
গ্রাফিক্স: শুভ্র শর্ভিন
শেষ আপডেট: 16 April 2025 18:09
১৯২০ সালের ১ জুলাই। চিংড়িপোতা, অধুনা সুভাষগ্রামের হরিনাভি দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ অ্যাংলো সংস্কৃত উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগ দিলেন বছর ছাব্বিশের এক তরুণ শিক্ষক। স্বভাবে বিনয়ী, আদ্যন্ত অন্তর্মুখী। ক্লাস নেন। তারপর বাড়ি ফিরে যান। এক বছর আগে স্ত্রীকে হারিয়েছেন। দু:সহ বেদনার ভার ক্রমশ চেপে ধরছে। কিন্তু প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না।
এক বর্ষণমুখর সকালে বৈঠকখানার সামনে ঢাকা বারান্দায় বসেছিলেন তিনি। আর আনমনে ভাবছিলেন অতীতের কথা। স্মৃতিপটে ভেসে উঠছিল প্রয়াত স্ত্রীর হাসিমুখ।
এমন সময় বছর সতেরোর এক কিশোরকে হেঁটে যেতে দেখেন ওই শিক্ষক। হাতে বই। কোন বই? যদি পড়া যায়? ভাবামাত্র অচেনা ছেলেটিকে দাঁড়াতে বলেন।
‘তোমার বই? দিতে পারো কিছুদিনের জন্য?’
‘আজ্ঞে না। এটা লাইব্রেরি থেকে নেওয়া। তার জন্য দু'আনা চাঁদা দিতে হয়।’
‘আচ্ছা সে দেব'খন। তুমি এবার থেকে আমাকেও বই দিয়ে যেও।’
মাথা নেড়ে চলে গেল সেই কিশোর। যাওয়ার আগে জানাল নিজের নাম: যতীন্দ্রমোহন রায়। লোকে পাঁচুগোপাল বলে চেনে৷
চমক লাগল শিক্ষকের। যতীন্দ্রমোহনের সংক্ষিপ্ত রূপ কিংবা কারও আহ্লাদের ডাকনামও, আর যাই হোক, পাঁচুগোপাল হতে পারে না!
জোরাজুরিতে রহস্য ফাঁস করল যতীন্দ্রমোহন নিজে। আসলে সে স্বভাবকবি। ‘পাঁচুগোপাল’ ছদ্মনাম। নামের আড়াল নিলেও লুকিয়ে নয়, বুক চিতিয়ে কবিতা লেখে। সেই কবিতা ছাপাও হয়৷ বেরোয় সাময়িকপত্রে। নাম ‘বিশ্ব’। যতীন্দ্রনাথ ওরফে পাঁচুগোপাল নিজেই তার সম্পাদক৷ সর্বশেষ সংখ্যায় বেরিয়েছে সমাজসমস্যামূলক কবিতা ‘মানুষ’।
অজপাড়াগাঁয়ের এক কিশোর কবিকে আচমকা আবিষ্কার করে বিস্মিত হন নবাগত শিক্ষক। তারপর জমে ওঠে বন্ধুত্ব৷ বয়সের খুব একটা বাধা ছিল না। ফলে অক্লেশে বয়ে চলে কথালাপ। সাম্প্রতিক সাহিত্যের দোষগুণ থেকে পত্রিকা সম্পাদনার রীতিনীতি—আড্ডায়-তর্কে উঠে আসে বিবিধ বিষয়৷
পাঁচুগোপাল শুধু স্বতঃস্ফূর্ত কবিয়াল নয়, নিগূঢ় গ্রন্থকীটও বটে! লাইব্রেরি থেকে বই এনে দেয় নতুন বন্ধুকে। লোকে কী পড়ছে, কী পড়ছে না—সে নিয়েও অনুক্ষণ অবগত করে চলে। কলকাতার একটি প্রকাশনা সংস্থা থেকে রবীন্দ্রনাথের গ্রন্থাবলি প্রকাশিত হলেও সেভাবে ছাপ ফেলেনি, লোকে পড়ছে না। পাঁচুগোপাল গম্ভীর মুখে জানায়: এই বই নিতে লাইব্রেরিতে তেমন ভিড় নেই৷ লোকে ডিটেকটিভ উপন্যাসে হামলে পড়ছে৷ যা অবস্থা তাতে ‘ট্র্যাশ ট্র্যাশ’ গল্প-উপন্যাস না রাখলে আগামী দিনে লাইব্রেরি উঠে যাবে৷
এমন পরিস্থিতিতে পাঁচুগোপালের থেকে এক অদ্ভুত প্রস্তাব পান ওই শিক্ষক… দু'জন মিলে উপন্যাসের সিরিজ প্রকাশের প্রস্তাব। বিক্রি ভাল হবে। তাঁদের নামও স্মরণীয় রয়ে যাবে৷
এমন সনির্বন্ধ অনুরোধ শুধু আশ্চর্যজনক নয়, অপ্রত্যাশিতও বটে! তিনি শিক্ষক। বইয়ের কারবারি নন। তা ছাড়া লেখালিখির কোনও অভিজ্ঞতাও নেই। পাঠক তিনি। পড়েছেন বিস্তর। কিন্তু কলম ধরে বই লেখার দুর্মর আশা কোনওদিন জাগেনি। কলেজ ম্যাগাজিনে খানকতক খাপছাড়া প্রবন্ধ আর পড়শির বিয়েতে প্রীতি-উপহারের দরকচা কবিতা—সম্বল বলতে এটুকুই! তাতে গল্পের ‘গ’ নেই। কথাসাহিত্যিক হওয়াটা ছেলেখেলা নাকি?
