Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
Gold investment: যুদ্ধের বাজারে সোনার দাম কমছে! এখনই কি বিনিয়োগের সেরা সময়? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরারহস্য আর মনের অন্ধকারে ঢুকে পড়ল ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’! টিজারে চমকজিৎ-প্রযোজক দ্বন্দ্বে আটকে মুক্তি! ‘কেউ বলে বিপ্লবী, কেউ বলে ডাকাত’-এর মুক্তি বিশ বাঁও জলে?কিউআর কোড ছড়িয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ! কীভাবে রাতারাতি নয়ডার বিক্ষোভের প্ল্যানিং হল, কারা দিল উস্কানি?নয়ডা বিক্ষোভ সামাল দিতে 'মাস্টারস্ট্রোক' যোগী সরকারের! শ্রমিকদের বেতন বাড়ল ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত Jeet: ভুয়ো প্রচার! ভোট আবহে গায়ে রাজনীতির রঙ লাগতেই সরব জিৎ৪ হাজার থেকে নিমেষে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ফলোয়ার! এক স্পেলেই সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন তারকা প্রফুল্লসামনে কাজল শেখ, মমতা কথা শুরু করতেই হাত নেড়ে বিরক্তি প্রকাশ অনুব্রতর! সিউড়িতে কী ঘটলEPL: নায়ক ওকাফর! ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ৪৫ বছরের অভিশাপ মুছল লিডস, রক্ষণের ভুলে ডুবল ম্যান ইউAsha Bhosle: 'এত ভালবাসার সবটাই তোমার...,' ঠাকুমার স্মৃতি আঁকড়ে আবেগঘন পোস্ট নাতনি জানাইয়ের

জোয়ার-ভাটার জীবনে ভিলেন জলবায়ু পরিবর্তন! শুধু আর্থিক নয়, মানসিকভাবেও বিধ্বস্ত সুন্দরবন

ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ত জল আর ভূমিক্ষয় সুন্দরবনের মানুষের মনোজগতে যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে, তা শুধু প্রাকৃতিক নয়— এক নীরব মানসিক মহামারী।

জোয়ার-ভাটার জীবনে ভিলেন জলবায়ু পরিবর্তন! শুধু আর্থিক নয়, মানসিকভাবেও বিধ্বস্ত সুন্দরবন

জল আসলে সুন্দরবনে আর জল থাকে না, জলই হয়ে ওঠে কখনও কখনও মরণফাঁদ। প্রতীকী ছবি।

শেষ আপডেট: 11 October 2025 19:57

শুভজিৎ নস্কর
সিদ্ধান্ত গোস্বামী

প্রায় ছ'মাস দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন অঞ্চলের কাকদ্বীপ সরকারী হাসপাতালে গৌরী বড়ুয়া ভর্তি ছিলেন। এই ছয় মাস তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। বিভ্রান্তি, বিষণ্ণতা ও অনিদ্রায় কাটানো এই দিনগুলো আজও তিনি ভুলে উঠতে পারেন না, আজও তার স্মৃতিতে বারবার ফিরে আসে সেই ছয় মাসের অস্বস্তি। ক্ষতের দাগ যেন আজও তার কন্ঠে লেগে আছে, গৌরীর কথায় জলই তার জীবনকে অস্বস্তিতে ভরিয়ে তুলেছিল, করে তুলেছিল উন্মত্ত।

সালটা ২০২০। মে মাসের সে রাতে আম্ফান এসে সব তছনছ করে দিল ঘোড়ামারা দ্বীপে, গৌরী সহ অজস্র মানুষকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল স্থানীয় সাইক্লোন সেন্টারে। একদা সাগর দ্বীপের অংশ থাকা ঘোড়ামারা বর্তমানে সুন্দরবনের অন্যতম ক্ষয়িষ্ণু দ্বীপ। ক্রমাগত ভাঙ্গনের প্রভাবে এই দ্বীপ ছোট হতে হতে আজ তলানিতে ঠেকেছে। তার পাশাপাশি ২০০৯ সাল থেকে লাগাতার সাইক্লোনের দাপট তো আছেই। আমফান সেসময় গোটা সুন্দরবনে কয়েক হাজার মানুষের বাসস্থান কেড়ে নিয়েছিল, ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল প্রায় ২১ হাজার বর্গকিলোমিটার জমি।

