গুয়ার্দিওলা আবার প্রমাণ করলেন—ফুটবলে ছক ভাঙাই তাঁর আদত স্বভাব। খেলোয়াড় বদলালেও দর্শন পালটায় না। জায়গা খুঁজে নেওয়া, ফাঁক তৈরি করা, আর মুহূর্তে আঘাত—এই তিনেই তৈরি হচ্ছে নতুন সিটির আক্রমণ-তুফান!

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 23 February 2026 16:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফর্মেশন আগে না ফুটবলার?
প্রশ্নের সদুত্তর আজও অধরা। সাধারণত, ম্যানেজারদের একটা বিশেষ দর্শন থাকে। সেই মোতাবেক তাঁরা ঘুঁটি সাজান। খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষিত করে তোলেন। রণকৌশলে খাপ খাওয়ানোর মতো না হলেও ট্রেনিং চলে। কখনও বেঞ্চে বসিয়ে, কখনও প্রথম একাদশে রেখে আত্মবিশ্বাস ফেরানোর চেষ্টা। তারপর ধাপে ধাপে দলের সিস্টেমের উপযুক্ত করে তোলা!
ফুটবলে সিংহভাগ কোচই এই তত্ত্ব মেনে নির্দিষ্ট ছকে দল সাজান। টিম খারাপ পারফর্ম করলে কিংবা আস্থাভাজন খেলোয়াড়রা চোট-আঘাতে বাদ গেলেও নিজেদের দর্শন থেকে একচুল সরে আসেন না। পেপ গুয়ার্দিওলা (Pep Guardiola) যদিও তেমন ম্যানেজারের গোত্রভুক্ত নন, তিনি বরাবরই অন্য রকম। তাঁর দর্শন একটাই—খেলোয়াড় যেমন, কৌশলও তেমন হওয়া জরুরি। আর সেই কারণেই চলতি মরসুমে ম্যানচেস্টার সিটি (Manchester City) উইঙ্গার ছাড়া খেলেও আক্রমণে আগুন ঝরাচ্ছে। গোল করছে অনায়াসে। ডিফেন্সের ভুলে নড়বড়ে দেখালেও হালান্ডদের আক্রমণের ঝাঁজ কিন্তু এতটুকু কমেনি।
খালি চোখে দেখলে, চিরাচরিত ৪-৩-৩ ছক থেকে সরে এসে এখন সিটির ভরসা ৪-২-২-২। মানে দুই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, তাদের সামনে দুই আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার আর একসঙ্গে আপ ফ্রন্টে জোড়া স্ট্রাইকার। শুনতে সরল। কিন্তু ভেতরের নড়াচড়া, পজিশন বদল এবং ফাঁকা জায়গা তৈরি—এ সবই আসলে এই সিস্টেমের আসল শক্তি হয়ে উঠেছে।
উইঙ্গার নেই, তবু প্রস্থ বাড়ছে কীভাবে?
সাধারণত উইঙ্গারের কাজ হল মাঠ চওড়া রাখা। ডান-বাঁ দিক দিয়ে দৌড়ে রক্ষণ টেনে ছিঁড়ে দেওয়া। কিন্তু জেরেমি ডকু (Jeremy Doku) আর সাভিনহো (Savinho) চোটে থাকায় সেই প্রোফাইল কমে গিয়েছিল। আফ্রিকা কাপ থেকে ফিরে আসেন ওমর মারমুশ (Omar Marmoush)—তিনি আবার সেন্ট্রাল পজিশনে খেলতে স্বচ্ছন্দ।

