Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
TB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তানসরকারি গাড়ির চালককে ছুটি দিয়ে রাইটার্স থেকে হাঁটা দিলেন মন্ত্রীছত্তীসগড়ে পাওয়ার প্ল্যান্টে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ! মৃত অন্তত ৯, ধ্বংসস্তূপের নীচে অনেকের আটকে পড়ার আশঙ্কা

পরম-পিয়া বিতর্কে ফিরে দেখা এক ইতিহাস, পিকাসো ও গিঁলোর প্রেম-সহবাস ও বিচ্ছেদ

এই ফরাসি ভদ্রমহিলা এমন দু'জনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছেছিলেন, যে দুইজনই ছিলেন বিশ শতকের দুই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। তাতে তাঁর জীবনটাই আমূল বদলে গিয়েছিল।

পরম-পিয়া বিতর্কে ফিরে দেখা এক ইতিহাস, পিকাসো ও গিঁলোর প্রেম-সহবাস ও বিচ্ছেদ

শেষ আপডেট: 5 December 2023 17:48

সৌরদীপ চট্টোপাধ্যায়

বিয়ে ব্যাপারটা হয় দু’জনের মধ্যে। ফলে ব্যাপারটা দু’জনের মধ্যে থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বিয়ে নিয়ে বক্তব্য কেবল দু’জনের মধ্যে থেমে গেলে চলবে না। কে কাকে বিয়ে করবেন, কেন করবেন, কোন যুক্তিতে করবেন, কাজটা ঠিক হল কিনা— এই সমস্ত যাবতীয় মহাগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব না পেলে আর বিয়ে করার মানেটা রইল কী? আবার, বিয়ে যা-ও বা মানা যায়, ডিভোর্স তো নৈব নৈব চ’। অমন মহাপাতকের কাজ বোধ করি আর দু’টি নেই। ডিভোর্স করে আবার বিয়ে? পাপের মাত্রা যেন আরও এক ধাপ চড়ে যায়। 

অতএব বঙ্গদেশেও একজন গায়কের প্রাক্তন স্ত্রী একজন নায়ককে বর্তমান রূপে বেছে নিতেই শুরু হয়েছে বিতর্ক।

প্রায় এরকমই একজনের গল্প রইল আজ। প্রায় বিস্ময়কর গল্পই বটে। এই ফরাসি ভদ্রমহিলা এমন দু'জনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছেছিলেন, যে দুইজনই ছিলেন বিশ শতকের দুই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। তাতে তাঁর জীবনটাই আমূল বদলে গিয়েছিল।

ভদ্রমহিলার নাম ফ্রাসোয়েঁ গিলোঁ। শিল্প নিয়ে যারা নিয়মিত বা অনিয়মিত চর্চাও করে থাকেন, তাঁরা নিশ্চিতভাবেই নাম জানবেন। শিল্পী হিসেবে তিনি আপন মহিমাতেই বিখ্যাত। কিন্তু শিল্পের বাইরের দুনিয়ায় কতজন তাঁর শিল্পকর্মের কথা জানেন, সন্দেহ আছে। তাঁর বেড়ে ওঠা যে সময়, তখন চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। শোনা যায়, যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে সর্বস্ব নিয়ে একটা ট্রাকে করে পালাচ্ছিলেন তাঁরা। কিন্তু বিধি বাম। ট্রাকে বোমা এসে পড়ে। তাঁরা প্রাণে বাঁচলেও, নষ্ট হয়ে যায় গিলোঁর একাধিক অল্পবয়সের কাজ।

Exclusive: Françoise Gilot Celebrates Her 100th Birthday With Her First  Solo Show In Hong Kong | Tatler Asia

এরপরের ঘটনা সিনেমাকেও হার মানাতে পারে।

১৯৪৩ সালের মে মাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে, জার্মান ওয়েরমাখটের আক্রমণের সামনে গোটা ফ্রান্স তখন তছনছ হয়ে গিয়েছে। সরকারিভাবে ফ্রান্স এসে গিয়েছে নাৎসি দখলদারিতে। প্যারিসের রাস্তায় টহল দিচ্ছে জার্মান সাঁজোয়া গাড়ি। সেরকম সময়েই সেইন নদীর বাঁ পাড়ের এক রেস্তোরাঁ লা কাতালানে খাওয়াদাওয়া সারতে এসেছিলেন আর্টের ছাত্রী ফ্রাসোয়েঁ গিলোঁ। বয়স একুশ। ধনী পরিবারের মেয়ে—রীতিমতো সরবোন আর কেমব্রিজে পড়াশোনা। কিন্তু শখ এবং নেশা দুইই ছবি আঁকা। মাতৃভূমির দুরবস্থা টলাতে পারেনি তাঁকে। গেস্টাপো ও ব্ল্যাকশার্টের মত দুর্ধর্ষ জার্মান আধাসামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন, জেলও খেটেছেন। তবু হিটলারের কথা কানে তোলেননি।

