এই সাফল্য হঠাৎ আসেনি। সরকার গত কয়েক বছরে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ছোট মাঠ বানিয়েছে, অ্যাকাডেমি তৈরি হয়েছে, বদল আনা হয়েছে কোচিং পদ্ধতিতেও। আড়ালে একটাই কারণ: বাজেট চার বছরে দ্বিগুণ বৃদ্ধি।

উজবেকিস্তান ফুটবল টিম
শেষ আপডেট: 31 March 2026 16:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মেট্রো স্টেশনে ছবি তোলা নিষিদ্ধ ছিল। ব্যাংকে ঢুকতে পরিচয়পত্র লাগত। বিদেশি পর্যটকদের জন্য কোনও এটিএম ছিল না। মসজিদে যাওয়াও ছিল যথেষ্ট ঝুঁকির।
গল্পকথা নয়, মাত্র দশ বছর আগে উজবেকিস্তান ছিল এমনই এক ‘অচলায়তন’! আর আজ? সেই ‘তাসের দেশ’ আমূল বদলে গিয়েছে। যারা খেলতে নামবে ফিফা বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026)। ইতিহাসে প্রথম! এটা শুধু ফুটবলের ‘আরও একফালি তথ্য’ নয়… এ এক রাষ্ট্রের বদলে যাওয়ার কাহিনি।
যে দেশ ছিল ‘উত্তর কোরিয়ার ছোট ভাই’
তাসখন্দের (Tashkent) সংবাদপত্র ‘দ্য তাসখন্দ টাইমস’-এর সম্পাদক আকবর ইউসুপভ গোটা পালাবদলের সাক্ষী। তাঁর কথায়, ‘দশ বছর আগের আর এখনকার উজবেকিস্তানের মধ্যে ফারাক আকাশপাতাল!’ ২০১৬ সালে স্বৈরাচারী শাসক ইসলাম করিমভ মারা যাওয়ার পর দেশ বদলাতে শুরু করে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর থেকে ২৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন করিমভ। তাঁর আমলে বিরোধীদের নির্বিচারে হত্যা করা হত, মানবাধিকার ছিল না, ধর্মাচরণ নিষিদ্ধাচরণের কাছাকাছি।
দায়িত্ব হাতে পেয়েই নতুন প্রেসিডেন্ট শাভকাত মির্জিয়োয়েভ (Shavkat Mirziyoyev) ধীরে ধীরে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেন। এখন পর্যটন বেড়েছে, বিনিয়োগ এসেছে, ধর্মীয় স্বাধীনতা ফিরেছে। ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ম্যাচ শুরুর সময় অনেক সমর্থক বাইরে নামাজ পড়ছিলেন—দশ বছর আগে যা কল্পনাও করা যেত না!

তবু উজবেকিস্তানকে পুরোপুরি মুক্ত রাষ্ট্র বলা যাবে কি? বিরোধী দল আজও স্বীকৃত নয়, এলজিবিটি সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতনের অভিযোগ আসছে, ২০২২ সালে কারাকালপাকস্তান অঞ্চলে বিক্ষোভ দমনে ২১ জন মারা যান। সব আঁধার হয়তো মোছেনি। কিন্তু যা ছিল, তার চাইতে শুভ পরিবর্তন যে এসেছে, মানতে কারও অসুবিধে নেই।
বিশ্বকাপ খেলার গুরুত্ব
উজবেকিস্তান ফুটবলের সবচেয়ে বড় ‘কষ্টের স্মৃতি’ ঘনিয়ে উঠেছিল আজ থেকে ১০ বছর আগে। ২০০৬ সাল। তখন জাতীয় দল ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৪৫তম—এখনকার (৫০) চাইতেও ধারাবাহিক, শক্তিশালী। বাহারিনের বিরুদ্ধে দু’লেগের প্লে-অফে প্রথম লেগ ১-০ জিতেছিল উজেবেকরা। কিন্তু রেফারির ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আবার খেলতে হয়। সেই রিপ্লেতে ড্র এবং দ্বিতীয় লেগও গোলশূন্য স্কোরলাইনে শেষ হওয়ায় অ্যাওয়ে গোলের অঙ্কে বিশ্বকাপের টিকিট ছিনিয়ে নেয় বাহারিন। স্বপ্নভঙ্গের সাক্ষী থাকে উজবেকিস্তান।

এরপর ২০১৪। ফের দুঃস্বপ্ন… আরও একবার! সেবার গোলের ফারাকে মিস। ২০১৮-তে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে গ্রুপের শেষ খেলায় ০-০ ড্র—দুই পয়েন্টের ফারাকে স্পট হাতছাড়া। তিনবারের হতাশার পর আরব আমিরশাহির বিরুদ্ধে ০-০ ড্রয়ে এবার বিশ্বকাপে নামা নিশ্চিত হয়েছে। খবর পাকা হতেই তাসখন্দে উল্লাসের যে দৃশ্য দেখা গিয়েছে, তা বিশ্বকাপজয়ীদের সংবর্ধনার সঙ্গে তুলনীয়।
মাঠে উঠে আসছে নতুন প্রজন্ম
এই সাফল্য হঠাৎ আসেনি। সরকার গত কয়েক বছরে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার ছোট মাঠ বানিয়েছে, অ্যাকাডেমি তৈরি হয়েছে, বদল আনা হয়েছে কোচিং পদ্ধতিতেও। আড়ালে একটাই কারণ: বাজেট চার বছরে দ্বিগুণ বৃদ্ধি। ২০২৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ দল বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে, স্পেনের সঙ্গে ড্র করেছে, অনূর্ধ্ব-২০ টিম এশিয়ান কাপ জিতেছে, ২০২৪ অলিম্পিক্সে অনূর্ধ্ব-২৩ দল প্রথমবার খেলেছে। এবারের সাফল্যকে তাই বিচ্ছিন্নভাবে দেখাটা ঠিক হবে না!
চলতি প্রজন্মের অন্যতম মুখ? পোস্টার বয়? সেটা একজনই… ম্যানচেস্টার সিটির (Manchester City) ২২ বছরের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার আবদুকোদির খুসানভ (Abdukodir Khusanov)। সমরখন্দের বাজারে এক তরুণ ব্যবসায়ী ইংরেজি না জানলেও ‘খুসানভ, ম্যানচেস্টার সিটি, প্রিমিয়ার লিগ’-টুকু বলতে পারেন!

কানাভারো চান ‘যোদ্ধা’
বিশ্বকাপের জন্য কোচ হিসেবে আনা হয়েছে ফাবিও কানাভারোকে (Fabio Cannavaro)। যিনি ২০০৬ সালে ইতালির অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জেতেন। কানাভারোর কথায়, ‘আমি যোদ্ধা চাই। সবসময় তীব্রতা চাই। পর্তুগাল বা কলম্বিয়া—কাউকে ভয় পাই না!’
গ্রুপে দুই শক্তিশালী টিম। সহজ নয়। কিন্তু উজবেকরা স্বপ্ন দেখছে। তাই হাজারো সমর্থক পকেটের টাকা গুণে আমেরিকায় যাবেন। আন্দিজান শহরের ঢোল-ট্রাম্পেটের গ্রুপ আগে থেকে মার্কিন মুলুকে গিয়ে উজবেক সমর্থকদের ‘চিৎকারে’র ট্রেনিং দেবে বলেও জানা গিয়েছে। মাঠে-মাঠের বাইরে… উজবেকিস্তানের প্রস্তুতিতে কিন্তু এতটুকু ঢিলেমি নেই।