দিনের পর দিন নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সুন্দরবনে যেমন মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়েছে একই সাথে তা ভয়ানক আঘাত এনেছে মানুষের শারীরিক এবং বিশেষ করে, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। ঘোড়ামারা দ্বীপে কর্মরত আশাকর্মী স্নিগ্ধা সামসা জানান “মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির সাথে কৃষি জমি হারানোর একটি সরাসরি সম্পর্ক আছে, কৃষি জমি হারালে খাদ্য ও বাসস্থানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তাতেই মানুষ আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। পুরুষেরা অনেক সময় দ্বীপ ছেড়ে বাইরে কাজে যেতে পারে কিন্তু মহিলারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই দ্বীপেই থেকে যেতে বাধ্য হন।”

sunderban

আশির দশক থেকে সুন্দরবনের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মী, গবেষক ও অন্যান্য মানুষেরাও এই একই কথাই বলে চলেছেন। দীর্ঘ সময়ের নানান গবেষণা থেকে একটি মূল সত্য প্রকাশ পেয়েছে - মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি সুন্দরবনে আরও একটি গুরুতর সমস্যা।

NHS Foundation Trust এর সাথে যুক্ত মনোরোগ বিশারদ ( Psychiatrist ) ড: অরবিন্দ নারায়ণ চৌধুরী ও তার দল ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের গোসাবার বিভিন্ন অঞ্চলে একটি গৃহভিত্তিক সমীক্ষা চালান। ড: চৌধুরীর এই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারানো এবং খাদ্য-নিরাপত্তার অভাবে থাকা মানুষের স্বাস্থ্যে কী কী প্রভাব পড়ছে তা মূল্যায়ন করা। সেই সমীক্ষা থেকে তারা খুঁজে পান সুন্দরবনবাসীদের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত হৃদকম্পন, ক্রমাগত দুঃস্বপ্ন দেখা, অনিদ্রা ও উদ্বেগ সহ মানসিক চাপ জনিত নানান রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। 

sunderban

ডক্টর জয়তী চৌধুরী দ্বারা পরিচালিত অপর একটি গবেষণায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে লবণাক্ত জলের প্রভাব কিভাবে মহিলাদের স্বাস্থ্যের উপরে আঘাত হানছে, যার মধ্যে একটি বিশাল ভূমিকা নিচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য। চন্ডিপুর, হেতালবাড়ি, মহেন্দ্রনগর, দূর্বাছাতি সুন্দরবনের এই সমস্ত অঞ্চলের প্রায় চারশো মহিলার ওপরে এই সমীক্ষা চালানো হয়। এদের প্রত্যেকেরই পেশা নোনাজলে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে মীন (ক্ষুদ্র চিংড়ির চারা) ধরা। লবণাক্ত জলে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ফলে এই সমস্ত মহিলাদের ঋতুচক্রে অস্বাভাবিকতা দেখা যাচ্ছে, এমনটাই পাওয়া যাচ্ছে এই গবেষণায়। একই সাথে জানা যাচ্ছে ঋতুচক্রের এই অস্বাভাবিকতার সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

কলকাতার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ বিহেভিয়ারাল সায়েন্সের গবেষকরা তাদের গবেষণা থেকে জানান যে ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আয়লা পরবর্তী সময় থেকে সুন্দরবনে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি)-র উপসর্গ দ্রুত বেড়ে চলেছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই মহিলা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যাদের জীবনে পুরুষদের তুলনায় কিছুটা বেশি। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বিহেভিয়ারাল সায়েন্সেসের প্রতিষ্ঠাতা ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ কেদার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “দুর্যোগের পর রোগীদের অনিদ্রা, খিদে না পাওয়া ইত্যাদি দেখা যায়, বারবার তারা গবাদি পশুর ডুবে যাওয়া, শিশুদের ভেসে যাওয়া, বাড়ির ছাদ ধসে পড়া ইত্যাদির স্মৃতি ফিরে আসার মতো সমস্যার কথা বলেন।” ডঃ বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেন, “মানসিক অসুস্থতার প্রাথমিক লক্ষণগুলির মধ্যে অন্যতম হল খিদে না পাওয়া। এরকম ক্ষেত্রে আমি সাধারণত একটি অ্যান্টিডিপ্রেসান্ট ওষুধ দিই, আর কিছুদিন পর রোগীরা ফিরে এসে বলেন যে তারা আগের তুলনায় অনেকটা ভাল বোধ করছেন।”

sunderban

২০১৮ সালের এক গবেষণায়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সুনন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সহকর্মীরা বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশা জুড়ে শতাধিক বছরের ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের ইতিহাস অনুসন্ধান করেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড়গুলো আর আগের জায়গায় আঘাত করছে না। আঘাতের কেন্দ্রবিন্দুটি ধীরে ধীরে পূর্বদিকে সরে যাচ্ছে — বর্তমানে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলির মধ্যে রয়েছে ওড়িশার উত্তর ভাগ এবং পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন এলাকা।