 লা কাতালানের সেদিনের টেবিলে গিলোঁর সঙ্গী ছিলেন দুই বন্ধু, তরুণী জেনেভিভ অ্যালিকো ও তরুণ অভিনেতা অ্যালান কানি। উল্টোদিকের টেবিলেই ছিলেন ৬১ বছরের এক প্রৌঢ়। জাতে স্পেনীয় কিন্তু কর্মসূত্রে তিনিও সেই সময় প্যারিসেই আছেন। দুই তরুণীকে দেখে বেশ ভাল লেগেছিল তাঁর। উঠে এলেন। অ্যালানকে বললেন আলাপ করাতে। জানলেন, দু’জনেই আর্টের ছাত্রী, ছবি আঁকায় আগ্রহ। শুনে আরোই প্রীত হলেন। ছবি যে তাঁরও কাজের জায়গা। কাছেই গ্র্যান্ড অগাস্টিন স্ট্রিটে তাঁর স্টুডিও। বললেন, একদিন সময় করে এসো, দেখে যাও।

The revindication of Françoise Gilot, the woman who got fed up with Pablo  Picasso | Culture | EL PAÍS English
পিকাসো ও গিলোঁ

প্রৌঢ়কে দেখে যদিও তরুণীদের কী অবস্থা হয়েছিল, চট করে ভাবা মুশকিল। তাঁরা আর্টের ছাত্রী, ছবি আঁকাকেই পেশা হিসেবে নিতে চান। যুদ্ধ চলছে, ভবিষ্যৎ কী হবে জানেন না। জানেন শুধু—আর্ট একটা বিরাট সমুদ্র। এদিকে তাঁদের কিনা স্টুডিও দেখতে ডাকছেন ইনি?

 আসলে তিনি ঠিক যে-সে লোক ছিলেন না। প্রৌঢ় ভদ্রলোকের নাম পাবলো পিকাসো।

বিশ শতকের চিত্রকলার ইতিহাসটাই পাবলো পিকাসো একা হাতে আরেকবার লিখে দিতে পারতেন। ততদিনে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রকর। তাঁর ‘ব্লু পিরিয়ড’, ‘রোজ পিরিয়ড’, ‘আফ্রিকান পিরিয়ড’, নিওক্লাসিক, সুররিয়াল ইত্যাদি নানা গোত্রের, নানা ধাঁচের ছবি ততদিনে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে দুনিয়ায়। আন্দ্রে ব্রেতোঁ ঘোষণা করে দিয়েছেন, পিকাসো তাঁদেরই লোক, সুররিয়াল ঘরানার অন্যতম প্রাণপুরুষ। ব্রেতোঁ সালভাদর দালির কাছে পিকাসোর কথা বলেছেন, দালি নিজে পিকাসোর সঙ্গে আলাপ করতে চান। এ’হেন পাবলো পিকাসোর তুলির পাশাপাশি নারীসঙ্গের খ্যাতিও ছিল লাগামছাড়া। গিলোঁ ও তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে যখন আলাপ করছেন, তখনই নাকি তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর তৎকালীন সঙ্গিনী, ডোরা মার। কয়েকদিন পরেই যাকে ঝেড়ে ফেলবেন তিনি!  

The revindication of Françoise Gilot, the woman who got fed up with Pablo  Picasso | Culture | EL PAÍS English

 গিলোঁর মন্দ লাগেনি তাঁকে। সদলবলে গিয়েছিলেন পিকাসোর স্টুডিওতে। সঙ্গে ছিলেন সেদিনের বান্ধবী, জেনেভিভ। পিকাসো অনুরাগ গোপন করেননি। গিলোঁও আপত্তি করেননি। কিছুদিন পরেই জেনেভিভ বাড়ি ফিরে গেলেন। ফিরলেন না গিলোঁ। প্যারিস জুড়ে তীব্র ডামাডোল অবস্থা। যুদ্ধের মোড় ঘুরেছে। পিকাসো সেই সময় ছবির প্রদর্শনী করতেন না। তাও জার্মান আধাসামরিক অফিসাররা এসে তল্লাশি চালিয়ে যেত তাঁর স্টুডিওতে। পিকাসোর সঙ্গী থাকতেন গিলোঁ। কাটাতেন অন্তরঙ্গ মুহূর্ত। কুড়ি-একুশ বছরের মেয়েটির অদম্য মনোবল অবাক করত পিকাসোকে।

