Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
গরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তানসরকারি গাড়ির চালককে ছুটি দিয়ে রাইটার্স থেকে হাঁটা দিলেন মন্ত্রীছত্তীসগড়ে পাওয়ার প্ল্যান্টে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ! মৃত অন্তত ৯, ধ্বংসস্তূপের নীচে অনেকের আটকে পড়ার আশঙ্কাস্কি, ক্যান্ডেললাইট ডিনার আর পরিবার, বিয়ের জন্মদিনে কোন স্মৃতিতে ভাসলেন আলিয়া? পরপর দু’বার ছাঁটাই! চাকরি হারিয়ে 'বিহারি রোল' বানানো শুরু, এখন মাসে আয় ১.৩ কোটিনববর্ষে সস্তায় পেটপুরে খাওয়া! দুই বাংলার মহাভোজ একই থালিতে, হলিডে ইন-এ শুরু হচ্ছে ‘বৈশাখী মিলনমেলা’কষা মাংস থেকে কাটলেট! নববর্ষে তাজের সমস্ত হোটেলে জিভে জল আনা ভোজ, রইল সুলুকসন্ধানপিএসএল ছেড়ে আইপিএলে আসার কড়া মাশুল! ২ বছরের জন্য সাসপেন্ড কেকেআরের এই পেসার

'ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া...', গাভাস্কার-কপিলদের ব্যাটের জাদু, যেভাবে ভারতের ধর্ম হয়ে উঠল 'বিদেশি' ক্রিকেট

উপনিবেশের মাঠ থেকে লর্ডসের মঞ্চে জয়, ১৯৭০ থেকে ১৯৮০—এই দুই দশকেই বদলে গিয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাস।

'ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া...', গাভাস্কার-কপিলদের ব্যাটের জাদু, যেভাবে ভারতের ধর্ম হয়ে উঠল 'বিদেশি' ক্রিকেট

'ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া...'

অন্বেষা বিশ্বাস

শেষ আপডেট: 30 October 2025 12:24

অন্বেষা বিশ্বাস

দূরের কোনও মাঠে এক বিকেলে কেউ চেঁচিয়ে উঠেছিল—“আউট!”

হয়তো কেউ তখন টেলিভিশনের সামনে বসে নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিল। বাড়ির উঠোনে, ধুপধাপ শব্দে বাজছিল ঢাক, কেউ ছাদে উঁচুতে টাঙানো অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে সিগন্যাল ধরানোর চেষ্টা করছিল। আবার কেউ গ্যালারিতে, মুখে তেরঙা রঙ মেখে, কণ্ঠ ফাটিয়ে চিৎকার করছিল— “ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া!”

কিন্তু ১৯৭০ থেকে ১৯৮০-র দশকের ভারতীয় ক্রিকেটের গল্পটা শুধু খেলার ইতিহাস নয়, এটা ছিল এক দেশের জেগে ওঠার উপাখ্যান। সেই সময়ের ভারত ছিল যেন সদ্য কৈশোরে পা রাখা এক ছেলে। একটু লাজুক, একটু স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে। কিন্তু বুকের ভেতরে তার একটা তীব্র জেদ আর জেতার তাগিদ লুকিয়ে আছে।

বছরের পর বছর ধরে ক্রিকেট তখন ছিল ইংরেজদের খেলা। ভারত সেই খেলায় ছিল শুধুই অতিথি। হয়তো ভাল খেলত, কিন্তু খেলাটাকে কখনও নিজের বলে দাবি করতে পারেনি। মাঠে নামলে ভারতীয় দলের গায়ে তখনও লেগে থাকত উপনিবেশের ধুলো, হারার পর শোনা যেত কেবলই নীরবতা।

