এই রীতি আজও টিকে। কারণ এটি শুধু ফুটবল নয়, সংস্কৃতির অংশ। সাদা রুমাল এখানে কাপড় নয়—বার্তা। একসময় যা ছিল ‘ভালো খেলেছ’, আজ তা বলছে—‘এভাবে চলবে না!’

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 12 February 2026 17:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফুটবল মাঠে প্রতিবাদের ছবি আমরা অনেক দেখেছি। প্ল্যাকার্ড, ব্যানার, স্লোগান, কালো কাপড়। কিন্তু মাদ্রিদের সান্তিয়াগো বের্নাবেউ (Santiago Bernabeu) স্টেডিয়ামে হাজার হাজার সমর্থক একসঙ্গে সাদা রুমাল ওড়াচ্ছেন—এই দৃশ্য প্রথমবার দেখলে খানিক চমক লাগতেই পারে।
এমনিতে ভিনিসিয়াস-এমবাপেরা ফর্মে নেই। রাগে ফুঁসছেন সমর্থকেরা। দল নিয়ে ক্ষোভ চরমে। অথচ প্রতিবাদের ভাষা? সাদা রুমাল! সম্প্রতি লা লিগায় লেভান্তে-র (Levante) বিরুদ্ধে ম্যাচে এই দৃশ্য শেষবার দেখা গেছে। তার আগে স্প্যানিশ সুপারকাপ ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনা-র (FC Barcelona) কাছে হার, কোপা দেল রে থেকে বিদায়—সব মিলিয়ে সমর্থকদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙেছে। খেলোয়াড়দের উদ্দেশে তীক্ষ্ম শিস, কোচ আলভারো আরবেলোয়া-র (Alvaro Arbeloa) নাম করে কটূক্তি, এমনকি প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের (Florentino Perez) পদত্যাগের দাবি… রোষের তালিকা ক্রমশ লম্বা হচ্ছে। কিন্তু তাই বলে সাদা রুমাল ওড়ানো! এই রীতি কোথা থেকে এল? আর কেন-ই বা এত বছর পরেও তা টিকে আছে?
ষাঁড়ের লড়াই থেকে ফুটবল: রীতির শিকড়
স্পেনে সাদা রুমাল ওড়ানো নতুন কিছু নয়। এর জন্ম ফুটবলে নয়, ঐতিহ্যবাহী ষাঁড়ের লড়াইয়ে। ১৮ ও ১৯ শতকে যখন বুলফাইটিং ছিল দেশের সবচেয়ে লোকপ্রিয় জনবিনোদন, তখন দর্শকেরা সাদা রুমাল ওড়াতেন এক বিশেষ কারণে। যদি কোনও ‘মাতাদোর’ অসাধারণ লড়াই করতেন, রুমাল নেড়ে বিচারককে অনুরোধ জানাতেন দর্শকরা—তাঁকে সম্মান দেওয়া হোক। কখনও মৃত ষাঁড়ের একটি কান, কখনও দুই কান—এগুলোই ছিল পুরস্কার। অর্থাৎ, শুরুতে রুমাল ওড়ানো হয়ে ওঠে প্রশংসার স্মারক।

