অন্তর্দ্বন্দ্বে দীর্ণ ভারত-ভূখণ্ডে ব্রিটিশ শাসনের আগে অখণ্ড দেশভক্তি ছিল না বললেই চলে।

ভারতমাতার উজ্জ্বলতম আবির্ভাব যে গ্রন্থে, তার নাম 'আনন্দমঠ'।
শেষ আপডেট: 30 October 2025 13:21
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আমরা যে ভূমির উপরে রয়েছি, সেই ভূমিকে 'মা' বলে ডাকার অভ্যাস আমাদের বহুদিনের। এই মাতৃ-উপাসনা যখন দার্শনিক তাৎপর্যে মণ্ডিত হয়েছে, দেবী তখন আর নির্দিষ্ট ভূমিখণ্ডের পালয়িত্রী বলে চিহ্নিত হচ্ছেন না, তিনি হয়ে উঠছেন বিশ্বজননী, তাঁর অঙ্কে আবিশ্ব সকলের ঠাঁই। তাই শ্রীশ্রীচণ্ডীতে দেবীর নামান্তর ‘জগদ্ধাত্রী’ (Jagadhatri Puja 2025)। অন্তর্দ্বন্দ্বে দীর্ণ ভারত-ভূখণ্ডে ব্রিটিশ শাসনের আগে অখণ্ড দেশভক্তি ছিল না বললেই চলে। এই ধারণাটি এসেছে পাশ্চাত্য জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব থেকে, এসেছে দেশবাসীর পরাধীন যন্ত্রণার যুগে। আর, এদেশের পণ্ডিত ও তাত্ত্বিকেরা সেই ধারণাকে নিজেদের মতো গড়ে-পিটে নিয়ে যে দেবীর আবির্ভাব ঘটালেন, তিনিই 'ভারতমাতা'।
ভারতমাতার উজ্জ্বলতম আবির্ভাব যে গ্রন্থে, তার নাম 'আনন্দমঠ'। বঙ্কিমচন্দ্রের এই উপন্যাসেই সন্তান দলের অন্যতম বীর ভবানন্দের মুখে প্রথম শোনা গেছে দেশমাতৃকার বন্দনাগান। সন্তানদলের গুরু সত্যানন্দ মহেন্দ্রকে এই ভারতমাতার বিগ্রহ দেখিয়েছেন। সেই দেবীপ্রতিমার বর্ণনায় বলা হচ্ছে, "বিষ্ণুর অঙ্কোপরি এক মোহিনী মূর্তি- লক্ষ্মী সরস্বতীর অধিক সুন্দরী, লক্ষ্মী-সরস্বতীর অধিক ঐশ্বর্যান্বিতা।
গন্ধর্ব, কিন্নর, দেব, যক্ষ, রক্ষ তাঁহাকে পূজা করিতেছে।" পরবর্তীতে শিল্পীরা নিজের নিজের কল্পনার মাধুরী মিশিয়ে ভারতমাতার বহুবিচিত্র মূর্তি ও ছবি প্রস্তুত করার স্বাধীনতা লাভ করেছেন। যেমন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নিজের কল্পনা অনুযায়ীই ভারতমাতার ছবি এঁকেছেন তিনি। সেখানে তিনি গৈরিক বসনে আবৃতা চতুর্ভুজা যোগিনী। চার হাতে রয়েছে ধান্য, বস্ত্র, বিদ্যার আকর পুঁথি, আর ধর্মসাধনার দ্যোতক জপমালা।
এরপর সত্যানন্দ ওই দেবীরই কালভেদজনিত মূর্ত্যন্তর হিসাবে বঙ্গদেশে বহুল প্রচলিত তিনটি দেবীপ্রতিমা মহেন্দ্রকে দেখিয়েছেন। যথাক্রমে জগদ্ধাত্রী- "মা যা ছিলেন", কালী- "মা যা হইয়াছেন" এবং দুর্গা- "মা যা হইবেন"। বঙ্কিম জানালেন, "আজি দেশে সর্বত্রই শ্মশান- তাই মা কঙ্কালমালিনী"। কালীর পদতলে শবরূপী শিবের অবস্থান সক্রিয়া প্রকৃতির অধীনস্থ নিষ্ক্রিয় পুরুষের দ্যোতক - কিন্তু বঙ্কিম 'শিব' অর্থে 'মঙ্গল' ধরে নিয়ে বললেন, "আপনার শিব আপনার পদতলে দলিতেছেন- হায় মা!"
বঙ্কিমচন্দ্র দেখালেন যে, আমাদের জন্মভূমি দেশ মা পূর্বে ধনে,সম্পদে,ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ ছিল, যাঁকে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিনষ্ট করে কালিমালিপ্ত করেছে। এবং এই মা ভবিষ্যতে মুক্তি লাভ করে পুনরায় দশভুজা হয়ে উঠবেন। ভারতবর্ষের জাতীয়তাবাদে এই মাতৃমূর্তির বর্ণনা বিভিন্নভাবে স্বদেশী আন্দোলনকারীদের মনে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের সঞ্চার করেছে তাতে সন্দেহ নেই। সে কারণেই ‘আনন্দমঠ ‘-কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের ‘গীতা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।