তারপর হঠাৎ, একদিন যেন সব বদলে গেল।
আকাশে উঠল এক নতুন সূর্য।

লর্ডসের ঘাসে, সাদা পোশাক পরা কিছু ভারতীয় তরুণ। চোখে অদ্ভুত এক আগুন। কেউ বিশ্বাস করেনি তারা পারবে। কিন্তু সেই দলই ইতিহাস লিখল, ব্যাটের ঘায়ে আর বলের গর্জনে যেন ভেসে উঠল এক নতুন সুর। শোনা গেল এক ঘোষণা—'আমরা আর প্রান্তিক নই, এ মঞ্চ এখন আমাদেরও।'

সেই বিজয় কেবল একটা ট্রফির আকারে আসেনি। এসেছিল এক ঝলক আলোর মতো, যা ছুঁয়ে গিয়েছিল গোটা দেশকে। সেদিন লর্ডসের মাটিতে শুধু কাপ নয়, উঠেছিল ভারতের আত্মবিশ্বাস।

India's first Test match victory

যে দেশ এতদিন নিজেকে কেবল অনুসারী ভেবেছিল, সেদিন সে নিজের শক্তি টের পেল প্রথমবার। সেই আলো ছড়িয়ে পড়েছিল ঘরের বারান্দা থেকে চায়ের দোকান পর্যন্ত, শহর থেকে মফস্বল পর্যন্ত। মানুষ বুঝে গিয়েছিল, জয় মানে শুধু স্কোরবোর্ডে সংখ্যা নয়। জয় মানে নিজের উপর বিশ্বাস। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয়েছিল এক নতুন ভারতের কাহিনি।

এই দুই দশকেই ভারতীয় ক্রিকেট বদলে গেল। একটা সময় যেখানে খেলাটা শুধুই জনপ্রিয় ছিল, তা পরিণত হল জাতির অল-ইনক্লুসিভ প্যাশনে। ক্রিকেট হয়ে উঠল আবেগ, উৎসব, আত্মপরিচয়।

চার জাদুকরের জাদু

গল্পের শুরুটা চারজন স্পিন জাদুকরকে নিয়েই। বিশ্বের বুকে নাম করেছিল ‘স্পিন কোয়ার্টেট’ নামে। বিষণ সিং বেদী, এরাপল্লি প্রসন্না, ভগবত চন্দ্রশেখর আর শ্রীনিবাস ভেঙ্কটরঘবন। তাঁদের হাতে থাকা বল যেন কথা বলত। একে একে বিশ্বের শক্তিশালী দলগুলো সেই জাদুর ফাঁদে জড়াতে লাগল।

এরপর মঞ্চে এলেন দুই ছোটখাটো ব্যাটসম্যান—সুনীল গাভাস্কার ও গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ। গাভাস্কার ছিলেন নিখুঁত 'রানের যন্ত্র'। আর বিশ্বনাথ ছিলেন কবি। তাঁর ব্যাট থেকে বেরতো 'স্ট্রোকের সুর'। কিছুদিন বাদেই দলে এলেন এক তরুণ, যার শরীরে যেন ঝড়ের গতি—কপিল দেব। তিনিই সেই ক্রিকেটার যিনি ব্যাট, বল, মাঠ, সব দিকেই জাদু দেখাতে পারতেন।

Gundappa Viswanath on Test cricket and why Sunil Gavaskar was a great  batting star | Cricket

এই যুগে তাঁদের সঙ্গে ছিল আরও অনেক নাম। অংশুমান গায়েকওয়াড, ব্রিজেশ প্যাটেল, কারসন ঘাভরি, দিলীপ দোশি, মোহম্মদ আজহারউদ্দিন, চেতন শর্মা, কৃষ শ্রীকান্ত, মনিন্দর সিং, এল. শিবরামাকৃষ্ণন, আর দুই দশক ধরে খেলেছেন মোহিন্দর অমরনাথ, দিলীপ ভেংসরকার, রজার বিনি, মদনলাল, সৈয়দ কিরমানি।

কিন্তু এই সব নামের মূলে ছিল দুই স্তম্ভ। গাভাস্কার ও কপিল। দু’জনই রেকর্ড ভেঙে রেখে গেলেন এমন উত্তরাধিকার, যেটা আজও অনুপ্রেরণা হয়ে আছে নতুন প্রজন্মের কাছে।