 দু’জনের বয়সের ফারাক ৪০ বছরের। একজন তখনও পড়ুয়া, শিক্ষানবিশ, শিল্পী হতে চান, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায়। অপরজন প্রৌঢ়ত্বে, খ্যাতির অভ্রভেদী চূড়ায়। ১৯৪৪ সালে যুদ্ধের হাওয়া ঘুরতে ফ্রান্স স্বাধীন হল, নরম্যান্ডি উপকূলে এসে নামল মিত্রশক্তির নৌবহর ও আকাশ-বাহিনী। পিকাসো যোগ দিলেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। খ্যাতি সামলানো মুশকিল হল। এদিকে ফ্রাসোয়েঁ গিলোঁ তখন পাকাপাকিভাবে পিকাসোর সঙ্গী। এতে যা যা সমস্যা হওয়ার, তার সবক’টাই হল। পিকাসো গিলোঁকে দেখেছিলেন কেবল সঙ্গী হিসেবেই। তার বেশি নয়। নিজের চিত্তবিনোদন ও শিল্প-প্রস্ফুটনের উপকরণ। নারীসঙ্গে একবার তৃপ্ত হলেই পিকাসোর মন ঘুরে যেত। যখনই বুঝলেন, গিলোঁকে তিনি ‘জয়’ করে ফেলেছেন, তাঁর নজর ঘুরল পরের লক্ষ্যে। এদিকে গিলোঁ ততদিনে সন্তানসম্ভবা। ১৯৪৭ সালে জন্মালেন পুত্র ক্লদ, ১৯৪৯ সালে কন্যা পালোমা।

Artist Francois Gilot poses with her work at a personal art exhibition in Milan, Dec. 21, 1965. (AP Photo, File)

এদিকে পিকাসোর যথারীতি সেদিকে বিশেষ আগ্রহ নেই। চলত নানাবিধ অবজ্ঞা, অত্যাচার, মনোমালিন্য। শেষে ১৯৫৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর তিনি পিকাসোকে শেষ অবধি জানালেন, তিনি আর থাকছেন না। মানতে পারেননি পিকাসো। তীব্রভাবে আক্রমণ করেছিলেন। ‘তুমি মরুভূমিতে গিয়ে ঠেকবে। ওরকমই হবে তোমার হাল। কেউ তোমাকে নিয়ে আগ্রহী হবে না। ওই সামান্য একটু কৌতূহল থাকবে তোমাকে নিয়ে, কারণ তুমি আমার সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছিলে। স্রেফ ওইজন্যই!’ শোনা যায়, পিকাসোর প্রাক্তন স্ত্রী ও সঙ্গিনীদের দ্বারা আক্রান্ত হতে হয়েছিল তাঁকে। পিকাসো নিজে গিলোঁর ছবি যাতে প্রচার না পায় সেইজন্য আর্ট ডিলারদের বলে দিয়েছেন। ভুগতে হয়েছে গিলোঁকে। ধাক্কা খেয়েছেন শিল্পী হিসেবে। 

কিন্তু দমেননি। পিকাসো কিছুতেই ক্লদ বা পালোমাকে মানতে চাননি। তাদের মুখ দেখবেন না বলেছিলেন। তাঁর বিপুল উত্তরাধিকারের কণামাত্র তারা পাক তিনি চাননি। অথচ গিলোঁ ঠিক করেছিলেন, সন্তানদের কোনও রকম বঞ্চনার মুখোমুখি হতে দেবেন না। পরে আবার বিয়ে করেন। এবারের সঙ্গী তাঁর ছোটবেলার বন্ধু ও শিল্পী লুক সিমন। এক কন্যা জন্মাল। কিন্তু সে বিয়েও টিকল না। ১৯৬৩ সালে পিকাসোর সঙ্গে তাঁর কাটানো ঝড়ঝাপ্টার দিন নিয়ে লিখলেন ‘লাইফ উইথ পিকাসো’—সে বই বেস্টসেলার হয়ে গেল। পিকাসো ছাপা আটকানোর চেষ্টা করেও পারেননি। শিল্পী হিসেবেও লন্ডন, হ্যামবুর্গ, মিলান, নিউ ইয়র্কে গিলোঁর ছবির প্রদর্শনী হল।

