অনেক পরে জিদান ওই গোল নিয়ে বলেছিলেন—‘আমাকে অবাক করা কঠিন। কিন্তু সেদিন… আমি কথা হারিয়ে ফেলেছিলাম।’
_0.jpeg.webp)
গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 24 November 2025 13:28
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঘড়ির কাঁটা পেছনে ঘুরল। ঘোরাতে বাধ্য করলেন রোনাল্ডো! আল নাসেরের জার্সিতে চোখধাঁধানো বাইসাইকেল কিকে গোল করে গ্র্যাভিটি-কে ভুল প্রমাণ করলেন, নস্যাৎ হল বয়স আর ফর্মের পড়তির সমানুপাতিক অঙ্কও! যত বয়স বাড়ছে, হিসেব ঘুলিয়ে দিচ্ছেন সিআরসেভেন। গতকাল রাতে সুঠাম শরীরটাকে শূন্যে তুলে যেভাবে কিক মারলেন, অভ্রান্তভাবে বল জড়িয়ে গেল জালে—তা স্মৃতির পাক খুলে মনে করালো রিয়াল মাদ্রিদের সোনালি অতীত৷ দুর্ধর্ষ জুভেন্তাসের বিরুদ্ধে চ্যাম্পিয়নস লিগের হাইভোল্টেজ ম্যাচেও একই কায়দায় গোল করেছিলেন তিনি। কোচ জিদান স্তম্ভিত! বিপক্ষ সমর্থকরা পর্যন্ত স্ট্যান্ডিং ওভেশন জানান।
🤯🤯🤯 @Cristiano Ronaldo #OTD in 2018...
✅ Scores one of the greatest goals in competition history
✅ 1st player to net in 10 consecutive #UCL games#OnThisDay | @realmadriden pic.twitter.com/wLIk8UGfCp— UEFA Champions League (@ChampionsLeague) April 3, 2020
কিন্তু কোন কায়দায় ঠিকানা খুঁজে পেয়েছিলেন রোনাল্ডো? নিরীহ, ভাসানো ক্রসকে পাঠিয়ে দেন সঠিক ঠিকানায়? একটু রিওয়াইন্ড করা যাক!
ফুটবলে অনেক গোল আসে মুহূর্তের ঝলকে—কিন্তু কিছু গোলের বিল্ড আপে পুরো দৃশ্যপটে ছড়িয়ে থাকে একাধিক ভুল, হঠাৎ পাওয়া সুযোগ আর অতিমানবীয় দক্ষতা! রোনাল্ডোর জুভেন্তাস–ম্যাচের বাইসাইকেল কিক সেই গোত্রের মাস্টারপিস। বাহাদুরির প্রদর্শনী নয়, বদলে ফুটবল-জিনিয়াসের নিখুঁত উপস্থাপনা—ফ্রেম–বাই–ফ্রেম বিশ্লেষণে যেখানে দেখানো যায়, ছোট ছোট মুহূর্ত ঘেঁষাঘেঁষি করেই গড়ে তুলেছিল সেই আইকনিক গোল।
যদিও শুরুতে কোনও ইঙ্গিতমাত্র ছিল না। মার্সেলোর লম্বা পাস ঠিকমতো পৌঁছয়নি। বলটা ভিজে ঘাসে ছুটে গিয়েছিল জুভেন্তাস বক্সের দিকে। জর্জিও চেয়েলিনি আর জিয়ানলুইজি বুফন—রক্ষণে অভিজ্ঞ মহারথী—শুরুতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। ভিজে টার্ফ, ধীরগতির বল—এমন পরিস্থিতি হাজারবার সামলেছেন। হয় চিয়েলিনি বল আকাশে পাঠাবেন, নয়তো ঢাল হয়ে বুফনকে তুলে নিতে বলবেন। সহজ অঙ্ক।
Call it skill, call it instinct… we call it Ronaldo 🐐💛 pic.twitter.com/diFN85oBCI
— AlNassr FC (@AlNassrFC_EN) November 23, 2025
কিন্তু ডিফেন্সে দুই তারকার কমিউনিকেশন গুবলেট পাকাল। চিয়েলিনি ঠিক সময়ে ক্লিয়ার করতে পারলেন না। বলটাকে সাইডলাইনে ঠেলে দিতে গিয়েও যথেষ্ট দূরে পাঠাতে ব্যর্থ। গোলকিপারের হাতও পুরোপুরি বলের কাছাকাছি পৌঁছয়নি—মুহূর্তে তৈরি হল ‘নো–ম্যানস–ল্যান্ড’। আর সেই এলোমেলো অবস্থায় ফাঁকা জমিতে ঢুকে পড়লেন রোনাল্ডো।
অবারিত দ্বারে সিআরসেভেনকে ডেকে আনা আত্মহননের সামিল। বয়স যাই হোক, স্পিড কমে যাক… গোলের গন্ধ পেলেই তাঁর শরীরের প্রতিটি পেশি অফিসে রিপোর্ট করে। সুযোগ বুঝেই তিনি ডিফেন্স ভেদ করে ঢুকলেন, পেছনে ফেলে দিলেন দু’জন ডিফেন্ডারকে। লুকাস ভ্যাসকেজকে ছোট্ট পাস বাড়ালেন। তাঁর শটটা ছিল ঝাঁঝালো আর দ্রুত—যা বুফন উড়ন্ত ভঙ্গিতে ঠেকালেন। কিন্তু এই সেভ চূড়ান্ত নয়, ছিল ‘বিগিনিং অফ দ্য বিগিনিং’!