এক নতুন ভোরের শুরু

তবে এই সূচনার গল্পটা সহজ ছিল না। ষাটের দশকের শেষ দিকে ভারতীয় ক্রিকেট যেন দিকহারা নৌকা। অস্থির, অনিশ্চিত, নিজের গন্তব্য খুঁজে বেড়াচ্ছে। সেই সময়ই ঝড় উঠল। দীর্ঘদিন দলের নেতৃত্বে থাকা মনসুর আলি খান পতৌদিকে সরিয়ে দেওয়া হল। চারদিকে বিতর্ক, হতাশা, আর এক অদ্ভুত নীরবতা।

ঠিক সেই অস্থির সময়েই এল নতুন সকাল। ১৯৭১ সালের প্রথম প্রহরে ভারতীয় দল রওনা দিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। অনেকে ভাবছিলেন, এই সফরও হয়তো আগের মতোই হার-জিতের পুরনো কাহিনি হয়ে থাকবে। কিন্তু ভাগ্যের পাতা এবার অন্য গল্প লিখছিল।

সেই সফরেই ভারত ইতিহাসের প্রথমবার জিতল টেস্ট সিরিজ। যে জয় শুধু স্কোরবোর্ডে নয়, এক পুরো জাতির মনে জন্ম দিল বিশ্বাস- “আমরাও পারি।” সেই দিন থেকেই শুরু হল এক নতুন ভারতের ক্রিকেট কাহিনি, যেখানে স্বপ্ন আর সাহস একসঙ্গে হাঁটতে শিখল।

This day, that year: India win first ever Test series in England in 1971 -  India Today

এরপর ইংল্যান্ডে গেল দল—এবারও জিতল। একটা দেশ, যাদের আগের সফরগুলো (১৯৬২ ও ১৯৬৭) শেষ হয়েছিল ৫-০ ও ৩-০ ব্যবধানে পরাজয়ে, তারা এবার জয় ছিনিয়ে আনল।

অধিনায়ক অজিত ওয়াডেকারকে ঘিরে তখন অনেক প্রশ্ন ছিল। কিন্তু তিনি পাশে পেলেন অভিজ্ঞরা- এম এল জয়সিমহা, সলিম দুরানি, দিলীপ সারদেশাই, আবিদ আলি, আর সেই জাদুকর স্পিনারদের দল। তরুণ দলে ছিলেন বিশ্বনাথ, অশোক মানকাড, একনাথ সোলকর আর ২১ বছরের এক যুবক, যাঁর নাম তখনই আলোচনায়। নামটা সুনীল গাভাস্কার।

সেই সফরে সারদেশাই করলেন ৬৪২ রান, আর গাভাস্কার? অবিশ্বাস্য ৭৭৪ রান। কোনও ব্যাটসম্যান আজও পারেননি এমন রেকর্ড গড়তে নিজের প্রথম সিরিজে। সেখান থেকেই শুরু হল তাঁর ১৮ বছরের এক মহাকাব্য। যেখানে ছিল টেকনিক, দৃঢ়তা, একাগ্রতা ও অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা।

পরাজয়ের মধ্যেও উত্থান

যদিও ১৯৭৪ সালে ইংল্যান্ড সফরে ফের মেঘ নামল ভারতীয় ক্রিকেটের আকাশে। লর্ডসের সবুজ মাঠে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একের পর এক ভারতীয় ব্যাটসম্যান যেন বুঝতেই পারছিলেন না, কোথা থেকে আসছে বল, কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আত্মবিশ্বাস। মাত্র ৪২ রানে অলআউট হল পুরো দল। দর্শকরা হতবাক, খেলোয়াড়দের চোখে ক্লান্তি আর মনে গভীর হতাশা। দলের ভেতরেও তখন বিবাদের আগুন জ্বলছে।