Obit Francoise Gilot
‘লাইফ উইথ পিকাসো’-বইয়ের প্রকাশ উপলক্ষ্যে একটি সাক্ষাৎকারে ফ্রাসোয়েঁ গিলোঁ

এইরকম সময়ে তিনি কাজে গিয়েছেন আমেরিকায়। নিউ ইয়র্কে তাঁর সঙ্গে আলাপ হল একজন ডাক্তারের। যদিও ডাক্তারিটা তিনি কোনওকালেই পছন্দ করতেন না। ডাক্তারি করবেন না বলে পড়াশোনায় তুখোড় হয়েও ডুবে গিয়েছিলেন গবেষণায়। সেই গবেষণাই পরে ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। তিনি এমন একটা টিকা আবিষ্কার করেছিলেন, আজও প্রতিটি শিশুর জন্মের পরে সেটা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কার্যত, তাঁর সেই গবেষণার জেরেই ভারত আজ গর্বিতভাবে সেই কুখ্যাত রোগ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পেরেছে। গিলোঁর সঙ্গে যখন আলাপ, তখন তিনি আর মোটেও ‘একজন ডাক্তার’ নন। তিনি জোনাস সল্ক, বিশ শতকের অন্যতম প্রবাদপ্রতিম বৈজ্ঞানিক, আজকের পোলিও টিকার আবিষ্কারক।

সল্ক ছিলেন মিতবাক। আবার আপনভোলা বিজ্ঞানসাধকও নন। গিলোঁর প্রথম আলাপেই বেশ ভাল লেগে গিয়েছিল সল্ককে। সল্কের ব্যাপারে কিছু পড়াশোনাও ছিল তাঁর। পরের পর আলাপে গিলোঁ বুঝেছিলেন, সল্ক আসলে খুব চাপা, যাকে বলে ‘ইন্ট্রোভার্ট’—কেউ সেভাবে বুঝে উঠতে পারেননি তাঁকে। 

খুব একটা ভুল করেননি তিনি। অন্যদিকে গিলোঁর শিল্পবোধ, প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও ধীরতা গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল সল্ককে। তিনিই বিয়ের প্রস্তাব দেন গিলোঁকে। সল্ক তখন পঞ্চান্ন। গিলোঁ আটচল্লিশ। কেমন ছিল সেই বিয়ের প্রস্তাব? কলেজের প্রেমকেও হার মানাতে পারে সেই দৃশ্য। মাত্র ছয় মাস হয়েছে আলাপের। সূর্য তখন পশ্চিমে, সান্টা মনিকা বে-র ওপর, প্রশান্ত মহাসাগরের দিগন্তে ঢলে পড়ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার সেই পড়ন্ত বিকেলে গিলোঁকে বিবাহের প্রস্তাব দেন সল্ক। গিলোঁ পত্রপাঠ না করে দেন।

Francoise Gilot and Dr. Jonas Salk at home...
জোনাস সল্ক ও ফ্রাঁসোয়েঁ গিলোঁ

 ‘সম্পর্ক অবধি ঠিক আছে। কিন্তু বিয়ে করতে পারব না’—জানান গিলোঁ।

 সল্ক প্রশ্ন করেন, ‘কেন?’

 ‘কারণ আমি কারোর সঙ্গেই বছরে ছয় মাসের বেশি থাকতে পারব না। আমার নিজের জন্য সময় দরকার। তাছাড়া আমার ছেলেমেয়েরাও আছে।’

 ডাঃ জোনাস সল্ক পকেট থেকে একটা কাগজ আর পেন বের করে এগিয়ে দেন। ‘তোমাকে একঘন্টা সময় দিলাম। যা যা তুমি চাও না, ঝটপট লিখে ফ্যালো।’

 গিলোঁ তাই করলেন। কাগজটা হাতে নিয়ে সল্ক পড়লেন, তারপর মাথা নেড়ে বললেন, ‘ব্যাস, ঠিক আছে। একদম খাপে খাপ যাচ্ছে আমার জীবনের সঙ্গে’।

 গিলোঁ তাও মাথা নাড়েন। ‘আমরা একে অপরকে চিনি না। এটা ভয়াবহ হয়ে যেতে পারে, কারণ তুমি একজন বৈজ্ঞানিক, আমাদের জীবন খুব আলাদা।’

 সল্ক বললেন, ‘তাতে কী? দ্যাখো, আমরা যদি খুশি না-ও হই, আমরা কিন্তু দুর্গের মত হতে পারি, একে অপরকে আড়াল করে রাখব।’

