমাঠের সমস্ত অংশও বিদেশিরাই ভরিয়ে দিয়েছে। ফলে যে জিনিসটা তৈরি হওয়া উচিত ছিল—ভারতীয় ফুটবলারদের দক্ষতা, চাপ নেওয়ার ক্ষমতা, ম্যাচের ছন্দ বোঝা, কঠিন মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিপক্বতা—এসব কিছুই গড়ে ওঠেনি। শুধু আলো জ্বলেছে, ফল ধরেনি। শুধুই অর্থব্যয়, উন্নতি নেই।
বাংলাদেশের কাছে হার তাই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা সেই সমস্ত ক্ষতের একটি, যেগুলো ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণ করছিল, কিন্তু আমরা কেউই গুরুত্ব দিইনি। মাঠে গড়াগড়ি যাওয়া লং বল, তালগোল পাকানো ডিফেন্সিভ লাইন, ছন্নছাড়া মিডফিল্ড—সব মিলিয়ে ভারতীয় ফুটবল আসলে বিশাল ‘সার্কাসে’ পরিণত হচ্ছিল আমাদেরই চোখের সামনে, কিন্তু কেউ খেয়াল পর্যন্ত করিনি।
বিপর্যয়ের একটা বড় কারণ: দেশজ ফুটবল সংস্কৃতির বিলুপ্তি। বাংলার লিগ ধুঁকছে, গোয়ার লিগ আগের মতো নেই, সারা দেশের জেলা–উপজেলা লিগগুলো প্রায় মরে গিয়েছে। প্রতিভা আসবে কোথা থেকে? যে দেশে জাপানের জে-লিগ থেকে অনুপ্রেরণা ধার করে জাতীয় লিগ তৈরি হয়েছিল, সেই দেশ আজ নিজের লিগই ধরে রাখতে পারছে না। অন্যদিকে জাপান তৈরি করেছে যুবব্যবস্থা, স্কাউটিং, ঘরোয়া টুর্নামেন্ট—সবকিছু এক সুসম্পন্ন চক্রে।
ভারতের চাকাটা ভাঙা, টুকরো, আলগা। যার প্রমাণ বাংলাদেশের হাতে হার—যে দেশের ঘরোয়া লিগ ছোট, কিন্তু নিয়মিত। ক্লাবগুলো স্থিতিশীল। খেলোয়াড়দের দায়িত্ব আছে। আমাদের? বিদেশিদের কাঁধে ভর করে ম্যাচ জিততে চাই, কিন্তু বাজারে দামের দৌড়ে খেলোয়াড়েরা হারাচ্ছে খিদে।
চিন্তার আরেকটা দিক—খেলোয়াড়ের প্রাকটিস কতটা হয়? আইএসএলে অনেক সময় ম্যাচ সপ্তাহে একবার। দেশজ লিগ নেই। বড় মাপের টুর্নামেন্ট নেই। কঠিন প্রতিযোগিতা নেই। ফলে খেলোয়াড়েরা ম্যাচ–ফিট হয় না, ম্যাচ–টাফ হয় না। তার উপর প্রতি তিন মাসে কোচ বদল। নতুন জমানা মানে নতুন পরিকল্পনা। নতুন পরিকল্পনা মানে আবার শূন্য থেকে শুরু। আর আবার শুরু মানেই পিছিয়ে যাওয়া।
ধ্বসের মধ্যে খানিক আলো শুধু কেরলে। কেরল সুপার লিগ দেখাচ্ছে কীভাবে রাজ্যস্তরেও ভরা গ্যালারি ফিরতে পারে। লাখ লাখ মানুষ মাঠে আসছে, খেলোয়াড়েরা মরিয়া, প্রতিটি দলের সঙ্গে জেলার আবেগ জুড়ে গিয়েছে। এই জায়গাটা ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ হবে, যদি বাংলা ও অন্যান্য রাজ্যও নিজের সুপার লিগ চালু করতে পারে।
কিন্তু মূল প্রশ্নটা এখানেই—একটা লিগ খেললেই কি জাতীয় দল উন্নতি করবে? জবাব: না। জাপান–কোরিয়া–ইরান–সৌদি—তারা সবাই এগিয়ে গিয়েছে। কারণ তাদের সামনে একটা স্পষ্ট পথ ছিল। ধৈর্য ছিল। কাঠামো ছিল। ভারতের সেই রোডম্যাপ উধাও। বাংলাদেশের কাছে হারের পর টিম–ম্যানেজমেন্ট মুখ লুকোনোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু সত্যিটা কাল রাতের পারফরম্যান্সে মাঠেই লেখা—ভারত শুধু ম্যাচে হারেনি, হারিয়েছে কয়েক দশকের অর্জন ও আত্মবিশ্বাস।