মাটি খুঁড়ে তাঁকে তুলে না আনলে ভারতীয় লোকনৃত্যের ইতিহাসের পাতা কী জবাব দিত, সে কথা আজ অবান্তর।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 22 October 2025 21:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তিনবার মেয়ে হওয়ার পর, 'এবারও ছেলে হল না'! জন্মের কিছু সময় পরই সমাজের 'হিতাকাঙ্ক্ষী'দের রাগ এসে পড়েছিল সদ্যোজাত শিশুকন্যাটির ওপর। জন্ম নিয়েই সকলের চক্ষুশূল কেন হয়ে উঠতে হয়েছিল সেটা বোঝা তো দূরঅস্ত, ঠাঁই হয়েছিল মাটির নিচে। কিন্তু প্রাণভোমরা তাঁর বাঁধা ছিল বোধহয় অন্য কোথাও, তাই তো সেই 'ধন্যি মেয়ের' নাম আজ উঠে এসেছে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান পদ্মশ্রীর তালিকায়।
ধনতেরাসের দিন জন্ম হয়েছিল বলে নাম রাখা হয়েছিল ধন্বন্তরি। জীবনের গল্প তাঁর লেখা হয়েছিল কোনও এক জাদু কলমের কালিতে। সেদিন মা জানতে পেরে মাটি খুঁড়ে তাঁকে তুলে না আনলে ভারতীয় লোকনৃত্যের ইতিহাসের পাতা কী জবাব দিত, সে কথা আজ অবান্তর। কথা হচ্ছে গুলাবো সাপেরার, যাঁর শরীরের ছন্দ ধরে রাজস্থানের কালবেলিয়া নৃত্যের ঐতিহ্য উঠে এসেছে বিশ্বের দরবারে।
১৯৭৩ সালে রাজস্থানের কালবেলিয়া সম্প্রদায়ে জন্ম গুলাবোর। পরিবারে সপ্তম সন্তান এবং চতুর্থ কন্যা হওয়ায় সমাজের মানুষই তাঁকে বোঝা মনে করে জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মাটিচাপা দিয়ে দেন। বাবা তখন বাড়িতে ছিলেন না। জানতেন না মা-ও। পাঁচ-ছ'ঘণ্টা মাটির তলায় চাপা থাকার পরও কীভাবে মেয়ে বেঁচে থাকতে পারে, সেই যুক্তিতক্কোর সীমানা পেরিয়ে বন থেকে সদ্যোজাত শিশুটিকে উদ্ধার করেন। কী আশ্চর্য, অদ্ভুত প্রাণশক্তি এই ছোট্ট মেয়েটির শরীরে!
বাবা ছিলেন পেশায় একজন সাপুড়ে। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাপেদের নাচ ও ‘বীন’-এর সুরে মোহিত হয়ে পড়েন গুলাবো তথা ধন্বন্তরি। একদম ছোট বয়স থেকেই তিনি সাপেদের শরীরী ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করেন। এই ভঙ্গিই ধীরে ধীরে রূপ নেয় কালবেলিয়া নৃত্যশৈলীর।
বয়স যখন ছ'বছর, আশপাশের মানুষের চাপিয়ে দেওয়া বেড়াজাল বলেছিল 'আমাদের সমাজের মেয়েরা নাচে না'। বাবাকে হুমকি দেওয়া হয়, মেয়ে নাচলে বহিষ্কার করা হবে। গৃহবন্দি হতে হয়। নাচ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন ধন্বন্তরি। মেয়েকে সুস্থ করে তুলতে আজমের দরগায় নিয়ে যান বাবা। সেখানে বুকের ওপর রাখা একটা গোলাপের পাপড়ি যেন প্রাণসঞ্চার করেছিল ধুঁকতে থাকা মেয়েটির শরীরে। সেই ঘটনার পর বাবা মেয়ের নাম বদলে রাখেন 'গুলাবো'।
সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মায়ের উৎসাহে ছোট ছোট অনুষ্ঠানে নাচতে শুরু করেন গুলাবো। মাত্র আট বছর বয়সে প্রথম বড় সুযোগ আসে পুষ্কর মেলায়। রাজস্থান পর্যটন বিভাগের কর্মকর্তারা তাঁর নাচ দেখে জয়পুরে পারফর্ম করার জন্য আমন্ত্রণ জানান। এখান থেকেই শুরু তাঁর সোনালি যাত্রা।
কালবেলিয়া নাচের পোশাকও ডিজাইন করেন গুলাবো নিজে, যা এখন এই লোকনৃত্যের পরিচিত প্রতীক।
১৩ বছর বয়সে তিনি আমেরিকার ওয়াশিংটন ডিসিতে পারফর্ম করার সুযোগ পান। এ সময়েই মহারানি গায়ত্রী দেবী তাঁর দায়িত্ব নেন এবং পরিবারকে বোঝান, গুলাবো কেবল তাঁদের মেয়ে নন, সমগ্র রাজস্থানের গর্ব।
গায়ত্রী দেবীর আশীর্বাদের হাত মাথায় নিয়ে গুলাবো কালবেলিয়া নাচের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন মেয়েদের। যে নৃত্যশৈলী একসময় ধুঁকছিল, তাতে ফুঁ দিয়ে প্রাণ ঢালেন।
গুলাবো সাপেরা শুধু কালবেলিয়া নাচকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেননি, বিশ্বজুড়ে অনুরাগীও পেয়েছেন। তিনি বলিউড ও রাজস্থানি চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন, বিগ বস-এ অংশ নিয়েছেন। ফরাসি শিল্পীদের সঙ্গে অ্যালবাম প্রকাশ করেছেন, ফ্রান্সে তাঁর নামে রাস্তা রয়েছে বলে শোনা যায়। ডেনমার্কে তাঁর স্কুল আছে, এছাড়াও জয়পুর ও পুষ্করে প্রতিষ্ঠা করেছেন গুলাবি সাপেরা ডান্স ইনস্টিটিউট।
২০১০ সালে ইউনেস্কো কালবেলিয়া নৃত্যকে 'Intangible Cultural Heritage of Humanity'-র স্বীকৃতি দেয়। ২০১৬ সালে গুলাবো সাপেরা পদ্মশ্রী পুরস্কার পান। ২০২১-এ পান ভারত গৌরব।
১৯৮৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে গুলাবো বিয়ে করেন লোকশিল্পী শোয়ান নাথকে। তাঁদের দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। বড় ছেলে বিবাহিত, ছোট ছেলে ‘ডিনো বানজারা’ নামে ব্যান্ড গড়েছেন। মেয়েরা উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্ত। সংসারে কখনও লিঙ্গভেদ করেননি দু’জন, গুলাবো রোজগার করলেও, শোয়ান গৃহস্থালির কাজে পাশে থেকেছেন।
প্রাণভোমরার মৃত্যুকে ছুঁয়ে ফিরে এসে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল ওই 'ধন্যি মেয়ে'র, সেই ছন্দে আজও মেতে রয়েছে রাজস্থানের মাটি।