ফুটবলের কিংবদন্তিতে লেখা থাকবে ব্রাজিল বিশ্বকাপ (Brazil World Cup)। নেইমারদের ঘরের মাঠে ৭-১ গোলে চুরমার করেন মুলাররা। স্তব্ধ হয় সাম্বা।

টমাস মুলার
শেষ আপডেট: 22 May 2025 14:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০১০ সালের ঘটনা। আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি আর্জেন্তিনা-জার্মানি (Argentina vs Germany)। লড়াইয়ের আগে প্রেস কনফারেন্স। সেখানে প্রতিপক্ষ দলের টমাস মুলারের (Thomas Muller) পাশে বসতে রাজি হননি আর্জেন্তিনীয় ম্যানেজার দিয়েগো মারাদোনা (Diego Maradona)। মুলারকে তিনি ভুল করে বল বয় ভেবেছিলেন। তিনি বসবেন বল বয়ের পাশে! প্রস্তাব শোনা মাত্র নাকচ। সম্মানে লেগেছিল দিয়েগোর।
তিন মাস পরের ঘটনা। এবার কোনও ফ্রেন্ডলি লড়াই নয়। মঞ্চের নাম বিশ্বকাপ। তার কোয়ার্টার ফাইনালে সম্মুখ-সমরে আর্জেন্তিনা-জার্মানি। ওই ম্যাচে তিন মিনিটের মাথায় বাস্তিয়ান সোয়াইনস্টাইগারের ফ্রিকিক থেকে হেডারে গোল করে গোটা আর্জেন্টিনা টিমকে হতবুদ্ধি করে দেন মুলার। গোটা লড়াই হাসতে হাসতে একপেশে করে তোলে আনকোরা জার্মান বাহিনী। জেতে ৪-০ ব্যবধানে। ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুলারের মন্তব্যও হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক। তিনি বলেছিলেন, ‘আশা করি আজকের পর সারাজীবনের জন্য মারাদোনা আমার নাম মনে রাখবেন। আর বল বয় ভেবে ভুল করেবেন না!’
বছর কুড়ির এক তরুণ ফুটবলার, যে কিনা সদ্য অ্যাকাডেমির ডোরা কেটে সিনিয়র টিমে সুযোগ পেয়েছে, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চড়িয়েছে মাত্র—তার এমন মন্তব্য ‘ঔদ্ধত্য’, ‘অহমিকা’ বলে মনে হতেই পারে—বিশেষ করে যখন উল্টোদিকের মানুষটার নাম দিয়েগো মারাদোনা! কিন্তু এই আগ্রাসনেই বাকিদের থেকে নিজেকে আলাদা করেছেন মুলার। চলতি মরশুম শেষে যিনি ছেলেবেলার দল বায়ার্ন মিউনিখের সঙ্গে ২৫ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করলেন। পরের গন্তব্য কোথায়? ইউরোপের কোনও ক্লাব? নাকি মার্কিন মুলুকের মেজর সকার লিগ? উত্তর আপাতত অজানা।
জোয়াকিম লোয়ের ছত্রচ্ছায়ায় জাতীয় দলে ক্ষুরধার হয়ে ওঠেন মুলার। একাধিক তরুণ, নাদান, অনভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের নিয়ে জার্মান টিম সাজিয়েছিলেন লো। আফ্রিকা বিশ্বকাপ ছিল প্রথম অ্যাসিড টেস্ট। সেমিফাইনালে স্পেনের বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি টক্কর হেরে বিদায় নিতে হয় ঠিকই। কিন্তু তার আগে মেসির আর্জেন্তিনা, ওয়েন রুনির ইংল্যান্ডকে নাকানিচোবানি খাইয়েছেন মুলাররা। দল বিশ্বকাপ হাতে তোলেনি। কিন্তু বছর কুড়ির টমাস মুলার ৫ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা নির্বাচিত হন। জেতেন গোল্ডেন বল। আর পরাজয় বরণ করেও জার্মান ফুটবলে সোনার প্রজন্ম সাজিয়ে তোলেন টমাস মুলার।
ঠিক কোন রসায়নে অল্প সময়ে সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করেছিল জার্মানি? কারণ ব্যাখ্যায় মুলার বলেন, ‘আসলে সেই সময় টিমের মেরুদণ্ড গড়ে ওঠে বায়ার্ন মিউনিখের খেলোয়াড়দের দিয়ে। গোলে ম্যানুয়েল ন্যয়ার, ডিফেন্সে ফিলিপ লাম, মাঝমাঠে সোয়াইনস্টাইগার আর ফরোয়ার্ডে আমি—দলের চালিকাশক্তি ছিল বায়ার্ন মিউনিখই। যারা সেই সময় ৪ বছরে দু’বার চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ওঠে। জেতে একবার। ফলে আমাদের বড় মঞ্চে জয়লাভের অভ্যাস বরাবরই ছিল।‘
ক্লাব-স্তরে সাফল্যলাভের লাগাতার অভ্যাস জাতীয় দলের ক্ষেত্রে কীভাবে, কতটুকু কাজে লাগে? কারণ ব্যাখ্যায় মুলার বলেন, ‘বিশ্বকাপের মতো হাইভোল্টেজ টুর্নামেন্টে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন শক্তি ফুরিয়ে গেলেও লড়ে যেতে হয়। ব্রাজিলে কাজটা সহজ ছিল না। প্রথম ইউরোপীয় দল হিসেবে আমরা দক্ষিণ আমেরিকায় কোনও বিশ্বকাপ জিতি।‘
ফুটবলের কিংবদন্তিতে লেখা থাকবে ব্রাজিল বিশ্বকাপ (Brazil World Cup)। নেইমারদের ঘরের মাঠে ৭-১ গোলে চুরমার করেন মুলাররা। স্তব্ধ হয় সাম্বা। গোটা স্টেডিয়াম নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে দলের অসহায় আত্মসমর্পণ ও জার্মান বাহিনীর অপ্রতিরোধ্য দাপট ঝলসে উঠতে দেখেছিল। চোখের জলে মাঠ ছেড়েছিলেন কয়েক হাজার সমর্থক। সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুলার বলেন, ‘প্রথমার্ধেই আমরা ৫ গোলে এগিয়ে ছিলাম। বিরতির সময় জোয়াকিম আমাদের ঝাঁজ কমাতে বলেননি। শুধু ব্রাজিলকে সম্মান জানানোর অনুরোধ করেন। আসলে গোটা পরিস্থিতি অদ্ভুত ছিল। বিশ্বকাপের সেমি ফাইনালে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ওদের ঘরের মাঠে ৫ গোলে এগিয়ে থাকাটা মোটেও স্বাভাবিক ঘটনা নয়। আসলে ব্রাজিল দল প্রচণ্ড চাপে ছিল। তাই আমরা ব্রাজিলীয় জনতা ও খেলোয়াড়দের সম্মান দেখানোটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে ভেবেছিলাম। জোয়াকিম ওই উপদেশ দিয়ে খুব ভাল কাজ করেছিলেন।‘