The Story of India's 42 All Out at Lord's 1974, and Similarities With the  36 All Out in Adelaide | News News - News18

ঠিক তখনই, যেন এক অভিজ্ঞ নাবিকের মতো, আবার ফিরে এলেন মনসুর আলি খান পতৌদি। যে দল দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, তার হাল ধরলেন তিনি। অভিজ্ঞতা আর নেতৃত্বের মিশেলে তিনি দলের ভেতরে ফিরিয়ে আনলেন স্থিরতা। যেন ভাঙা নৌকার পালে আবার হাওয়া লাগল।

স্পিন কোয়ার্টেট তখন তুঙ্গে, সামনে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জ, কিন্তু তাঁদের ঘূর্ণি তখন অপ্রতিরোধ্য। সোলকর ও আবিদ আলির মতো ফিল্ডাররা একের পর এক ক্যাচে রক্ষা করছিল দলকে। আর রান করে যাচ্ছিলেন গাভাস্কার ও বিশ্বনাথ।

দুই লিটল মাস্টারের যুগ

গাভাস্কার, যিনি একবার ছুটতে শুরু করলে থামতেন না। আর বিশ্বনাথ, যিনি প্রথম টেস্টেই শতরান করে নিজেকে চিনিয়ে দিয়েছিলেন। দু’জনে মিলে এক সুরে বাজালেন 'ভারতীয় ব্যাটিংয়ের সিম্ফনি'। ১৯৭৫-৭৬-এ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ভারত ২-০ পিছিয়ে থেকেও লড়ল, শেষে ৩-২ হেরে গেল অল্পের জন্য। কিন্তু সেই লড়াইয়ে বিশ্বনাথ, বেদী, চন্দ্রশেখর, প্রসন্ন সবাই লেজেন্ড হয়ে উঠলেন।

আরেকটা ম্যাচ ইতিহাসে জায়গা করে নিল। পোর্ট অব স্পেন, ১৯৭৬। চতুর্থ ইনিংসে ৪০৬ রান তাড়া করে ভারত জয় পেল। গাভাস্কার ও বিশ্বনাথ দু’জনেরই শতরান। আর এই যুগলবন্দি যেন ছিল সাহস আর শৈলীর এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।

এক লহমায় বদল

এই সময়েই ভারত বুঝল তাদের দলে নেই এমন একজন ফাস্ট বোলার, যে সত্যিকারের ভয় দেখাতে পারে। ১৯৭৮-এ পাকিস্তান সফরে সেই অভাব পূরণ করলেন এক তরুণ- কপিল দেব। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তাঁর গতি, আগুন, আত্মবিশ্বাস দেখে সবাই চমকে গেল।

সেই সফরে পাকিস্তান জিতল, কিন্তু কপিলের সংক্ষিপ্ত স্পেলেই টের পাওয়া গেল। বোঝা গেল ভারত বদলাচ্ছে। বল হাতে তিনি সাদিক মহম্মদকে হেলমেট পরতে বাধ্য করেছিলেন। ব্যাট হাতে খেলেছিলেন নির্ভয়ে। ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন যুগের শুরু হয়েছিল সেই মুহূর্তে।

পরের বছর যখন পাকিস্তান এল ভারতে, তখন অধিনায়ক বেদী-কে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হল গাভাস্কারকে। এই সিরিজেই কপিল হয়ে উঠলেন ভারতের ‘হিরো’। দ্রুত শিখলেন সুইং ও সিমের নিখুঁত ব্যবহার। ১৯৭৯ সিরিজে তাঁর অলরাউন্ড দক্ষতা ছাপিয়ে গেল ইমরান খানের ঝলককেও। তিনিই সেই ক্রিকেটার যিনি ভাঙা পা নিয়েও বল হাতে ৫-২৮ তুলে এনে দলকে ম্যাচ জেতান।

