সোনার রাজদণ্ড, হিরের মুকুট, অগাধ ঐশ্বর্য, সম্পত্তি সবই ফুলেফেঁপে বাড়ছিল কিন্তু রাজপ্রাসাদের ভিতরে ছিল না সঙ্গ। সেখান থেকেই সবকিছুর শুরু।

ছবি - দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 29 October 2025 21:33
দ্য ওয়াল ব্যুরো: অর্ধেক দুনিয়া হাতের মুঠোয়। সোনার রাজদণ্ড, হিরের মুকুট, অগাধ ঐশ্বর্য, সম্পত্তি সবই ফুলেফেঁপে বাড়ছিল তাঁর রাজত্বে। কিন্তু রাজপ্রাসাদের ভিতরে যেটা ছিল না, তা হল পছন্দের 'সঙ্গ'। তাই সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েও নিঃসঙ্গতায় ডুবে থাকতেন রানি ভিক্টোরিয়া। হ্যাঁ ঠিকই শুনছেন, আর সেই নিঃসঙ্গতার মুহূর্তেই তাঁর জীবনে এসে পড়েন এক ভারতীয় যুবক। যাঁর জীবন এক লহমায় বদলে ফেলেছিলেন রানি। সেই গল্পই রাজ পরিবারের 'কালো অধ্যায়'।
পরাধীন ভারতের আগ্রা জেলে ক্লার্ক হিসেবে কাজ করতেন আবদুল করিম। ঝাঁসির কাছে এক গ্রামে জন্ম তাঁর। ছোট থেকেই উর্দু ও ফারসি শেখা, পরে আগ্রা জেলে চাকরি। আর সেখান থেকেই ভাগ্য ঘুরে যায়। তৎকালীন সুপার জন টাইলার রানির নির্দেশে দুই ভারতীয় পরিচারক বাছাই করেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন এই করিম। রানির অনুরোধ ছিল, তাঁর কাছে ভারত থেকে এমন দু’জনকে পাঠাতে হবে যাঁরা রাজসভায় কাজ করবেন ফলে বুঝেশুনে, আর সেই সূত্রেই লন্ডনযাত্রা করিমের।
প্রথম দেখাতেই যুবকের ভদ্রতা, গাম্ভীর্য, আর মেজাজে মুগ্ধ হন রানি। নিজের ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ‘দীর্ঘকায়, গম্ভীর এবং অত্যন্ত বুদ্ধিমান।’ করিমের হাতের পোলাও, ডাল, মাংসের ঝোল, এসব রানির পছন্দের তালিকায় উঠে আসে দ্রুতই। করিমের হাত ধরে ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ জন্মায় তাঁর। উর্দু শেখা শুরু করেন, করিমকে দেন ‘মুন্সি’ উপাধি।
ধীরে ধীরে সম্পর্কের গভীরতা বাড়ে। শুরুতে অন্য পরিচারকদের মাধ্যমে বার্তা পাঠাতেন, পরে নিজেই করিমকে চিঠি লিখতেন। নিজের চিঠিতে কখনও ‘পরম বন্ধু’, কখনও ‘স্নেহশীল মা’ বলে সম্বোধন করতেন। রানির অনুরোধে করিমের স্ত্রী ও বাবা পর্যন্ত লন্ডনে যান। এদিকে আগ্রায় তাঁর জন্য জমির বন্দোবস্ত করে দেন রানি। মৃত্যুর পর করিমকে যেন অবহেলা না করা হয়, সেই ব্যবস্থাও করে যান নিঃশব্দে।
কিন্তু রাজপরিবারের কাছে এই বন্ধুত্ব ছিল চোখে বালি। রানি ভিক্টোরিয়ার আগে স্কটিশ পরিচারক জন ব্রাউনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়েও মুখরোচক গল্প ছড়িয়েছিল রাজসভায়। তাই করিমের উপস্থিতিতে আবার সেই আশঙ্কা দেখা দেয়। ‘শ্রীমতী ব্রাউন’-এর পরে যেন ‘শ্রীমতী করিম’ না হন, এই ভয়েই অস্থির হয়ে ওঠেন রাজপরিবারের সদস্যরা।