কিন্তু পাঁচুগোপাল নাছোড়বান্দা। তার যুক্তি: বিএ পাস, তদুপরি শিক্ষক এমন কারও পক্ষে উপন্যাস লেখা বাঁ-হাতের কাজ৷ ‘না’ শুনতে নারাজ সে। জেদাজেদি চালিয়ে যায়। শেষে মুখের উপর কিছু না বলেই পাশ কাটিয়ে যান ওই শিক্ষক। যার মাশুল গোনেন দিনকতক বাদে। একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে নজরে আসে হাতে-লেখা বিজ্ঞপ্তি। দেয়ালে, গাছে, এমনকী স্কুলের নোটিস বোর্ডে পর্যন্ত সেঁটে দেওয়া হয়েছে পোস্টার। যেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা: ‘বাহির হইলো! বাহির হইলো!! বাহির হইলো!!! একটাকা মূল্যের গ্রন্থমালার প্রথম উপন্যাস চঞ্চলা!” এরপরই লেখক হিসেবে তাঁর নাম।
তরুণ শিক্ষকের বুঝতে বাকি থাকে না কাণ্ডটি কার। রাগে ফুঁসতে থাকেন তিনি। এদিকে স্কুলে পা রাখামাত্র ছেঁকে ধরে সহকর্মী থেকে ছাত্র সক্কলে। প্রত্যেকের একটাই প্রশ্ন: উপন্যাস লিখলেন অথচ জানালেন পর্যন্ত না? প্রত্যুত্তরে আমতা আমতা করতে দেখে ভেসে আসে দ্বিতীয় সওয়াল: সদ্যোজাত ‘চঞ্চলা'-কে কবে হাতে পাব?
কোনও জবাবে কেউই সেদিন সন্তুষ্ট হয়নি। তুষ্ট হননি শিক্ষক নিজেও। পাঁচুগোপাল বিনা অনুমতিতে এমন খবর, সেটাও কিনা ভুয়ো, রাষ্ট্র করে বেড়াল! তার জন্য তিনি যারপরনাই বিরক্ত হলেন। পাঁচুগোপালকে ডেকে যা নয় তাই বললেন। রাগ করে অবুঝ পাঁচু কথা পর্যন্ত বন্ধ করল। কিন্তু এতকিছুর ফাঁকতালে একটি গোপন ইচ্ছে ওই শিক্ষকের মনে অঙ্কুরিত হল: আচ্ছা, উপন্যাস না হোক, গল্প তো লিখে দেখতেই পারি! চেষ্টা করতে দোষ কী? তাহলে লোকজনকেও খাতা দেখিয়ে বোঝানো যাবে, আমি লিখে রেখেছিলাম, কিন্তু পাঁচু টাকার জোগাড় করতে পারেনি বলে গল্প ছাপা হয়নি!