দু’হাজার রান ও ২০০ উইকেটের রেকর্ড দ্রুততম সময়ে করে ফেলেন, আর ইমরান, বোথাম, হ্যাডলির সঙ্গে এক সারিতে পৌঁছে যান।

১৯৮৩—যে দিন বদলে গেল ভারতের ইতিহাস

১৯৮২-৮৩ সালে ভারত গেল পাকিস্তান সফরে। ইমরান তখন তুঙ্গে, ভারত হেরে গেল ৩-০ তে। অধিনায়কত্ব গেল গাভাস্কারের হাত থেকে, দায়িত্ব এল ২৪ বছর বয়সি কপিল দেবের কাঁধে। আর পরের টুর্নামেন্টেই। প্রুডেনশিয়াল কাপ ১৯৮৩, কেউই ভাবেনি কী হতে চলেছে।

India vs West Indies Final 1983

১৯৭৫ সালে প্রথম বিশ্বকাপে সুনীল গাভাস্কার খেলেছিলেন এক 'রহস্যময়' ইনিংস। ৬০ ওভারে মাত্র ৩৬ রান! সারা দেশ অবাক, কেউ বুঝতে পারল না, এত বড় ব্যাটসম্যানের মনে সেদিন কী চলছিল। তারপর ১৯৭৯ সালে এল আরও বড় হতাশা। সব ম্যাচেই পরাজয়, একটিও জয় নয়।

বিশ্বকাপের মঞ্চ তখন ভারতের কাছে যেন অভিশাপের মতো। প্রতিবারই আশা নিয়ে যাওয়া, আর ফিরতে হত মুখ নিচু করে। কেউই ভাবেনি, কয়েক বছরের মধ্যেই সেই ইতিহাস বদলে যাবে। আর সেই পরিবর্তনের নাম হবে কপিল দেব।

কিন্তু ১৯৮৩-তে, তিন সপ্তাহে কপিলের দল পুরো বিশ্বকে উলটে দিল। নিজেই খেললেন সেই অবিস্মরণীয় ১৭৫ রান, দলের জন্য যা ছিল অলৌকিক রক্ষা।

২৫ জুন, ১৯৮৩। লর্ডসের আকাশে তখন সোনালি বিকেল নেমে এসেছে। ম্যাচ শেষ, গ্যালারিতে তখনও গর্জে উঠছে হাজারো কণ্ঠ—“ইন্ডিয়া! ইন্ডিয়া!”

সেই উন্মত্ত গর্জনের মাঝেই লর্ডসের ঐতিহাসিক ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছেন কপিল দেব। দুই হাতে বিশ্বকাপ উঁচিয়ে তিনি যখন হাসলেন, সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ল দেশজুড়ে। এক মুক্তির হাসি, এক বিশ্বাসের হাসি।

সেদিন শুধু ভারত নয়, গোটা ক্রিকেটবিশ্ব দেখেছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। যে দেশকে এতদিন কেউ গুরুত্ব দিত না, সেই ভারতই দাঁড়িয়ে ছিল মঞ্চের কেন্দ্রে। কপিলের হাতে ট্রফি নয়, ছিল এক জাতির আত্মবিশ্বাস। ক্রিকেট হয়ে গেল ভারতের ধর্ম, বাজারে ঢুকল স্পনসরশিপ, টিভির পর্দা হয়ে উঠল মঞ্চ। এই জয় ছিল কেবল কাপ নয়। জাতীয় আত্মবিশ্বাসের বিস্ফোরণ।

কপিলের কাপ, বদলে গেল ভাগ্যের খেলা

১৯৮৩ সালে কপিল দেবের দলের হাতে বিশ্বকাপ ওঠার পর বদলে গেল ভারতীয় ক্রিকেটের ভাগ্য। দেশের ক্রিকেট প্রশাসকরা- এন কে পি সালভে, আই এস বিন্দ্রা আর জগমোহন ডালমিয়া তখন বুঝে ফেলেছিলেন, ইংল্যান্ডের একচেটিয়া আধিপত্যে আর ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নেই। সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা। ভাবলেন, এখন সময় এসেছে নিজের মাটি থেকে বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোর।