রানির আশঙ্কা অচিরেই সত্যি প্রমাণিত হয়। ১৯০১ সালের ২২ জানুয়ারি, রানি ভিক্টোরিয়া মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র সপ্তম এডওয়ার্ড করিমকে রাজপ্রাসাদ থেকে বিতাড়িত করেন। রানির সব চিঠি, করিমের স্মৃতিচিহ্ন বাজেয়াপ্ত করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। নির্বাসিত হয়ে ভারতে ফিরে আসেন যুবক। ১৯০৯ সালে আগ্রায় তাঁর মৃত্যু হয়।
তবু ইতিহাস চাপা থাকে না। করিম নিজের ডায়েরিতে রানির সঙ্গে সম্পর্কের আখ্যান লিখে গিয়েছিলেন। বহু পরে, ২০১০ সালে, ইতিহাসবিদ শর্বাণী বসু সেই ডায়েরি খুঁজে পান করিমের পরিবারের কাছ থেকে। পরে প্রকাশিত হয় তাঁর বই ‘Victoria & Abdul: The True Story of the Queen’s Closest Confidant’, যার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘Victoria & Abdul’যেখানে অভিনয় করেন জুডি ডেঞ্চ ও আলি ফজল।
কিন্তু রানির এই ভারত-প্রেমের ইতিহাসে আরও এক চরিত্র আছেন, তিনি হলেন দুলীপ সিং, পাঞ্জাবের শেষ মহারাজা। তিনিও ব্রিটিশ রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ, রানি ভিক্টোরিয়ার প্রিয় ‘কালো রাজপুত্র’।
পাঞ্জাবের মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের ছেলে দুলীপ, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেন। বাবার মৃত্যুর পর রাজ্যে গৃহযুদ্ধ, ষড়যন্ত্র, হত্যাকাণ্ডে দুলীপের জীবন জর্জরিত হয়। ১৮৪৯ সালে দ্বিতীয় শিখ যুদ্ধে পরাজিত হয় পাঞ্জাব। মাত্র দশ বছরের দুলীপকে সিংহাসনচ্যুত করে দেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তাঁকে ‘উপহার’ হিসেবে কোহিনুর হিরে দিতে বাধ্য করা হয় রানিকে। মা জিন্দ কৌরকে কারাবন্দি করা হয়, আর দুলীপকে নির্বাসনে পাঠানো হয় ফতেহগড়ে।
১৮৫৩ সালে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন কিশোর মহারাজা। ১৮৫৪ সালে লন্ডনে যান এবং রানি ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে প্রথম দেখা হয় তাঁর। রানি তাঁকে নিজের পরিবারের সদস্যের মতোই গ্রহণ করেন। রাজকীয় অনুষ্ঠানে, উৎসবে, এমনকি ছুটিতেও তাঁর সঙ্গেই সময় কাটাতেন দুলীপ। রানির ডায়েরিতে লেখা আছে—“To Maharaja Duleep Singh, my dearest friend, Victoria, Windsor Castle, March 1868.”
কিন্তু রাজপ্রাসাদের ঝলমলে আলোতেও নির্বাসনের যন্ত্রণা দুলীপ ভুলতে পারেননি। পরে আবার শিখ ধর্মে ফেরেন, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। ১৮৯৩ সালে প্যারিসে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে, এক নির্বাসিত রাজা হিসেবে।
সাম্রাজ্যের গরিমা, ক্ষমতার মোহ, রাজমুকুটের চকচকে সোনার নীচে লুকিয়ে থাকা নিঃসঙ্গতা তাঁদের গ্রাস করেছিল রানিকে। হয়তো এই কারণেই, তিনি সেই অশ্বেতাঙ্গ পরিচারক কিংবা নির্বাসিত ভারতীয় রাজপুত্রের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন ভালবাসা, সেই স্পর্শ বা আবেগ যা রাজসিংহাসনে তো পাওয়াই যায় না,