বিশ্বকাপ না জেতার কারণ আফ্রিকার অক্ষমতা নয়। সমস্যা ব্যবস্থার। প্রতিভা আছে, স্বপ্ন আছে। প্রশ্ন একটাই—সেই প্রতিভাকে ধরে রাখার, গড়ে তোলার সাহস আর সদিচ্ছা কি আফ্রিকান ফুটবল নেতৃত্ব দেখাতে পারবে?

ছবি: গুগল
শেষ আপডেট: 21 January 2026 15:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: স্যামুয়েল এটো, দিদিয়ের দ্রোগবা, মহম্মদ সালাহ, মাইকেল এসিয়েন, ইয়া ইয়া টোরে… তালিকা ক্রমশ বড় হতে পারে। জুড়তে পারে অন্তত খানকুড়ি নাম। তাঁদের কেউ উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন, কেউ ইউরোপের সেরা লিগ। প্রতিভার নিরিখে তারতম্য হতে পারে। কিন্তু লম্বা লিস্টির মধ্যে বড় মিল এক জায়গায়—এই সমস্ত তারকা ফুটবলার, জন্মসূত্রে যাঁরা আফ্রিকান, কেউই হাতে বিশ্বকাপ তোলেননি। এমনকি ফাইনালে উঠে রানার্সের মেডেল—জোটেনি সেটাও!
কিন্তু কেন? দুরন্ত ফুটবলারদের আঁতুড়ঘর হয়েও ঘানা, আইভরি কোস্ট, সেনেগাল, মরক্কো পারল না বিশ্বকাপ জিততে—কোথায় রয়ে গেল ফাঁক? সাধ্যের বাইরে—ভাবাটা ভুল। তাহলে অধরা খেতাবকে ব্যাখ্যা করব কীভাবে?
অর্থের অঙ্ক: লড়াই শুরুর আগেই পিছিয়ে আফ্রিকা
সত্যি বলতে, বিশ্বকাপ জেতা আজ নিছক প্রতিভার খেলা নয়। এ এক বহুস্তরীয় শিল্প—ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ডেটা অ্যানালিটিক্স, স্পোর্টস সায়েন্স, কোচিং স্টাফ, লজিস্টিক্স—সব মিলিয়ে বিপুল বিনিয়োগের ফসল। যেখানে আফ্রিকা অনেকটা পিছিয়ে।
একটি উদাহরণই যথেষ্ট। হিসেব বলছে, ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (The FA) বার্ষিক বাজেট প্রায় ৩৭০ মিলিয়ন পাউন্ড। তুলনায় সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশনের (Senegal FA) বাজেট বিভিন্ন সময়ে রিপোর্ট অনুযায়ী চার-পাঁচ লক্ষ ডলারের আশেপাশে। এই অর্থে না গড়ে ওঠে আধুনিক ট্রেনিং সেন্টার, না রাখা যায় বিশ্বমানের মেডিক্যাল সাপোর্ট।
আরও ভয়াবহ তথ্য—কনফেডারেশন অফ আফ্রিকান ফুটবলের (CAF) সবচেয়ে দামি ফুটবলার ভিক্টর ওসিমেনের (Victor Osimhen) বাজারদর অনেক সময়ই গোটা আফ্রিকার সবচেয়ে দামি ক্লাব আল আহলির (Al Ahly) চেয়েও বেশি। অর্থাৎ, ব্যক্তি প্রতিভা আছে, কিন্তু তাকে ঘিরে দাঁড় করানোর মতো আর্থিক কাঠামো নেই। ফিফা (FIFA) উন্নয়ন তহবিল দেয় ঠিকই। কিন্তু অনেক আফ্রিকান দেশ প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে সেই টাকা সময়মতো ব্যবহার করতে পারে না। ফলাফল—প্রতিভা থাকলেও প্রস্তুতির স্তরে আফ্রিকা বারবার হেরে যায় ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার কাছে।
প্রতিভার রফতানি: আফ্রিকা শুধুই ‘সাপ্লায়ার’?
