স্রেফ ইন্টার মিলানকে হারিয়েছে বলে নয়, তাদের আসল জয় হয়তো আরও আগে—যেদিন তারা হার-মানার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে নিজেদের বিশ্বাস করতে শিখেছিল। এক যুদ্ধবিমানচালকের শেখানো মন্ত্রে দেখেছিল বিশ্বমঞ্চে দাপট দেখানোর স্পর্ধা।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 27 February 2026 15:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নরওয়ের উত্তরের ছোট্ট শহর বোডো। লোকাল ক্লাব হিসেবেই ঘরোয়া ফুটবল লিগে নাম কুড়িয়েছিল বোডো/গ্লিম্ট (Bodo/Glimt)। ঘরোয়া লিগে উত্থান। ধাপে ধাপে কৌলীন্য অর্জন। শৃঙ্গ আরোহণের পেছনে না ছিলেন বিলিয়ন ডলারের কোনও মালিক, না তারকাখচিত স্কোয়াড। বোডো-র ক্রমিক সাফল্যকে কাছ থেকে দেখেছেন যাঁরা, তাঁদের নজরে এই ক্লাবের সংস্কৃতি আর মানসিকতা বদলে দিয়েছেন যিনি, তিনি আদতে একজন যুদ্ধবিমানচালক!
কীভাবে? জানতে ফিরে যেতে হবে ২০১৭-তে। সেবার আকস্মিক বিপর্যয়! সদ্য নরওয়ের দ্বিতীয় বিভাগে নেমে গেছে বোডো। ড্রেসিংরুমে একরাশ হতাশা, গাঢ় অন্ধকার। মুক্তি মিলবে কীসে? আলোর খোঁজে ক্লাব বসল আপৎকালীন মিটিংয়ে। সবশেষে যৌথ সম্মতিতে নেওয়া হল ছকভাঙা সিদ্ধান্ত। স্কোয়াডের ভঙ্গুর, ক্ষয়িষ্ণু মনোবলকে চাঙ্গা করতে ডাক পড়ল বিয়র্ন মান্সভার্কের (Bjorn Mannsverk)—যিনি পেশায় প্রাক্তন রয়্যাল নরওয়েজিয়ান এয়ার ফোর্সের (Royal Norwegian Air Force) স্কোয়াড্রন লিডার। আফগানিস্তান, লিবিয়ায় মিশন উড়িয়েছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে যেভাবে মানসিক প্রস্তুতি নিতেন, সেই কৌশলই তিনি নিয়ে এলেন ফুটবল মাঠে।
ভাঙা মানসিকতা থেকে নতুন সংস্কৃতি
মান্সভার্ক দলের সঙ্গে কথা বলে প্রথমেই বুঝেছিলেন—সমস্যা ট্যাকটিক্যাল নয়, মানসিকতায়। কোনও খেলোয়াড় সামান্য ভুল করলে গোটা টিম হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ছে। গোল খেলে ছড়িয়ে পড়ছে অস্থিরতা।
যা দেখামাত্র তিনি ড্রেসিংরুমে আনলেন নতুন নিয়ম: ব্যক্তিগত দুর্যোগ কিংবা অনুভূতি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা যাবে। স্ট্রেস কমাতে চালু হবে মেডিটেশন। অনুশীলন, খাবার, ঘুম—সবকিছু সাজানো রুটিনে। আর খেলোয়াড়দের প্রত্যেককে মনে রাখতে হবে একটাই মূল মন্ত্র: যেভাবে ম্যাচে খেলবে, ঠিক সেভাবেই প্রতিদিন অনুশীলন করো। সমস্ত ছোট-বড় কাজ—পাস, রিসিভ, দৌড়—শতভাগ মনোযোগ দিয়ে। যুদ্ধবিমানের ককপিটে যেমন ভুলের সুযোগ নেই, তেমন মাঠেও নির্ভুল পারফরম্যান্স জরুরি।
শুরুতে এই ধারণা অদ্ভুত মনে হয়েছিল অনেকের। কিন্তু ফল ফলতে সময় লাগেনি! দ্বিতীয় বিভাগ থেকে এক লাফে শীর্ষ লিগে প্রত্যাবর্তন। তারপর ২০২০ সালে ক্লাবের ইতিহাসে প্রথম লিগ শিরোপা। ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি দল, এক শতাব্দীরও বেশি অপেক্ষার পর প্রথমবার নরওয়ে-সেরা!
