খসড়া দেখে আঁতকে উঠে কী বলেছিলেন তাঁর ‘বীরেনদা’, গল্প শুনিয়েছিলেন বেলাদেবী নিজেই।
.jpeg.webp)
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র ও বেলা দে।
শেষ আপডেট: 21 September 2025 11:43
যে মানুষটির কণ্ঠস্বরের টানে বাঙালি জেগে ওঠে মহালয়ার ভোরে, সেই স্বরটি কিন্তু তাঁর রোগভোগ থেকে পাওয়া! তা’ও কী, সেই রোগ তাঁর জীবনও কেড়ে নিতে পারত।
আবার, অন্য দিকে অমন অনুনাসিক, তীক্ষ্ণ গলার আওয়াজের কারণেই প্রথমে তিনি খারিজ হয়ে যান আকাশবাণী-র অডিশনে। আরও মজার কথাটি হল, পরে ডাক পান একটি রাক্ষসের চরিত্রে অভিনয় করতে।
বলার দরকার পড়ে না, তিনি বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। তাঁর গলা নিয়ে এই অদ্ভুতুড়ে গল্পটি আমায় প্রথম শোনান রেডিওর ‘মহিলামহল’ খ্যাত বেলা দে।
আমি তখন একটি খবরের কাগজে সাংবাদিকতা করি। বেলাদি ওই পত্রিকা গোষ্ঠীর দু’টি শাখায় রান্না নিয়ে কলাম লিখতেন। সেই সূত্রেই ২০০০-এর মাঝামাঝি থেকে শ্যামবাজারের বলরাম ঘোষ স্ট্রিটের কাছে ওঁর ফ্ল্যাটে আমার যাতায়াতের শুরু। ছোট প্যাডের ক’টি পাতায় নানান রেসিপি লিখে রাখতেন বেলাদি। আমি সংগ্রহ করতে যেতাম।
সেবার ফোনে বীরেন ভদ্রকে নিয়ে লিখতে বলার ক’দিন পর ওঁর কাছে গিয়ে দেখি, ভুল বুঝে ছোট প্যাডের সাইজের পাতায় তেইশ লাইনের ছোট্ট একটি লেখা লিখে রেখেছেন! শব্দসংখ্যা বড়জোর দু’শো। এতে যে আমাদের চাহিদা মিটবে না। এদিকে শিরে সংক্রান্তি।

এই সেই ছোট লেখা, যা দেখার পরে সাক্ষাৎকার নিতে হয়েছিল লেখককে।
সময়কাল ২০০৫। ভদ্রমশাইয়ের শতবর্ষ। তাঁকে নিয়ে বেলা দে স্মৃতিচারণা করবেন গোটা পাতা জুড়ে। ‘মহালয়া’ উপলক্ষে প্রকাশিতব্য একটি বিশেষ ক্রোড়পত্রে। ফলে দু’শো শব্দে কী হবে? আরও দু’হাজার চাই। কালক্ষেপ না করে তড়িঘড়ি তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে বসে গেলাম।
ঘণ্টা খানেকের গল্পে একে একে উঠে এল, তাঁর সঙ্গে তাঁর ‘বীরেনদা’র আলাপের যোগসূত্র, ‘মহিলা মহল’-এ তাঁর প্রথম স্ক্রিপ্ট বীরেনদারই আপত্তিতে বাতিল হয়ে যাওয়া থেকে ঠাকুমা যোগমায়ার কাছে বালক বুশীর (বীরেন ভদ্রের ডাক নাম) শেক্সপীয়র শোনা, এক প্রখ্যাত ‘জীবিত’ মানুষের আয়োজিত তাঁর নিজেরই শ্রাদ্ধবাসরে কিশোর বীরেনের প্রথম মন্ত্রপাঠ, বীরূপাক্ষর (বীরেন ভদ্রর ছদ্মনাম) দমফাটানো রসিক গদ্য, তাঁর রেডিও জীবন নিয়ে নানা কাহিনি, সে এক বর্ণময় কথামালা। সেই সাক্ষাৎকারের খণ্ডচিত্র ধরছি এই লেখায়।
বেলাদির বাপের বাড়ি ছিল শ্যামবাজার। পাঁচ মাথার মোড়ের কাছে। মোহনলাল স্ট্রিটে। বীরেন ভদ্র হাতিবাগানের রামধন মিত্র লেনে। বেলাদির বাবা ধীরেশচাঁদ ঘোষ আর বীরেন ভদ্রর বাবা কালীকৃষ্ণ ভদ্র ছিলেন বাল্যবন্ধু। ফলে বহু কাল ধরে এবাড়ি-ওবাড়ি যাতায়াত। ধীরেশচাঁদ কাঁচের ব্যবসায়ী। কিন্তু সাহিত্যে প্রবল ঝোঁক। সেই ঝোঁক থেকেই বাড়িতে তৈরি করেন ‘রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মিলনী’। ব্যবস্থাপনায় ছিলেন বেলাদির মামা চিকিৎসক কালীদাস নাগ, রবীন্দ্র-স্নেহধন্য অমল হোম এবং বীরেন্দ্রকৃষ্ণ।