June 25, 1983: When 'Kapil's Devils' changed the image of Indian cricket -  Rediff.com

এই মঞ্চে হাত বাড়াল পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডও। দুই প্রতিবেশী দেশ। তারা একসঙ্গে এগিয়ে এল এক নতুন ইতিহাস লিখতে। সরকারিভাবে ভারত ও পাকিস্তান যৌথভাবে জিতে নিল ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার।

শারজাহর মরুভূমির মাঝে তখন তৈরি হয়েছে এক নতুন ক্রিকেট দুনিয়া। দু’দেশের খেলোয়াড়রা একসঙ্গে মাঠে নামছেন। চারদিক থেকে উড়ছে গ্ল্যামারের ঝলক। সেই সময়েই ক্রিকেট বদলে যেতে শুরু করল। সাদা পোশাক ছেড়ে খেলোয়াড়রা পরলেন রঙিন জার্সি। ম্যাচে বাজতে লাগল সঙ্গীত, গ্যালারিতে নেমে এল উৎসবের আবহ। এই নতুন রঙিন ক্রিকেটেই ভারত খুঁজে পেল নিজের নতুন পরিচয়। আত্মবিশ্বাস, মর্যাদা আর এক বিশেষ আলো। যে আলো আজও ভারতীয় ক্রিকেটকে উজ্জ্বল করে রাখে গোটা বিশ্বের চোখে।

ইতিহাসের পাতায় লর্ডসের সেই শতরান

আশির দশকটা যেন ছিল ভারতীয় ক্রিকেটের সোনালি অধ্যায়। ১৯৮৩ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর একে একে এল সাফল্যের ফুলঝুরি। ১৯৮৪-তে এশিয়া কাপ, ১৯৮৫-তে রথমেন্স কাপ, আর তারপর ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অফ ক্রিকেট। প্রতিটি জয়ে ভারতীয় দলের আত্মবিশ্বাস ছুঁয়ে ফেলল আকাশ।

June 25, 1983: When Kapil Dev's miracle men defeated West Indies to conquer  maiden World Cup glory - India Today

১৯৮৬ সালে ১৫ বছর পর ইংল্যান্ডে আবার টেস্ট সিরিজ জয়। সেই সফরে দিলীপ ভেংসরকার লর্ডসে করলেন টানা তৃতীয় শতরান। যেন মন্দিরে পুজো দিতে এসেছেন ব্যাট হাতে। আর সেই বছরই চেন্নাই টেস্টে ঘটল অবিশ্বাস্য এক ঘটনা। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচ শেষ হল টাইয়ে! ক্রিকেট ইতিহাসে যা ঘটেছিল মাত্র দ্বিতীয়বার।

তবে এই সোনালি সময়ের মধ্যেও অশান্তি ছিল। গাভাস্কার আর কপিল দেবের মধ্যে শুরু হয়েছিল নেতৃত্বের টানাপোড়েন, ইগোর সংঘাত। এমনকি একবার কপিলকে দল থেকেও বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু মাঠে তাঁদের কৃতিত্বের সামনে এসব বিতর্ক তুচ্ছ হয়ে যায়।

১৯৮৩ সালে গাভাস্কার ভেঙে ফেললেন ডন ব্র্যাডম্যানের ২৯টি সেঞ্চুরির রেকর্ড। ১৯৮৭-তে তিনি পৌঁছে গেলেন ১০,০০০ টেস্ট রানের জাদুকরী সংখ্যায়- প্রথম ব্যাটার হিসেবে। অন্যদিকে কপিল দেব তাঁর গতি আর আগুনে স্পেল দিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন বোথাম, ইমরান, হ্যাডলি, মার্শালদের। অবশেষে ১৯৯৪ সালে তিনিই হলেন বিশ্বের সর্বাধিক টেস্ট উইকেটশিকারী।