আফ্রিকা আজ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিভার ভাঁড়ার। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে পাঁচশোর বেশি আফ্রিকান ফুটবলার খেলছেন। প্রিমিয়ার লিগে (Premier League) আফ্রিকান খেলোয়াড়দের অংশীদারিত্ব ক্রমশ বেড়েছে। মহম্মদ সালাহ (Mohamed Salah), সাদিও মানে (Sadio Mane)—অবসরের আগেই ক্লাব ফুটবলের কিংবদন্তি।
কিন্তু যত সমস্যা জাতীয় দলে! এই খেলোয়াড়রা সারা বছর বিভিন্ন ক্লাবে, আলাদা আলাদা সিস্টেমে খেলেন। জাতীয় দলের জন্য হাতে থাকে মাত্র কয়েকটা ফিফা উইন্ডো। তুলনায় ইউরোপীয় দলগুলোর অনেক খেলোয়াড়কে একই লিগ, এমনকি একই ক্লাবে নিয়মিত নামতে হয়। ফলে ট্যাকটিক্যাল বোঝাপড়া অনেক বেশি গভীর।
বড় সমস্যা দেশের লিগও। আফ্রিকার বেশিরভাগ ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আধা-পেশাদার। ফলে প্রতিভাবান কিশোরদের খুব অল্প বয়সেই ইউরোপে পাড়ি দিতে হয়। দেশের মাটিতে গড়ে ওঠে না শক্তিশালী লিগ কালচার। জাতীয় দল তৈরি হয় মূলত ‘বিদেশফেরত’ খেলোয়াড়ে—যাঁরা একসঙ্গে খেলেই অভ্যস্ত নন। এই কারণে বিশ্বকাপের মতো লম্বা টুর্নামেন্ট, যেখানে ধারাবাহিকতা আর দলগত সংহতি সবচেয়ে জরুরি, আফ্রিকান দলগুলো শেষ ধাপে গিয়ে হোঁচট খায়।
প্রশাসন ও অস্থিরতা: ফুটবলের ভিত নড়বড়ে কেন?
আফ্রিকান ফুটবলের আরেক বড় সমস্যা কাঠামোগত দুর্বলতা। অনেক দেশে ফুটবল ফেডারেশন চলে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্নীতি আর হাতেগোনা দাপুটে কর্তাব্যক্তির অঙ্গুলিহেলনে। সেখানে উন্নয়ন তহবিল কোথায় গেল, কোচ বদল হল কেন—এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর মেলে না।
কোচিংয়ের ক্ষেত্রেও স্থায়িত্বের অভাব প্রকট। কয়েকটা খারাপ ম্যাচ হলেই ম্যানেজার বদল। কখনও বিদেশি কোচ, কখনও স্থানীয়—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। ১৯৯০ সালে ক্যামেরুন (Cameroon) কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল ভ্যালেরি নেপোমনিয়াশচির (Valeri Nepomnyashchi) নেতৃত্বে। ২০০২-এ সেনেগাল সেমিফাইনালের দোরগোড়ায় পৌঁছেছিল ব্রুনো মেতসুর (Bruno Metsu) হাত ধরে। কিন্তু এই সাফল্যগুলো ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার মতো দশ-পনেরো বছরের ফুটবল রোডম্যাপ আফ্রিকার অধিকাংশ দেশে নজরে আসে না। ফলে প্রতিটি বিশ্বকাপের আগে দল তৈরি হয় ‘শেষ মুহূর্তের জোড়াতালি’ দিয়ে!
ইতিহাস, আক্ষেপ আর আশার আলো
তবু আফ্রিকা একেবারে অন্ধকারে নেই। ইতিহাস বলছে ধীরে ধীরে দেওয়াল ভাঙছে। মিশর (Egypt) প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিল ১৯৩৪ সালে। মরক্কো (Morocco) ১৯৮৬-তে প্রথম নকআউটে উঠল। ক্যামেরুন ১৯৯০, সেনেগাল ২০০২, ঘানা (Ghana) ২০১০—কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছে। ২০২২ সালে মরক্কোর সেমিফাইনাল অভিযানে প্রমাণ—সঠিক বিনিয়োগ, ডায়াসপোরা ট্যালেন্ট আর পরিকল্পনা মিললে অসম্ভব কিছু নয়। ২০২৬ বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা বাড়ছে। আফ্রিকার কোটাও চড়ছে। এতে সুযোগ হাতে আসবে ঠিকই। কিন্তু শুধু পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা নয়, দরকার কাঠামোগত পরিবর্তন—স্বচ্ছ প্রশাসন, শক্তিশালী লিগ, কোচিং ধারাবাহিকতা।
সত্যি বলতে, বিশ্বকাপ না জেতার কারণ আফ্রিকার অক্ষমতা নয়। সমস্যা ব্যবস্থার। প্রতিভা আছে, স্বপ্ন আছে। প্রশ্ন একটাই—সেই প্রতিভাকে ধরে রাখার, গড়ে তোলার সাহস আর সদিচ্ছা কি আফ্রিকান ফুটবল নেতৃত্ব দেখাতে পারবে?
দেওয়ালটা এখনও ভাঙেনি। কিন্তু ফাটল ধরেছে।