রিবাউন্ড যেতেই বল ড্যানি কার্ভাহালের কাছে। জুভেন্তাস বক্স ভর্তি ডিফেন্ডার। মোট ছ’জন। মাদ্রিদের আক্রমণকারী তিন। অঙ্ক বলছিল—এটা বিপক্ষের বল। সহজেই ক্লিয়ার হবে। কিন্তু ফুটবল শুধু অঙ্ক নয়—পজিশনিংয়ের শিল্প। যার ম্যাজিশিয়ান রোনাল্ডো। সেদিন দেখালেন মাইক্রো–মুভমেন্টের জাদু। বুফনের সেভের পর তিনি এমন জায়গায় দাঁড়ালেন যেখানে ডিফেন্ডাররা অনুসরণ করতেই ভুলে গেল! বারজাগলি আর ডি সিগলিও—দু’জন খেয়ালটুকু করলেন না, যে ৭ নম্বর জার্সিধারী ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে উড়ানের আগে শ্বাস টানছেন… অতর্কিত হানা দিতে প্রস্তুত বাঘের মতো! এক সেকেন্ডের ভুল মানেই মৃত্যু।
কার্ভাহাল ব্যাক–পোস্টে ক্রস তুলতে পারতেন। দিলে হয়তো পুরো অ্যাকশনটাই ম্লান হয়ে যেত। ভাগ্য সুপ্রসন্ন—তিনি তুললেন পেনাল্টি–স্পটে—যেখানে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করছেন রোনাল্ডো, তৈরি পায়ের প্রতিটি পেশি!
পরের দৃশ্যটা ফুটবল ইতিহাসের যাদুঘরে তোলা। ডি সিগলিও এগোতে চাইলেন, কিন্তু দেরি হয়ে গেল। বারজাগলি আর রোনাল্ডো জায়গা বদলালেন। সিআরসেভেনের শরীর আকাশে উঠল… সময় থমকাল… আর শূন্যে ঝুলে থাকা মুহূর্তে ভল্ট মেরে তিনি পা ঘুরিয়ে দিলেন—গ্রহের সমস্ত জাগতিক হিসেবকে অস্বীকার করে!
এক সেকেন্ড। এক আঘাত। এক অতল সৌন্দর্য। জালে বল জড়াল। ক্ষণিকের নীরবতা, পলকে বিস্ফোরণ। বুফন দাঁড়িয়ে রইলেন স্তম্ভিত—যেন বলছেন, ‘আমি আর কী-ই–বা করতে পারতাম?’ বারজাগলি দু’হাত তুলে মেনে নিলেন: ‘এই গোল থামানো যায় না!’ মাদ্রিদের ইস্কোর দু’হাত মাথায়—নিপাট অবিশ্বাস। আর স্ট্যান্ডের জুভেন্তাস সমর্থকেরা? তাঁরা উঠে দাঁড়ান, জানান কুর্নিশ—এমন অতিমানবের বিরুদ্ধে লড়া যায় না। ফ্ল্যাগ, ড্রাম, জার্সি—সব ভুলে সমাদর অপ্রতিরোধ্য প্রতিপক্ষকে… ফুটবলের সৌন্দর্যকে।
অনেক পরে জিদান ওই গোল নিয়ে বলেছিলেন—‘আমাকে অবাক করা কঠিন। কিন্তু সেদিন… আমি কথা হারিয়ে ফেলেছিলাম।’