জীবনানন্দকে নিয়ে সমালোচনার আরও একটা দিক কবিতার কদর্থ করে সাহিত্যনীতিহীন আক্রমণ। প্রধান পুরোধা সজনীকান্ত দাস। ঐতিহাসিকভাবে ঘটনাটি সত্য ও বহুল চর্চিত, স্বীকার করি। কিন্তু এরও একটি উলটো পিঠ রয়েছে।

শিল্পী: শুভাপ্রসন্ন
শেষ আপডেট: 22 October 2025 16:46
জিনিসপত্র নেওয়ার আগে ক্রেতা সুরক্ষা মিশন হলোগ্রাম যাচাই করে নিতে বলে, যাতে কোনও কিছু কিনে শেষকালে পস্তাতে না হয়। এই যাচাইপ্রক্রিয়া চাল-ডাল-নুন কিংবা তালমিছরির ক্ষেত্রে জুতসই হলেও কবিতা বিচারে কতদূর সার্থক বা আদৌ সার্থক কি না, একটু বুঝে নেওয়ার সময় এসেছে।
‘নির্জনতম’ কথাটি বেশ চমকধরানো, সন্দেহ নেই। আমরা ‘নির্জন’ বিশেষণে দিব্যি স্বচ্ছন্দ ছিলাম। ‘নির্জন অরণ্য’, ‘নির্জন বালুতট’ কিংবা এক কদম এগিয়ে ‘নির্জন মনন’ বলে, লিখে ও শুনে নান্দনিক আমোদ জুটত বেশ। কিন্তু যেই বুদ্ধদেব বসু দুম্ করে একটি প্রবন্ধে জীবনানন্দকে বলে বসলেন ‘নির্জনতম কবি’, ঠিক তখনই প্রায় অব্যবহৃত, কার্যত তামাদি হতে বসা সুপারলিটিভ ডিগ্রির এক বিপুল অভিঘাত আমাদের স্বস্তিসুখকে বেজায় নাড়া দিল। যার পিছুটান ছেড়ে আমরা আজও বেরিয়ে আসতে পারলাম না!
কেন পারলাম না, তার একটা বড়ো কারণ বোধহয় স্বভাবজাত বাঙালি-আলস্য। স্কুলের অঙ্কের মাস্টারমশাই যদি গুরুগম্ভীর চালে বলে দেন, অমুক চ্যাপ্টারের সমস্ত অংক তমুক ফর্মুলায় কষলে মিলে যাবে, তখন ঈর্ষণীয় কুঁড়ে এবং বেজায় স্থবির ছাত্র চোখ-কান বন্ধ করে সমস্ত অঙ্ক একই সূত্র মেনে সমাধান করে চলে। তাতে লজিকের দফারফা হলেও কিছু আসে-যায় না!
ঠিক তেমনই জীবনানন্দের গায়ে ‘নির্জনতম’ লেবেলটি এঁটে দিলে পাঠক হিসেবে আমরা বেশ আরাম পাই… অনেক কাজ হালকা হয়ে যায়। তখন সব কবিতার এক দর। ‘সুচেতনা’ হোক কিংবা ‘রাত্রির কোরাস’—যাবতীয় সৃষ্টির এক ঠাঁই। কবির কোনো পর্বান্তর আমাদের চোখে পড়ে না। কিংবা বলা ভালো, চোখ মেলে চাওয়ার যে-ক্লেশ, সেটুকুও সহ্য করতে হয় না!
অথচ এই শ্রুতিমধুর, শ্রান্তিলাঘব ‘নির্জনতম’ অভিধাটি কী সাংঘাতিক রকমের বিভ্রান্তিকর! শোনামাত্র খুব স্বাভাবিকভাবেই ধারণা জন্মায়, জীবনানন্দ বুঝি সমাজবিচ্ছিন্ন, পলায়নবাদী, আত্মমগ্ন কোনও কবি। তিনি যেন প্রকৃতির… শুধুমাত্র প্রকৃতির মায়াঞ্জনেই আর সব ভুলেছেন। সাহিত্যের ভরা বাজারে আজও তাঁর নামের সঙ্গে হয় ‘বনলতা সেন’ নয় ‘রূপসী বাংলা’-কেই যে একরকম অচ্ছেদ্য জড়িয়ে থাকতে দেখি, সিলেবাসেও ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’-ই প্রজন্মবাহিত সংস্কারের মতো ঠাঁই পেয়ে আসে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভুল দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ানো হয়, তার কারণ: সকলেই চোখেই তিনি মানুষের কেউ নন, সমাজের কেউ নন… আত্মবিচ্ছিন্ন এক ভাবুক কবিমাত্র।
অথচ বাস্তব ঠিক উলটো। আমি বাদ দেব না কাব্যকৃতিতে অপেক্ষাকৃত হীনবল ‘ঝরাপালক’-কেও। সেখানে সমসাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনার (সত্যাগ্রহ, অসহযোগ আন্দোলন) প্রণোদনায় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক কিংবা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের মতো ব্যক্তিত্বদের নিয়ে একাধিক কবিতা তিনি লিখেছেন। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’-তেও কবির ব্যক্তিগত জীবন সমস্যা, অনটন ও দুর্যোগের প্রক্ষেপ লক্ষ করা যায়। কিন্তু নৈরাশ্য কিংবা আশাবাদের যে কোনও একটা কখনওই জীবনানন্দের কবিতার ধ্রুব বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠেনি। আশা-নিরাশার এই যুগপৎ, অঙ্গাঙ্গী চলন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তকে লেখা তাঁর একটি চিঠিতে সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে—‘আষাঢ় এসে ফিরে যাচ্ছে, কিন্তু বর্ষণের কোনো লক্ষণই দেখছিনে।… চারিদিকে সবুজ বনশ্রী, মাথার উপর সফেদা মেঘের সারি, বাজপাখির চক্কর, আর কান্না। মনে হচ্ছে যেন মরুভূমির সব্জিবাগানের ভেতর বসে আছি, দূরে দূরে তাতার দস্যুর হুল্লোড়।’
অথচ ‘বনলতা সেন’-এর পর প্রকাশিত ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’ কিংবা ‘বেলা-অবেলা-কালবেলা’-য় উপমা এবং চিত্রকল্পের কোনও আপাত জটিলতা ছাড়াই শোনা গেল বিপুল সংশয়, বিষাদ, অবসন্নতার সুর। সেই স্বর প্রত্যক্ষ ও গভীর। পঞ্চাশের মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মড়ক, খাদ্য সংকট এবং এত বিপর্যয় ছাপিয়ে উঠে আসা মানুষের নৈতিক স্খলন দেখে ব্যথিত কবির অন্তরের যাবতীয় বিক্ষোভ ধরা আছে এই ক’টি বইয়ের সিংহভাগ কবিতায়। এমনকি ‘রূপসী বাংলা’-র কথাও যদি ধরি, সেখানে কি কবি নিছকই বাংলার চিরন্তন প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর নম্র প্রণতি জ্ঞাপন করেছেন? বোধহয় না। বঙ্গপ্রকৃতির এক ‘অলিখিত সংস্কৃতি’, ঔপনিবেশিকতা যাকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে, বাংলার ‘নীলিমা’ যখন মুছে যাওয়ার আশঙ্কায় ‘ত্রস্ত’, তখন ছিন্নমূল কবি জীবনানন্দ প্রায় ঘোরের মধ্যে লেখা ‘রূপসী বাংলা’-র কবিতাগুলির মাধ্যমে সেই ক্রমশ হারিয়ে যাওয়া লৌকিক পরম্পরার একগুচ্ছ চলচ্ছবি, খতিয়ান নির্মাণ করে গেলেন। পাশাপাশি উৎখাত হয়ে, প্রত্যাখ্যাত হয়ে চলে আসার বেদনার মর্মও সেখানে ধরা রইল।
এই ভরপুর সচেতনতা ‘নির্জনতম’ কবির মধ্যে থাকাটা ঠিক কতখানি দুষ্কর এবং অসম্ভব হতে পারে! জীবনানন্দের এই হঠাৎ বাঁকবদল, খুব স্বাভাবিকভাবেই, বুদ্ধদেব বসু কিংবা অন্যান্যদের পক্ষে স্বস্তিদায়ক ছিল না। তাই কবিতা পত্রিকার ১৩৫৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিন সংখ্যায় তিনি হতাশা জানান এভাবে: ‘জীবনানন্দ দাশ কী লিখছেন আজকাল?’ তারপর এক অকাট্য নিদান ঘোষণার ঢঙে বলেন: ‘প্রকৃতির কবি তিনি, তা ছাড়া কিছুই নন… তাঁর স্বদেশ থেকে তাঁর রাজত্ব থেকে মনকে সরিয়ে এনে তিনি নিজেকে বন্দি করেছেন চলতি আন্দোলনের আন্দামানে।’
জীবনানন্দকে নিয়ে সমালোচনার আরও একটা দিক কবিতার কদর্থ করে সাহিত্যনীতিহীন আক্রমণ। প্রধান পুরোধা সজনীকান্ত দাস। ঐতিহাসিকভাবে ঘটনাটি সত্য ও বহুল চর্চিত, স্বীকার করি। কিন্তু এরও একটি উলটো পিঠ রয়েছে। অনেকেই জানেন না, জীবনানন্দের মৃত্যুর পর সুভাষ মুখোপাধ্যায় কিংবা মণীন্দ্র রায়ের মতো সজনীকান্তও ক্ষমাপ্রার্থনা করে নিজের ভুল শুধরে বেশ কিছু কথা লেখেন। সেই কথাগুলি উদ্ধৃত করেই আমি লেখার ইতি টানছি। সজনীকান্ত বলেন: ‘আজ কালধর্মে আমাদের মতি ও বুদ্ধির পরিবর্তন হইয়াছে। তিনিও সকল নিন্দা-প্রশংসার ঊর্ধ্বে চলিয়া গিয়াছেন। পুরাতন যাবতীয় অশোভন বিরূপতা সত্ত্বেও এ কথা আজ স্বীকার করা কর্তব্য মনে করিতেছি যে, রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্যসাহিত্যের তিনি অন্যতম গৌরব ছিলে।… সহৃদয় ব্যক্তিরা তাঁহার বক্তব্যের চাবিকাঠি খুঁজিয়া পাইয়া আনন্দ লাভ করিতেন। যাঁহারা পাইতেন না তাঁহারাই বিমুখ হইতেন। আমরা শেষোক্তদের দলে ছিলাম।’