পাঁচের দশকে ফুটবল যখন স্পেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হয়ে ওঠে—আলফ্রেডো দি স্টেফানো (Alfredo Di Stefano), ফেরেঞ্চ পুসকাস (Ferenc Puskas), পাকো হেন্তোদের (Paco Gento) জমানায়—তখন বুলরিং থেকে স্টেডিয়ামে এসে পৌঁছয় সেই রীতি। প্রথমদিকে দর্শকেরা দুর্দান্ত গোল বা অসাধারণ খেলার প্রশংসায় রুমাল ওড়াতেন। ধীরে ধীরে তার অর্থ বদলাতে শুরু করে।
প্রশংসা থেকে প্রতিবাদ: রুমালের ভাষা বদলে গেল
ফুটবলে রুমাল ওড়ানো খুব দ্রুত প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে। দল খারাপ খেললে, কোচকে সরাতে চাইলে, বোর্ডের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলে—গ্যালারিতে সাদা ঢেউ উঠত। অনেক সময় তার সঙ্গে থাকত শিস, স্লোগান, সমবেত আওয়াজ। রিয়াল মাদ্রিদের (Real Madrid) ক্ষেত্রে এই রীতি বিশেষভাবে পরিচিত। কারণ, বের্নাবেউয়ের দর্শকেরা নিজেদের শুধু সমর্থক মনে করেন না, নিজেদের ‘বিচারক’-ও ভাবেন। এমনিতে রিয়াল চারটি স্প্যানিশ ক্লাবের মধ্যে একটি, যেগুলো এখনও ‘সোসিও’ সদস্যদের মালিকানায়। অর্থাৎ, সমর্থকেরাই ক্লাবের মালিক। ফলে তাঁদের মনে হয়, খেলোয়াড়-কর্তারা তাঁদের জবাবদিহি করবেন। এই মানসিকতা থেকেই সাদা রুমাল একধরনের সতর্কবার্তা। বার্তা স্পষ্ট—“আমরা খুশি নই।”
লেভান্তে-ম্যাচেও একই ছবি। ভিনি জুনিয়র (Vinicius Junior), জুড বেলিংহ্যাম (Jude Bellingham), ফেদেরিকো ভালভার্দেদের (Federico Valverde) শিস দেওয়া হয়। পেরেজের বিরুদ্ধে ওঠে ‘ফ্লোরেন্তিনো, রিজাইন’ স্লোগান। এই প্রতিবাদ কেবল পরাজয়ের জন্য নয়। সমর্থকদের একাংশের বিশ্বাস—প্রাক্তন কোচ জাবি আলোনসোকে (Xabi Alonso) যথেষ্ট সমর্থন দেওয়া হয়নি। আবার পেরেজ ক্লাবের মালিকানা কাঠামো বদলাতে চাইছেন—এই আশঙ্কাতেও জমেছে ক্ষোভ।
কেন রিয়ালেই বেশি দেখা যায়?
অন্য ক্লাবেও ‘পানোয়াদা’—অর্থাৎ রুমাল-প্রতিবাদ চোখে পড়ে। বার্সেলোনায় (FC Barcelona) হয়েছে, ভ্যালেন্সিয়ায় (Valencia) হয়েছে, অ্যাথলেটিক ক্লাবও (Athletic Club) বাদ নেই। তবু বের্নাবেউয়ের দৃশ্যটাই সবচেয়ে বেশি আলোচিত। কারণ, মাদ্রিদ স্পেনের রাজধানী। এখানে দর্শকেরা ‘সেরা হওয়া’র সঙ্গে অভ্যস্ত—সেরা শিল্প, সেরা সংস্কৃতি, সেরা দল। প্রত্যাশাও তাই আকাশচুম্বী। রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসও সেই প্রত্যাশাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৪ বারের চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়, বিশ্বসেরা তারকাদের উপস্থিতি—এ সব মিলিয়ে মানদণ্ড খুব উঁচু তারে বাঁধা। ফলে সামান্য বিচ্যুতিও মেনে নেওয়া কঠিন।

আরও একটি বিষয়ও আছে। আগে খেলোয়াড়রা শহরের মধ্যেই থাকতেন, সমর্থকদের সঙ্গে মিশতেন। এখন তাঁরা আলাদা জগতের বাসিন্দা—কড়া নিরাপত্তা, গোপনতর ব্যক্তিগত জীবন, সোশ্যাল মিডিয়ার আবরণ। ফলে গ্যালারির প্রতিবাদই সমর্থকদের প্রধান হাতিয়ার! যে কারণে রুমাল হয়ে উঠেছে প্রতীক—যেমন সম্মানের, আবার অসম্মানেরও।
রুমাল ওড়ালে ফল মেলে?
অনেক সময় ‘পানোয়াদা’-র পর দল ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সমর্থকদের চাপ খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করেছে। লেভান্তে ম্যাচের পর রিয়াল বড় জয় পেয়েছিল ইউরোপেও। কিন্তু সবসময় এই কৌশল কাজে দেয় না। যদি দলে গুণগত ঘাটতি থাকে বা ড্রেসিংরুমে ঐক্য না থাকে—তাহলে প্রতিবাদের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী। তবু এই রীতি আজও টিকে। কারণ এটি শুধু ফুটবল নয়, সংস্কৃতির অংশ। সাদা রুমাল এখানে কাপড় নয়—বার্তা। একসময় যা ছিল ‘ভালো খেলেছ’, আজ তা বলছে—‘এভাবে চলবে না!’
রিয়াল মাদ্রিদের গ্যালারিতে তাই রাগ গনগনে, ক্রোধের রংও লাল, তবু ভাষা এখনও সাদা।