ভারত মহাসাগরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, বেড়েছে তাদের তীব্রতাও। ১৯৬০ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত এই ঝড়গুলির মোট শক্তি প্রায় ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘূর্ণিঝড়প্রবণ উপকূলগুলির মধ্যে সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চল। বোঝাই যাচ্ছে,  সমুদ্রের তাপমাত্রা যেমন বাড়ছে, তেমনি তার পরিণতিও আরও ভয়াবহ হতে চলেছে। 

সাগরদ্বীপের বাসিন্দা বিকাশ দাস জানান “ প্রতিবছর জোয়ার একটু একটু করে আমাদের গিলে নিচ্ছে।” তিনি জানান যে আজ যে জায়গায় তিনি ঢেউ দেখতে পাচ্ছেন সেখানেই একসময় তার প্রতিবেশীর বাড়ি ছিল।

বিশেষজ্ঞরা এখন সেই কথাই নিশ্চিত করছেন যা স্থানীয় বাসিন্দারা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুগত হাজরার নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাগর দ্বীপে ইতিমধ্যেই প্রায় ৩৪ বর্গকিলোমিটার জমি হারিয়ে গেছে  — হারিয়ে গেছে চাষের জমি, গ্রাম ও ম্যানগ্রোভ বন। ভারতের পুরনো সার্ভে মানচিত্র ও স্যাটেলাইট চিত্রের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকদল ১৯৬৯ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে সুন্দরবনের ধীরে ধীরে ভাঙনের চিত্র তুলে ধরেন - দেখা যায় যে  জলাভূমি ও নদীপাড় ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে, নোনা জল বাসযোগ্য অঞ্চলের দিকে ঢুকে পড়ছে, আর একসময়ের সমৃদ্ধ ম্যানগ্রোভ বন পরিণত হচ্ছে অনুর্বর নোনাজমিতে।

পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রতি বছর প্রায় ২ মিলিমিটার করে বাড়ছে, সেখানে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপে এই বৃদ্ধি ৩ মিলিমিটারেরও বেশি। সেই অতিরিক্ত এক মিলিমিটারই উপকূলের পরিবারের কাছে বিপদের সাইরেন — যা তাদের বাধ্য করছে অন্যত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে। তাদের কাছে সাগরদ্বীপ আর শুধু বসবাসের স্থান নয়, একটা যুদ্ধ ক্ষেত্রের সমান হয়ে উঠেছে। 

“যদি ঘোড়ামারা দ্বীপ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সাগর দ্বীপ হারিয়ে যাওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা,” বলেন ঘোড়ামারা দ্বীপের ৭০ বছর বয়সী বাসিন্দা শেখ শাহ জাহান। কথা বলার সময় তার দুচোখ জুড়ে যেন সাগরের ঢেউ খেলা করছিল। তার ২৪ বছর বয়সী কন্যা সাজিদা বললেন, তাঁর বড় ভাই জীবনের ঝুঁকি নিতে চায়নি , সে বোম্বাইয়ে চলে গিয়েছে।

“সে আর কখনও ফিরে আসবে না,” ডাউন সিন্ড্রোমে থাকা সাজিদা যখন একথা বলছে তারও গলা ভারী হয়ে এসেছে তখন।

sunderban

সাজিদা ও তাঁর বাবা শেখ শাহ জাহান। 

শেখ শাহ জাহান বর্ণনা করেন গত পঞ্চাশ বছরে ঘোড়ামারার কৃষিজমি কতটা কমে গিয়েছে সেই ব্যাপারে। তাঁর কথায় প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ১৮৬৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে সুন্দরবনের ডিভিশনাল কমিশনার আর.বি. চ্যাপম্যানের পর্যবেক্ষণ: “Sagar Island is more valuable…as a breakwater to save the mainland from the full destructive forces of storm waves than a precarious field of agriculture” 
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ক্লেয়ার লিজামিট স্যামলিং তাঁর পিএইচডি থিসিস “Being Displaced: Livelihood and Settlement in the Indian Sundarbans”-এ সুন্দরবনের ইতিহাস উন্মোচন করেছেন। সেখানে দেখা যায়, সাগরদ্বীপ ঔপনিবেশিক যুগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। একরের পর একর জলাজমি কৃষিজমিতে রূপান্তরিত করা হয়েছিল। বন কেটে ফেলে এবং ম্যানগ্রোভ পরিষ্কার করে একটি কৃষিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা হয়েছিল।  চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর, জমির অবস্থা যাই হোক না কেন চাষ করতে হতো কৃষকদের, কারণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনে প্রতি বছর  নির্দিষ্ট পরিমাণ কর বা খাজনা চালু করা হয়েছিল। 