প্রায় রোজই ওই বাড়িতে বেলাদির দাদাদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যেতেন বীরেন ভদ্র। বৈঠকখানায় তাসের আসর বসত। বেলাদি তখন নেহাতই ছোট। একে মেয়ে, তায় বড়দের আড্ডা, কাছে ঘেঁষার সাহস ছিল না। বীরেন ভদ্র তখনই বেতারের মানুষ। বেলাদির খুব শখ রেডিওয় গলা দেওয়ার। বাবা আমল দেননি। ‘বীরেনদার’ সঙ্গে স্বল্প আলাপে তাঁর শখের কথা বলেও লাভ হয়নি।
এর বহু কাল পর ’৪৫ সালে বিলেত থেকে ‘হোম সায়েন্স’ ডিপ্লোমা করে দেশে ফিরতে, এক প্রকার মামারই গরজে রেডিয়োর অফিস ১ নম্বর গাস্টিন প্লেসে পা রাখা বেলার। স্টেশন ডিরেক্টর তখন ভিক্টর পরাণজ্যোতি। বহু দিন বাদে কনট্র্যাক্ট ফর্ম এল। ‘মহিলা মহল’-এ ১০ মিনিটের কথিকা। অতুলপ্রসাদকে নিয়ে। পারিশ্রমিক ১৫ টাকা।

বীরেন্দ্রকৃষ্ণের স্নেহধন্যা বেলা।
‘মহিলা মহল’ তখন দেখেন রেখাদেবী। বেলাদি তাড়াহুড়ো করে স্ক্রিপ্ট লিখে তাঁর ‘বীরেনদা’কে দেখাতেই আঁতকে উঠলেন তিনি, ‘‘এ তো মহাভারত! বড় জোর চার পৃষ্ঠা লেখো। আর ভাষা হবে সহজ, সরল।’’ বেলাদি বলেছিলেন, রেডিওতে তাঁকে শেখানো বীরেন ভদ্রর প্রথম পাঠ এটিই। দিনটি ছিল ১ এপ্রিল, ১৯৪৫। এর পর থেকে কেবলই শিখিয়ে গিয়েছেন রেডিওর শেষ দিন অবধি।
শেখাতেন, কিন্তু একেবারেই গম্ভীর চালে নয়। রসিক ঢঙে। বেলাদি আমায় বলেছিলেন, ‘‘রসিক না হলে কখনও বীরূপাক্ষ-র রচনা লিখতে পারতেন! শুধু দাঁড়ি-কমা এদিক-ও দিক করে এমন সব মজার গদ্য লিখতেন বীরেনদা!’’ বলে একটা নমুনা দিয়েছিলেন।
স্ত্রী, প্রবাসে থাকা স্বামীকে চিঠি লিখছেন, ‘‘এবার পুজোয় আসিবে, না আসিলে দুঃখ পাইব।’’ ভুলবশত ‘কমা’টি পড়ল ‘না’-এর পরে। তাতে হয়ে গেল, এবার পুজোয় আসিবে না, আসিলে দুঃখ পাইব।’’ ব্যস, হুলুস্থুল কাণ্ড।
লিখতে জানতেন। বেতার নাটক বুঝতেন। গান করতেন। পিয়ানো বাজাতে পারতেন। তার সঙ্গে তাঁর জ্ঞানের ভাঁড়ারটি ছিল আস্ত মহাসাগর। যে কারণে বেতারের কত অনুষ্ঠান যে একা হাতে উতরে দিয়েছেন নির্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতে!
‘‘তার একটি ঘটনা তো ‘মিথ’ হয়ে গিয়েছে রেডিও-য়,’’ বলে তিরিশের দশকে রেডিও-কর্মী নলিনীকান্ত সরকারের বলা একটি ঘটনা পেড়েছিলেন বেলাদি।
তুমুল বৃষ্টি। শহরে টলটল করছে জল। রাস্তাঘাটে বেরোনোই মুশকিল। বাড়িতে বসে নলিনীকান্ত রেডিও খুলে শুনলেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণের গলা, ‘‘এবার একটু পিয়ানো শুনুন।’’ তার পর আবার একটু পরেই ঘোষণা, ‘‘এবার রবীন্দ্রসঙ্গীত।’’ দুই ক্ষেত্রেই ঘোষক শুধু নয়, বাজিয়ে এবং গাইয়ে ছিলেন বীরেন ভদ্রই!