ঠিক তখনই প্ল্যান-বি ছকে বসলেন গুয়ার্দিওলা। ভাবলেন—উইঙ্গার নেই তো কী হয়েছে, জায়গা তো তাদের ছাড়াও বানানো যায়! এখন যে ছকে খেলছে সিটি, ৪-২-২-২, তার সামনে থাকছেন এরলিং হল্যান্ড (Erling Haaland) আর মারমুশ। ঠিক পেছনে দুই ‘নম্বর ১০’—কখনও অঁতোয়ান সেমেনিয়ো (Antoine Semenyo), কখনও রায়ান শেরকি (Rayan Cherki) বা তিজানি রেইনডার্স (Tijjani Reijnders)। এঁরা কেউই উইং লাইনে আটকে থাকেন না। বরং, প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের মাঝের ফাঁক—যাকে বলে ‘বিটুইন দ্য লাইনস’—সেখানে জায়গা খোঁজেন। ফলে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। উইঙ্গার না থাকলেও মাঠ চওড়া হয়ে যায় স্রেফ খেলোয়াড়দের নড়াচড়ায়।
মাঝমাঠে ভিড়, তারপর হঠাৎ আঘাত
উদ্দিষ্ট কৌশলের বড় শক্তি মাঝমাঠে সংখ্যাধিক্য। ধরুন, রদ্রি (Rodri) বল পেলেন। তাঁর সামনে শেরকি বা সেমেনিয়ো একটু এগিয়ে গিয়ে ডিফেন্ডারের নজর ঘোরালেন। সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে অন্য কেউ ফাঁকা জায়গায় ঢুকে পড়লেন।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় উলভসের বিরুদ্ধে ম্যাচ। সেমেনিয়োর গোলের আগে মাঝমাঠে এমনই একটা ছোট ওভারলোড তৈরি হয়েছিল। এক ডিফেন্ডার এগোতেই পেছনে তৈরি হয় ফাঁক। সেমেনিয়ো প্রথম টাচে সেই জায়গায় ঢুকে গোল করে দেন। এই ছক আসলে প্রতিপক্ষকে ভুল করতে বাধ্য করে। ডিফেন্ডার সামনে উঠবেন? নাকি পেছনে থাকবেন? এক সেকেন্ডের দেরিতেই তৈরি হয় সুযোগ।
স্ট্রাইকার কখনও ফাঁদ, কখনও আসল অস্ত্র
গুয়ার্দিওলার আরেক বড় চাল—স্ট্রাইকারকে ‘ডিকয়’ বা ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার। যেমন, নিউক্যাসলের বিরুদ্ধে ম্যাচে মারমুশ মাঝমাঠে নেমে বল চাইতেই ডিফেন্ডার একটু এগোলেন। সেই ফাঁকে রেইনডার্স ঢুকে গেলেন পেছনে।

শুধু তাই নয়। কখনও হল্যান্ড পেছনের পোস্টে ছুটে গিয়ে দুই ডিফেন্ডারকে টেনে নেন। তাতে বক্সের মাথায় জায়গা তৈরি হয়। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা শেরকি বা অন্য কেউ শট নিতে পারেন। মানে, সামনে থাকা দুই স্ট্রাইকার শুধু গোল করার জন্য নন। তাঁরা জায়গা বানানোর কাজও করছেন।
দেরিতে বক্সে ঢোকা—গোপন অস্ত্র
এই সিস্টেমে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ‘লেট রান’। মানে, মাঝমাঠের খেলোয়াড় হঠাৎ করে বক্সে ঢুকে পড়ছেন। প্রতিপক্ষ তখন স্ট্রাইকার সামলাতে ব্যস্ত। ফলে সেই অতিরিক্ত দৌড় চোখ এড়িয়ে যায়। নিউক্যাসলের বিরুদ্ধে নিকো ও’রাইলির (Nico O’Reilly) জয়সূচক গোল এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। হল্যান্ড বল তুলতেই ডিফেন্স পিছিয়ে যায়। মাঝের ফাঁকে ও’রাইলি ঢুকে হেড করেন। সাধারণ চোখে সহজ গোল। কিন্তু পরিকল্পনা নিখুঁত।

৪-২-২-২ কি স্থায়ী ছক?
উইঙ্গাররা ফিরলে কি আবার ৪-৩-৩? গুয়ার্দিওলা নিজে বলেছেন—‘দেখা যাবে!’ আসলে তাঁর দর্শন এমনই—প্রথাবদ্ধ ছকে স্থির নয়। খেলোয়াড়ের গুণ আর প্রতিপক্ষের সেট-আপ অনুযায়ী বদলে যায়। এই নমনীয়তা সিটির অন্যতম শক্তি। একই দল কখনও চওড়া, কখনও সরু। কখনও পাসে পাসে কেটে যায়, কখনও লম্বা বলেও আঘাত করে।
এমনিতে ফুটবলে জায়গা তৈরি করাই আসল কাজ। আগে সেটা করতেন উইঙ্গাররা। এখন সেটা করছে পজিশন বদল আর বুদ্ধিমান দৌড়। উইঙ্গার না থাকলেও আক্রমণ থেমে নেই। বরং, নতুন পথে চলছে।
সব মিলিয়ে গুয়ার্দিওলা আবার প্রমাণ করলেন—ফুটবলে ছক ভাঙাই তাঁর আদত স্বভাব। খেলোয়াড় বদলালেও দর্শন পালটায় না। জায়গা খুঁজে নেওয়া, ফাঁক তৈরি করা, আর মুহূর্তে আঘাত—এই তিনেই তৈরি হচ্ছে নতুন সিটির আক্রমণ-তুফান! উইঙ্গার ছাড়াই যদি এমন ধার থাকে, তবে উইঙ্গার ফিরলে? জবাব নিশ্চয় নোটবুকে লিখে রেখেছেন পেপ।