১৯৮৭ বিশ্বকাপ ছিল গাভাস্কারের শেষ অধ্যায়। একসময় যাঁকে ধীর ব্যাটিংয়ের জন্য সমালোচনা করা হত, সেই গাভাস্কারই এবার করলেন ভারতের দ্রুততম শতরান। কিন্তু ভাগ্যের পর্দা নামল সেমিফাইনালেই। ইংল্যান্ডের কাছে হেরে থেমে গেল ভারতের স্বপ্ন। স্টেডিয়াম তখন নিস্তব্ধ। গাভাস্কার বিদায় নিলেন, কপিল হারালেন অধিনায়কত্ব। এক যুগের গল্প যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল সময়ের আলো-ছায়ায়।

প্রজন্মের হাতে ইতিহাসের মশাল

তবু গল্প এখানেই শেষ নয়। সেই ১৯৮৭ সেমিফাইনালের মাঠে বলবয় হিসেবে ছিলেন এক ১৪ বছরের কোঁকড়ানো চুলের ছেলেটি—শচীন তেন্ডুলকর। যিনি গাভাস্কার-কপিলদের দেখে ক্রিকেটে প্রেমে পড়েছিলেন। এক বছরের মধ্যে তিনিই স্কুল ক্রিকেটে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়তে শুরু করেন। ১৬ বছর বয়সে করেন টেস্ট অভিষেক, আর তারপর শুরু হয় ভারতের ক্রিকেটের পরবর্তী অধ্যায়। যে মশাল গাভাস্কার আর কপিল জ্বালিয়েছিলেন, সেটাই শচীন ধরে রাখলেন দু’হাতে।

16-year-old Sachin Tendulkar

১৯৭০ থেকে ১৯৮০। এই দুই দশক যেন ভারতীয় ক্রিকেটের কৈশোর আর যৌবনের পথচলা। এই সময়েই ভারত শিখল, কীভাবে পরাজয়ের ধুলো মুছে মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়। চারজন স্পিন জাদুকর, দুই লিটল মাস্টার, আর এক ঝড়ো ফাস্ট বোলার। তাঁরা মিলে গড়েছিলেন এক রঙিন যুগের ভিত, যেখানে প্রতিটি ম্যাচ ছিল যেন এক নতুন স্বপ্নের শুরু।

যে মাঠে একদিন ভারতকে হালকা চোখে দেখা হত, সেই লর্ডসের মাটিতেই ১৯৮৩ সালে দেখা গেল ট্রফির আলো। যেন এক জাতির মুখে প্রথমবারের মতো ফুটল গর্বের হাসি।

আর আজও, যখন কোনও ক্রিকেটপ্রেমীর মুখে শুনতে পাই, "ক্রিকেট মানেই ভারত"। তখন গভীর অনুভূতির শিকড়টা যেন আমাদের নিয়ে যায় সেই সোনালী সময়ে। এ কেবলই একটা খেলার জয় ছিল না। এ ছিল একদল অদম্য মানুষের সাহসী পদক্ষেপ। এক জাতির বুকে লালন করা এক স্বপ্নের কঠিন লড়াই। আর এক দেশবাসীর অদম্যভাবে জেগে ওঠার অবিস্মরণীয় উপাখ্যান।

সেই গল্প আজও বেঁচে আছে বাইশ গজের প্রতিটি ঘাসে, প্রতিটি গর্জনে, প্রতিটি বলের স্পন্দনে আর ব্যাটের সুরে। যেন সময় থেমে গেলেও সেই বিশ্বাস এখনও দৌড়ে বেড়ায় মাঠ জুড়ে। এ কোনও অহংকার নয়। এ এক জাতির গর্ব, অটুট আত্মবিশ্বাস আর গৌরবময় উত্থানের সেই জীবন্ত ইতিহাস, যা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শেখায়—'স্বপ্ন দেখলে অসম্ভব কিছুই নয়...'


```