সদা ব্যস্ত ভদ্র মশাই।
‘‘এমনি করে আমাকেও কত যে বাঁচিয়েছেন। এক বার যেমন, ‘মহিলা মহল’-এ সাহিত্যসভা। লাইভ ব্রডকাস্ট। রম্যরচনা পড়ার কথা এক জনের। অনুষ্ঠান শুরুর মিনিট পনেরো আগে জানলাম, তিনি আসবেন না। মাথায় বজ্রাঘাত। বীরেনদাকে বলতে, কিছুক্ষণ বাদে দেখি, ‘বীরূপাক্ষের ঝঞ্ঝাট’ (বীরেন ভদ্রের রসরচনা) নিয়ে স্টুডিওয় ঢুকছেন। পড়লেন। পর দিন চিঠির বন্যা। সবার এক কথা, আবার কবে শুনব এমন পাঠ,’’ বলেছিলেন বেলাদি।
কাজ-পাগল ‘বীরেনদা’ তাঁকে বারবার বিস্ময়ের পর্বতে তুলে দিয়েছেন! কী না করেছেন বেতারের জন্য! কত যে নতুন ভাবনায় সঙ্গ দিয়েছেন! সেখানে পঙ্কজ কুমার মল্লিক, বাণীকুমার এবং বীরেনদা, এই তিন কান্ডারির ঐতিহাসিক সম্প্রচার ‘মহালয়া’র ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ তো আছেই, তার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের শেষযাত্রা, পুরীতে রথযাত্রা, গঙ্গার ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের ধারাবিবরণী (এখানে আবার সঙ্গী হন বেলাদি এবং জয়ন্ত চৌধুরী) থেকে খেলার জগৎ নিয়ে বিন্দুমাত্র উৎসাহ না থাকা এক জন মানুষ শুধু বেতারের প্রয়োজনে ফুটবলের ধারাভাষ্য চালু করেছেন।

মহিষাসুরমর্দিনী-র তিন স্তম্ভ। (বাঁ দিক থেকে) বীরেন ভদ্র, বাণীকুমার, পঙ্কজ মল্লিক।
আরও একটি ঘটনা দেখুন। ১৯২৯ সালে ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকা যখন চালু হয়, তখন বীরেন ভদ্র শহরের চেনামুখ। পত্রিকাটিকে জনপ্রিয় করতে চাদর মুড়িয়ে জিপিও কিংবা মেট্রো সিনেমার সামনে বেচতে অবধি নেমেছেন। নাটকের জন্য ‘ঝিঁঝিঁর ডাক’, ‘ব্যাঙের ডাক’ চাই। বৃষ্টি মাথায় করে সাপখোপের ভয় শিকেয় তুলে টেপ-রেকর্ডার হাতে ইডেন গার্ডেনের ঝোপে গিয়ে রেকর্ড করেছেন। এ সবও শোনা সে দিন বেলাদির কাছেই।
সাদা ধুতি, পাঞ্জাবি, চাদর, পায়ে একটা চপ্পল। সঙ্গে নস্যির ডিবে, আর বুক পকেটে ট্রামের মান্থলি টিকিট। একেবারে নিপাট, অনাড়ম্বর মানুষটির জীবনের আঠেরো আনাই ছিল বেতারে বন্দি।

মহালয়ার অনুষ্ঠান 'মহিষাসুরমর্দিনী' সম্প্রচারের পর বেতার কেন্দ্রের ছাদে শিল্পীবৃন্দ। পঙ্কজ মল্লিকের পাশে মধ্যিখানে বীরেন ভদ্র।
বেলাদি বলেছিলেন, ‘‘বীরেনদার পরিচালনায় নাটকে আমিও অভিনয় করেছি। ‘পথের দাবী’-তে। সেখানেও বীরেনদা অতুলনীয়। যে নাটক মঞ্চে সফল হয়নি, তাকেও বেতারে জমিয়ে দিয়েছেন তিনি, এমনও হয়েছে। অহীন্দ্র চৌধুরীর পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের ‘গৃহপ্রবেশ’ যেমন। মঞ্চে যতীন হতেন অহীন্দ্র চৌধুরী, ভাল চলেনি। বেতারে সেই রোলে বীরেনদাকে ধন্য ধন্য করেছে শ্রোতা।’’
বেতার নাটকে বীরেন ভদ্রের আরও একটি বিস্ময়কর ক্ষমতার কথা শুনিয়েছিলেন বেলাদি। নাটক চলছে। হঠাৎ যদি বুঝতেন, সময়ের মধ্যে শেষ হবে না, ওই অবস্থাতেই স্ক্রিপ্ট ‘এডিট করে দিতে পারতেন তিনি!
