এক এমন সময়, যখন নারীশিক্ষা (Teachers' Day) ছিল ঘোরতর নিষিদ্ধ, তখনই ১৮৪৮ সালে পুণেতে তিনি খুললেন ভারতের প্রথম কন্যাশিক্ষালয় (Woman School)।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 6 September 2025 13:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: একুশ শতকেও জাতপাতের অনুশাসন ও ছুঁতমার্গের শেকল কাটেনি পুরোপুরি। তাই একথা আন্দাজ করতে কষ্ট হয় না যে, উনিশ শতকে কোনও এক দলিত নারী (Dalit Woman) যদি নিজের স্বপ্নপূরণের পথে এগোতে চাইতেন, তবে তাঁর সংগ্রাম ঠিক কতটা দুরূহ হয়ে উঠত (Teachers' Day)।
এখন বড়াই করে আমরা তুলে ধরি সরকারি কর্মসূচি, ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ (Beti Banchao Beti Padao)। কিন্তু সাবিত্রীবাই ফুলে (Savitribai Fule) সেই ১৯ শতকেই যেন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, সামাজিক প্রচার অভিযানের চেয়ে হাতে কলমে তার বাস্তব ছবিটা এঁকে ফেলা কতটা জরুরি।
এ যুদ্ধের ছবি একদিনে তৈরি হয়নি। বরং বহু ঘটনার কোলাজ জমে গড়ে ওঠে এক প্রগতির ফ্রেম। যেমন, একজন নিঃস্ব, অসহায় বিধবার শরীর যখন ভেঙে পড়েছিল, তখন কেবল সহানুভূতিই দেখাননি সেই সাবিত্রী। নিজের জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে তিনি সেই বিধবার সন্তানকে তুলে নিয়েছিলেন নিজের কোলজুড়ে। স্বামী জ্যোতিরাও-এর সঙ্গে মিলে মানুষ করেছিলেন সেই শিশুকে। পরিণত বয়সে পুত্র যশবন্ত কেবল চিকিৎসকই হননি, হয়ে উঠেছিলেন সমাজসেবার এক দীপশিখা।
এই ঘটনা শুধু সাবিত্রীবাইয়ের জীবনের বিচ্ছিন্ন অধ্যায়ই নয়; বরং প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি যে মানবতা, সাহস এবং সংগ্রামের মন্ত্র ধারণ করেছিলেন, তারই প্রতিফলন।
এক এমন সময়, যখন নারীশিক্ষা (Teachers' Day) ছিল ঘোরতর নিষিদ্ধ, তখনই ১৮৪৮ সালে পুণেতে তিনি খুললেন ভারতের প্রথম কন্যাশিক্ষালয় (Woman School)। সমাজের রক্ষণশীলতার কাঁটা তাঁকে বারবার বিদ্ধ করেছে। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার পথে মাথায় এসে পড়েছে কাদা, পাথর, গোবর। তাতেও দমিয়ে রাখা যায়নি। প্রতিদিনই একটি অতিরিক্ত শাড়ি কাছে রাখতেন। যাতে ভিজে গেলে বা নোংরা হয়ে গেলে বদলাতে পারেন। তাঁর দৃঢ় সংকল্প ভাঙতে পারেনি কোনও বাধা। ধীরে ধীরে একের পর এক স্কুল তৈরি করলেন তিনি। ভারতীয় নারীমুক্তির ইতিহাসে যার গুরুত্ব অপরিসীম।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সাবিত্রীবাই ছিলেন এক তীক্ষ্ণ কলমসৈনিক। তাঁর কবিতা ও রচনায় ফুটে উঠেছে সমতা, মর্যাদা আর আত্মমর্যাদার আহ্বান। সেসব লেখা কেবল সাহিত্য নয়, ছিল নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিপ্লবের অস্ত্র, প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার মন্ত্র।
নারীমুক্তির মতোই তাঁর সংগ্রামের আরেকটি বড় ক্ষেত্র ছিল দলিত ও প্রান্তিক মানুষের উন্নয়ন। স্বামী জ্যোতিরাওয়ের সঙ্গে মিলে তিনি নিজের বাড়ির কুয়ো খুঁড়েছিলেন। যেখানে দলিতেরা জল তুলতে পারতেন নির্বিঘ্নে। সামন্তবাদী সমাজের চোখে এ ছিল বিদ্রোহ, কিন্তু নিপীড়িতের কাছে আশীর্বাদ।
সামাজিক অন্ধকারের আর একটি অধ্যায়ে সাবিত্রীবাই আলো জ্বেলে ছিলেন। সেই সময়ে বিধবারা ছিলেন সমাজচ্যুত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত। তাঁদের জন্য আশ্রয় গড়ে তুলেছিলেন তিনি। শিশুবিবাহ ও সতীদাহের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন মুক্ত কণ্ঠে। যে যশবন্তকে তিনি মানুষ করেছিলেন, সেই সন্তানই তাঁর সংগ্রামের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
সাবিত্রীবাই ফুলে মানবসেবার পরম শিখর ছুঁয়েছিলেন ১৮৯৭ সালে, প্লেগ মহামারীর সময়ে। আক্রান্তদের সেবা করার জন্য ছেলেকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন আশ্রয়কেন্দ্র। দিনরাত নিজ হাতে সেবা করেছেন রোগীদের। সেই মহামারীতেই আক্রান্ত হয়ে শেষ হয়ে যান তিনি। নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন অন্যের জীবনের জন্য।
আজও যখন কোনও মেয়ে নির্ভয়ে স্কুলে যায়, সেখানে নিঃশব্দে শোনা যায় সাবিত্রীবাই ফুলের পদধ্বনি। তাঁর সংগ্রাম, তাঁর আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয় সাহস আর সহানুভূতিই সমাজবদলের আসল চালিকাশক্তি। তিনি শুধু নারীমুক্তির ইতিহাসে নয়, সমগ্র ভারতবর্ষের সামাজিক নবজাগরণের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র।
নারীশিক্ষা প্রসারের অদম্য প্রয়াসে ফুলে-দম্পতির কাজ নজর কাড়ে ব্রিটিশ সরকারেরও। সমকালীন সংবাদপত্র পুণে অবজার্ভার-এ লেখা হয়েছিল— “মেয়েদের স্কুলের ছাত্রীরা শিক্ষায় এমন কৃতিত্ব দেখাচ্ছে, যা সরকারি স্কুলের ছেলেদেরও ছাপিয়ে যাচ্ছে। সরকার যদি এখনই পদক্ষেপ না করে, তবে আমাদের লজ্জায় মাথা নত করতে হবে।”
এই স্বীকৃতির পরই ব্রিটিশ প্রশাসন ফুলে-দম্পতিকে বিশেষ সংবর্ধনার আয়োজন করে তাঁদের অবদানের সম্মান জানায়।
সাবিত্রীবাই ফুলের জীবন কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। এ যেন এক জীবন্ত আলোকবর্তিকা, যা আজও আমাদের পথ দেখায়। তিনি শিখিয়েছিলেন, সংগ্রাম মানে কেবল প্রতিবাদ নয়, তা সৃষ্টিও বটে। আর শিক্ষা মানে শুধু জ্ঞানের আলো নয়, তা মুক্তির চাবিকাঠি। তাঁর অদম্য সাহস, মানবিকতা আর আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত নবজাগরণ শুরু হয় তখনই, যখন আমরা অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করে হাতে হাত রেখে এগোই।