সুন্দরবনে বড় পরিসরে জমির চরিত্রবদল স্বাধীনতার আগে থেকেই শুরু হয়েছিল, মার্কসীয় দর্শন যাকে বলে ‘মেটাবলিক রিফট’ অর্থাৎ, ঔপনিবেশিক শাসকরা উপনিবেশ থেকে মুনাফা আদায়ের জন্য নতুন অঞ্চলের সম্প্রসারণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, একই সাথে ভেঙে দিয়েছিল পরিবেশের কাঠামোও। যার সুদূর প্রসারী প্রভাব আজকের জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। 

sunderban

সাগরদ্বীপে গ্রামের মানুষজন নিজেরাই বাঁধ মেরামতির কাজ করছেন।

“রাতে ভাল করে ঘুম আসে না। সমুদ্র শান্ত থাকলেও মনের মধ্যে অদ্ভুত ভয় কাজ করে, মনে হয় এই যেন সমুদ্র অশান্ত হয়ে উঠবে। আমাদের জীবনটা যেন পাখির বাসার মতো, সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি এই যেন কোন একটা ঝড় এসে সব তছনছ করে দিয়ে গেল” বললেন সাগরদ্বীপের বাসিন্দা বিকাশ দাস। 

সাগরদ্বীপের মহিষামারির শঙ্কর বেরা বলেন, “প্রত্যেকটা রাত, যখন আমার পরিবারের বাকিরা ঘুমায়, আমি জেগে থাকি। ঘড়ির টিকটিক আওয়াজটা যেন আমার বুকে বাজে।  যখন জোয়ার আসে রাতের দিকে আমি ভয়ে ঘর ছেড়ে বাঁধের ওপর উঠে এসে দেখি বাঁধটা ঠিক আছে কিনা, এ এক অদ্ভুত যন্ত্রণা।”

সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও ভূমিক্ষয়ের সাথে অভিবাসন ও খাদ্য নিরপত্তাহীনতার একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, যা নিয়ে গবেষণা করেছেন বাসন্তী দেবী কলেজের অধ্যাপিকা ড: ইন্দ্রিলা গুহ ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ড: চন্দন রায়। গুহ ও রায় তাদের গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন যে ঘূর্ণিঝড়ের পর খাদ্য নিরাপত্তা একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়, যা অভিবাসনের হার চূড়ান্ত মাত্রায় বাড়িয়ে দেয়। অন্যান্য গবেষণাও তাদের ফলাফলকে সমর্থন করে। বিংশ শতাব্দীতে সুন্দরবনে অভিবাসনের মূল কারণ হল জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে কৃষিজমি হারানো। উল্লেখ্য , যখন অধিকাংশ অভিবাসী পুরুষ হয়, তখন মহিলারা ঘরে থেকে বিভিন্ন পেশায় কাজ করতে বাধ্য হন, বৃহদাংশে  মীন ধরা। গবেষণায় দেখা যায়, এই সময়টি মহিলাদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, এ সময় তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চূড়ান্ত অবনতি ঘটে। 

sunderban

অশীতিপর বৃদ্ধ বাদল মাইতি যিনি ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে নানান কিছু ভুলে যাওয়ার সমস্যায় ভুগছেন

ঘোড়ামারা দ্বীপের বসুমতি মাইতি তার শ্বশুর বাদল মাইতির প্রসঙ্গে বলেন, “ বন্যার সময় ঘরের জল ঢুকে ভাসিয়ে দিয়েছিল। সেই জলের গতি দেখে আমার শ্বশুর  মানসিকভাবে কেমন একটা হয়ে যান, যা আজও চলছেই। তিনি আমাকে কিছু বলেন এবং পরে তা ভুলে যান। আমি এই পরিবর্তনটি ঘূর্ণিঝড় আয়লা (২০০৯)-এর পর থেকে লক্ষ্য করছি।”