এই ভেবে একদিন স্কুল থেকে ফিরে বসে পড়লেন খাতা-পেন নিয়ে। শুরুতে মনে করেছিলেন গল্পের প্লট ভাবাটা সহজ, লেখা কঠিন। পেন হাতে বসার পর বুঝলেন: ভুল; দুটোই সমান কঠিন। আকাশ-পাতাল মাথা খুঁড়েও কিচ্ছুটি বেরল না। লেখকের মন চটজলদি অভিব্যক্তির পথ খুঁজে গেল, কিছুই পেল না৷
অবশেষে তিন দিন বাদে মাথায় ঘাই মারল একটি ছবি। রোজকার চেনা ছবি। স্কুলে যান যে রাস্তা ধরে, সেই নিভৃত পথেই চোখে পড়ে এক গ্রাম্য বধূ। যে প্রতিদিন কলসি কাঁখে স্নান সেরে বাড়ি ফেরে। ঘটনা বলতে এটুকুই। দেখার অতিরিক্ত কথাবার্তা, আলাপ-পরিচয়… কোনওদিন কিছুটি হয়নি। কিন্তু তাতেই দানা বাঁধল গল্পের প্লট। পল্লীগ্রামের এক সম্পূর্ণ অপরিচিত বধূর বেদনাবিধুর জীবনকে কেন্দ্র করে লিখে ফেললেন গল্প। নাম দিলেন ‘পূজনীয়া’।
প্রথম রচনা। তাই দুরুদুরু বুকে কাছের বন্ধুদের পড়ে শোনালেন। কেউ শাবাশি দিলেন। কেউ বললেন, মন্দ নয়৷ পাঁচুগোপালও গুমর ভেঙে গল্প শুনে গেল। তারপর মোটামুটি সবার থেকে পিঠচাপড়ানি পেয়ে গল্পটি পাঠিয়ে দিলেন ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়৷
একজন অপরিচিত লেখক। তার উপর প্রথম গল্প। ‘কাঁচা লেখা’ দেগে পত্রপাঠ ফেরত পাঠাবেন সম্পাদক—একথা ভাবছেন যখন, ঠিক তখনই পত্রিকার দপ্তর থেকে একটি মোটা খাম এল স্কুলের ঠিকানায়। লেখকযশোপ্রার্থী শিক্ষক বুঝে যান এই চিঠি অমনোনয়নের চিঠি। অতএব মুখ বাঁচাতে চাইলে স্কুলে খামটি খোলা ঠিক হবে না।
কিন্তু বাড়ি ফিরে মোড়ক ছিঁড়তেই চক্ষু চড়কগাছ! ‘প্রবাসী’ থেকেই জবাবি পত্র এসেছে। কিন্তু গল্প বাতিলের নয়, গল্প সংশোধনের। সম্পাদকমশাইয়ের অনুরোধ: কিছু জায়গা খানিক অদলবদল করে পাঠাতে হবে। তাহলেই পরের সংখ্যায় তাঁরা লেখাটি ছাপতে পারবেন।
কালবিলম্ব না করে অতি দ্রুত কিছু পরিমার্জনের পর গল্পটি ফের পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন ওই শিক্ষক। তারপরই ভূমিষ্ঠ হয় প্রথম গল্প। শুধু নামটুকু বদলে দেন সম্পাদক। ‘পূজনীয়া’ ছেপে বেরোয় ‘উপেক্ষিতা’ শিরোনামে। আর চতুর্দিকে সাড়া পড়ে যায়। বছরের শ্রেষ্ঠ গল্প হিসেবেও সম্মানিত হয় ‘উপেক্ষিতা’। চিঠি লেখেন প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো গুণীজন। সম্পাদকের সনির্বদ্ধ অনুরোধ: পরের সংখ্যায় আবার লিখুন।
পাঁচুগোপাল দুষ্কর্ম করেছিল ঠিকই। কিন্তু তার গর্হিত অপরাধের জন্যই বাংলা সাহিত্য পেয়েছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ‘গল্প লেখার গল্পে’ নিজের লেখক হয়ে ওঠার এমমই সুরম্য বর্ণনা দিয়েছেন ‘পথের কবি’।
গল্প বেরোল, এক ছাপোষা শিক্ষক পায়ে পায়ে ‘বিভূতিভূষণ’ হয়ে উঠলেন… সে সবকিছু তো ইতিহাসেই লেখা আছে। কিন্তু পাঁচুগোপালের কী হল? বিশ-বাইশ বছর বাদে লেখা ১৯৪৪ সালের ওই ছোট্ট স্মৃতিচারণার (‘গল্প লেখার গল্প’) অন্তিম অনুচ্ছেদে তা খোলসা করেছেন বিভূতিভূষণ৷ লিখেছেন: ‘... পাঁচুগোপালের সঙ্গে মাঝে দেখা হয়েছিল। সে এখন চব্বিশ পরগনার কাছে কী একটা গ্রামের উচ্চ প্রাথমিক পাঠশালায় হেডমাস্টার। এখনও সে কবিতা লেখে।’