ছোট শহরের বড় সাহস
বোডো শহরের জনসংখ্যা মাত্র ৬০ হাজারের কাছাকাছি। রাজধানী অসলো (Oslo) থেকে হাজার কিলোমিটার উত্তরে, আর্কটিক সার্কেলে। আবহাওয়া কঠিন, নাগরিকদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য সীমিত। তবু গত পাঁচ সিজনে চারবার লিগ জিতেছে এখানকার ক্লাব বোডো/গ্লিম্ট। পাশাপাশি ইউরোপেও দেখিয়েছে চমক। জোসে মোরিনহোর (Jose Mourinho) রোমাকে ৬–১ ব্যবধানে হারানো, চলতি সিজনে ম্যানচেস্টার সিটি (Manchester City), আতলেতিকো মাদ্রিদ (Atletico Madrid) ও ইন্টার মিলানের (Inter Milan) মতো দলকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় ওঠা—এগুলো আর ‘ভাগ্যের কৃপাদৃষ্টি’ এড়ানো যাচ্ছে না।
এহেন উত্থানের আরও এক নাবিক যিনি, তিনি কোচ খেতিল নুটসেন (Kjetil Knutsen)। ২০১৮ সালে দায়িত্ব নিয়ে মান্সভার্কের ‘মানসিক প্রকল্পে’ আস্থা রাখেন। সমর্থন জানান। খেলোয়াড় কেনাবেচার বদলে সংস্কৃতি গড়ে তোলায় জোর দেন। ক্লাবের পরিচয় হয়ে ওঠে একসঙ্গে শেখা, একসঙ্গে বেড়ে ওঠা।
নেতৃত্বের নতুন সংজ্ঞা
বোডো/গ্লিম্টের দলে কোন একজন অধিনায়ক নেই। আটজনের একটি ‘ঘূর্ণায়মান-দল’ দল পরিচালনা করে। পরিস্থিতি অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগাভাগি। গোল খেলে গোটা দল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গোল হয়ে দাঁড়ায়—যা মান্সভার্কের ভাষায় “বোডো/গ্লিম্ট রিং”! ছোট্ট, জরুরি আলোচনায় অভিযোগ-দোষারোপ নয়, চলে বিচার-বিশ্লেষণ। কে কোথায় ভুল করল, কীভাবে ঠিক করা যায়—এই আলোচনা। আড়ালে নয়, সবার সামনে।
আরও বিস্ময়কর, বোডো টিম ম্যানেজমেন্ট নির্দিষ্ট ফলের লক্ষ্য ঠিক করে না। শিরোপা জিততেই হবে—এই চাপ নেই। টার্গেট একটাই: নিজেদের সেরা পারফরম্যান্স মেলে ধরা। শুনতে সাদামাটা, কিন্তু করে দেখানো কঠিন। এর জন্য দরকার প্রতিদিনের শৃঙ্খলা, ইতিবাচক আনুগত্য।
মান্সভার্কের সামরিক জীবনে ‘রোজকার একঘেয়ে কাজ ১০০ শতাংশ মনোযোগ নিয়ে করা’ ছিল মূলমন্ত্র। ফুটবলেও সেই একই রুটিন। ছোট দায়িত্বগুলো নিখুঁত হলে বড় ফল আসবেই আসবে—এই বিশ্বাস গোটা দলকে বদলে দিয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফুটবল মাঠ
লিবিয়ায় মিশনে যাওয়ার আগে পাইলটদের মানসিক প্রস্তুতি নিতে হত। ভয়কে স্বীকার করা, তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, সহযোদ্ধায় আস্থাজ্ঞাপন—সবই ছিল প্রশিক্ষণের অঙ্গ। মান্সভার্ক বুঝেছিলেন, ফুটবল মাঠেও চাপ একইভাবে কাজ করে। পার্থক্য শুধু প্রাণহানির নয়, ফলাফলেরও বটে। বোডো/গ্লিম্ট সেই সামরিক শৃঙ্খলাকে ফুটবলে রূপান্তর করেছে। তারা যে প্রতিপক্ষকে ভয় পায় না, এর আসল কারণ ফুটবলারদের প্রস্তুতি ফলাফলের চেয়েও গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ৷ এক ধরনের মানসিক স্থিতি তৈরি হয়েছে—যা বড় মঞ্চেও অটল৷
উত্থানের ভিত শক্ত
এই গোটা গল্পে অলৌকিক কিছু নেই। আছে ধারাবাহিক কাজ, সংস্কৃতি, মানসিক দৃঢ়তা। ছোট শহরের ক্লাব বড় স্বপ্ন দেখেছে, কিন্তু স্বপ্নকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করেছে। যা ফুটবল না-দেখা পাঠকের কাছেও প্রাসঙ্গিক। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের স্পটলাইটে আজ বোডো/গ্লিম্ট। কিন্তু স্রেফ ইন্টার মিলানকে হারিয়েছে বলে নয়, তাদের আসল জয় হয়তো আরও আগে—যেদিন তারা হার-মানার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে নিজেদের বিশ্বাস করতে শিখেছিল। এক যুদ্ধবিমানচালকের শেখানো মন্ত্রে দেখেছিল বিশ্বমঞ্চে দাপট দেখানোর স্পর্ধা।