বসুমতি আরও বলেন, “বহুদিন ধরে ঘরে জমে থাকা জলের যে গন্ধ তা ভীষণ অস্বস্তিকর। সেই গন্ধ নাকে এলে বারবার সেই সব দুর্যোগের স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে, অসহ্যকর হয়ে ওঠে সেসব মুহূর্ত। আজও মাঝেমধ্যে মনে হয় নাকের সামনে সেই গন্ধ ভাসছে।”

sunderban

ঘোড়ামারা স্বাস্থ্যকেন্দ্র।

সুন্দরবনের বাসিন্দাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ দীর্ঘদিন ধরে করে চলেছেন Sound of Silence নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংস্থার কর্মীরা মাসিকভাবে গ্রামসভা আয়োজন করেন, যেখানে গ্রামবাসীদের নিজেদের কথা লিখতে বলা হয়। এসব লিখিত বক্তব্যগুলি চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো হয়, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাছে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে চিকিৎসা প্রদানের সেরকম পরিকাঠামো নেই। মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা করাতে গেলেও তাদের  যেতে হয় দূরবর্তী কোনো অঞ্চলে। ঘোড়ামারা দ্বীপের কমিউনিটি হেলথ অফিসার ( CHO ) প্রীতিকণা হালদার বলেন, “অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, মানুষজন দূরত্বের কারণে নিয়মিত চিকিৎসার সুবিধা নিতে যেতে পারেন না অত দূরে।“

দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক (ডেপুটি - ২) ডঃ আত্রেয়ী চক্রবর্তীর মতে, মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিষেবা এখনও যথেষ্ট নয়। এমনকি রোগীকে পরিষেবা দেওয়ার জন্য আশা কর্মীদের নির্দিষ্ট পরিমাণ কিছু ইনসেনটিভ থাকে। কিছু বিশেষ বিশেষ পরিষেবার ক্ষেত্রে তারা এই ইনসেন্টিভ পান। মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোনো বিষয় এই তালিকায় পড়ে না। 

ড: চক্রবর্তী আরও বলেন, “সুন্দরবনে রিসোর্ট বানানোর জন্য বহুলাংশে ম্যানগ্রোভ কেটে ফেলা হচ্ছে। পর্যটকের আগমন বাড়ছে। এই সবকিছু সুন্দরবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। প্রায় প্রত্যেক মে মাসেই সুন্দরবনে ঘূর্ণিঝড় লেগেই আছে, তাদের মধ্যে কিছু কিছু বিধ্বংসী হয়ে উঠছে।”

ড: চক্রবর্তীর কথায় যথেষ্ট স্পষ্টতার সুর রয়েছে যে এই বিপর্যয়ের অনেকটাই আসলে মানুষের হাতে তৈরি। মানুষের কর্মকাণ্ডের জন্যই পরিবেশের সাম্যতা বিঘ্নিত হচ্ছে, বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা। নানান গবেষণায় এর আগেও উঠে এসেছে এই কথা।

সুন্দরবনে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল শুধুমাত্র কৃষিকাজ বিপন্ন হওয়া কিংবা বাসস্থান হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই  — এটি মানুষের মনের মধ্যেও অদ্ভুতভাবে বাস করে। দীর্ঘ মেয়াদী ভাবে থেকে যায়। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলে সোলাস্টালজিয়া - এক অমোঘ শোক এবং উদ্বেগ, যা তখন জন্মায় যখন আপনার বসবাসের পরিবেশ এতটাই পরিবর্তিত হয় যে নিজের বাসস্থানকে আর “ঘর” বলে মনে হয় না। অর্থাৎ ক্ষতি কেবল অর্থনৈতিক নয়, তা চূড়ান্ত ভাবে মানসিকও বটে। 

গবেষকরা বলছেন সুন্দরবনের নানান পরিস্থিতিকে ‘নতুন পরিবেশগত মানসিকতা’র দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখতে হবে। নৈতিকতার সাথে দেখতে হবে। একথাও সত্য, সেই ঔপনিবেশিক কাল থেকে এখনও পর্যন্ত সুন্দরবনের শাসনব্যবস্থার পরিকাঠামোতে অজস্র ফাঁকফোঁকড় থেকে গেছে। এই ফাঁকগুলো পূরণ করতে হবে গবেষণা এবং বাস্তব জীবনের সংমিশ্রণ দ্বারা —  কয়েকজন জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হিসেবে তাদের না দেখে মানবিকতার লেন্স দিয়ে সুন্দরবনকে দেখতে হবে।

এই প্রতিবেদনটি Internews-এর Earth Journalism Network এর সহায়তায় করা হয়েছে।

ছবি: শুভজিৎ নস্কর
 


```