 ডাঃ জোনাস সল্ক ও ফ্রাসোয়েঁ গিলোঁ—দু’জনেরই জীবন তখন ঝড়ঝাপ্টায় বিধ্বস্ত। পোলিওর ভ্যাকসিন নিয়ে বিস্তর ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়েছে সল্ককে, কাটার ল্যাবের দুর্ঘটনায় কার্যত বিপর্যয় ডেকে এনেছিল জোনাস সল্কের জীবনে। নিজের তিন দশকের স্ত্রী ডোনা লিন্ডসের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে বছর দুয়েক আগে। খ্যাতি তাঁর মত মিতবাকের জীবনে অভিশাপ-সম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। লাগামছাড়া প্রশ্নে জর্জরিত করত সংবাদমাধ্যম। এদিকে গিলোঁর জীবন থেকেও পিকাসোর ছায়া কখনও সরেনি। নিজের সমস্ত শিল্পীসত্তা ‘পিকাসোর সঙ্গী’ পরিচয়ের মেঘ থেকে কার্যত বেরোতেই পারেনি কখনও। দুই ভাঙাচোরা, বিধ্বস্ত, ক্লান্তভাবে বারবার উঠে দাঁড়াতে চাওয়া মানুষ অবশেষে ১৯৭০ সালের ২৯ জুন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হ’ন। সল্কের প্রস্তাব মেনেছিলেন গিলোঁ, ওই পুরো কথোপকথনের বিবরণ নিজেই দিয়েছিলেন এক টিভি সাক্ষাৎকারে।

Francoise Gilot
জোনাস সল্ক ও ফ্রাঁসোয়েঁ গিলোঁ

 জোনাস সল্ক ও ফ্রাঁসোয়েঁ গিলোঁর বিয়ে আর কখনও ভাঙেনি। বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন সল্ক ও গিলোঁর পুত্র-কন্যারা। সল্কের জীবন ছিল স্রোতবিহীন, বিস্বাদ। ছোটবেলা কেটেছে পড়াশোনায়, তারপর মুখ বুজে কাজে। গবেষণা, ল্যাব, পরীক্ষা, পেটেন্ট, কনফারেন্সের বাইরে কখনও বেরোতেই পারেননি সল্ক। অবশেষে সেসব বদলাল। গিলোঁর সঙ্গে সল্ক কখনও যেতেন সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে, কখনও টেনিস ক্লাবে, কখনও পাহাড়ে হাইকিং করতে। গিলোঁর পাল্লায় পড়ে সল্ক স্বাদ পেলেন নিউ ইয়র্কের বিশ্ববিখ্যাত ব্রডওয়ের, দেখতেন অপেরা, কনসার্ট। গিলোঁর কন্যা অরেলিয়াকে নিয়ে তিনি কমেডি দেখতেও যেতেন। 

সল্কের জীববিজ্ঞান ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ ছিল। এমনিতে চাপা হলেও ঘনিষ্ঠ মহলে অত্যন্ত খোলামেলা ছিলেন তিনি, সেন্স অফ হিউমারও ছিল দুর্দান্ত। ফরাসি পত্নীর সুবাদে ফরাসি শিখেছিলেন, প্যারিসে গেলে কাফেতে সময় কাটাতেন। 

39 个 François Gilot 点子

গিলোঁ সল্কের খাওয়াদাওয়া থেকে যোগব্যায়াম সবেতেই নজর রাখতেন। সল্কের পোশাক, সাজসজ্জাতেও গিলোঁর ছোঁয়া ম্যাজিকের কাজ করত। বন্ধুবান্ধবরা অবাক হতেন। রীতিমতো খবরের কাগজে অবধি বেরিয়েছিল, ডাঃ জোনাস সল্কের হলটা কী! এত সুসজ্জিতভাবে তাঁকে তো এর আগে কখনও দেখা যায়নি!

১৯৯৫ সালের ২৩ জুন আশি বছর বয়সে ডাঃ জোনাস সল্ক হৃদরোগে প্রয়াত হ’ন। ফ্রাঁসোয়েঁ গিলোঁ তারপরেও বেঁচে ছিলেন প্রায় তিন দশক। এই বছর, ২০২৩ সালের ৬ জুন ১০১ বছর বয়সে তিনি প্রয়াত হ’ন। একুশ শতক তাঁকে আর মনে রাখতে চায়নি। বিশ শতকের দুই প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্বকে অন্তরঙ্গভাবে দেখা তাঁর আলোড়ন ফেলা জীবন শেষ হল প্রায় নির্বিবাদে। 

যেমন তিনি জীবনভর থাকতে চেয়েছিলেন।


```