তার সঙ্গে ওই সম্মোহনী গলা। যে গলার স্বর তাঁকে প্রথমে বিপাকে ফেলেছিল, সে স্বরই কালক্রমে তাঁকে শ্রোতার হৃদয়ে আসন করে দিল! অনেকেই ভাবেন, তাঁর অনুনাসিক স্বর বুঝি’বা নস্যি-নেশার ফল। তা নয়। গোড়াতেই বলেছি, বেলাদির কাছে শুনেছি, ওই কণ্ঠস্বর তিনি প্রাপ্ত হন রোগভোগের ফলে! খুব ছোটবেলায় ডিপথেরিয়া হয় বুশীর। বাবা তাঁকে নিয়ে যান আলিপুর অঞ্চলের ইংরেজ চিকিৎসক ডেনাভাইডের কাছে। উনি পরীক্ষা করে বলেন, ‘‘চিকিৎসা করলে হয়তো প্রাণে বেঁচে যাবে, কিন্তু গলার স্বর নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’’ চিকিৎসা শুরু হল। প্রাণে বাঁচল বুশী, কিন্তু তার স্বর গেল বদলে।
বেলাদি বলেছিলেন, ‘‘ছোটবেলায় যেমন প্রাণসংশয় হয় বীরেনদার, তেমন ছোট বয়স থেকেই বোঝা যায়, এ ছেলে কিন্তু সহজ মানুষ নয়!’’
এ কথা বলে বেশ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, ‘‘বীরেনদার স্মৃতিশক্তি ছিল প্রবল। কৈশোরে মাত্র তিন দিনে মাইকেলের ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্যটি কণ্ঠস্থ করে প্রতিযোগিতায় প্রথম হন।’’
দ্বিতীয় ঘটনাটি হল, ‘‘বীরেনদার বাবার বন্ধু ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতি। তিনি আবার বিদ্যাসাগরের কী রকম এক আত্মীয় ছিলেন। তাঁর স্মরণসভায় মাত্র ষোলো বছরের বীরেন্দ্রকৃষ্ণ একটি গান করেন, নিজেই সুর করে। গানটি লিখেছিলেন বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।’’
তৃতীয় ঘটনাটিও বেলাদির কাছে শোনা। ছোট থেকেই সংস্কৃত উচ্চারণ করতে ভাল লাগত বীরেন্দ্রকৃষ্ণের। সেই ব্যাপারটি লক্ষ করে পিতৃবন্ধু সুরেশচন্দ্রর স্ত্রী তাঁর শ্রাদ্ধের মন্ত্রপাঠ করিয়েছিলেন কিশোর বীরেনকে দিয়ে! অগ্রজরাও তাঁর সংস্কৃত-প্রীতি কী চোখে দেখতেন, এ ঘটনা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। তবে জীবিত অবস্থায় নিজের শ্রাদ্ধের আয়োজন তখন অনেকেই করতেন, ফলে সেখানে কোনও বিস্ময় নেই। ঘটনাটির অন্য একটি দিকও আছে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ কায়স্থ হয়ে ব্রাহ্মণের কাজ করছেন দেখেও কেউ কোনও আপত্তি তোলেননি কিন্তু। এ নিয়ে নিজের লেখাতেও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ নিজেই।
বেলাদি এর সঙ্গে আরও একটি কথা বলেছিলেন, ‘‘বীরেনদার অগাধ পাণ্ডিত্য এবং তাঁর আকাশছোঁয়া প্রতিভার জমিটা কিন্তু পারিবারিক সূত্রেই পাওয়া।’’
বাবা কালীকৃষ্ণ ষোলোটি ভাষা জানতেন। আদালতে দোভাষীর চাকরি করতেন। মা সরলাদেবী ছিলেন সেকালের বিখ্যাত উকিল কালীচরণ ঘোষের মেজ মেয়ে। দাদু গিরিশচন্দ্র ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ঠাকুমা যোগমায়া তখনকার দিনের বিখ্যাত গায়ক যদুনাথ ঘোষের কন্যা। অকাল বিধবা যোগমায়া তাঁর পাঁচ সন্তানকে মানুষ করতে খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে পঞ্জাবের নাভা এস্টেটের মহারানি ও রাজকুমারীর গৃহশিক্ষকের দেড়শো টাকার চাকরি নিয়ে বাংলা ছেড়ে সে-রাজ্যে চলে যান সপরিবার। ভদ্র পরিবারের রামধন মিত্র লেনের বাড়িটি তাঁরই সঞ্চয়ের টাকায় কেনা। যোগমায়া শেক্সপীয়রের নাটক শোনাতেন নাতি বুশীকে। নাতির সংস্কৃত পাঠও ঠাকুমার দান।
স্বভাবতই বেলাদি বলতে চাইছিলেন, তাঁর ‘বীরেনদা’র এই মহান হয়ে ওঠার পিছনে ভদ্র-পরিবারের মহিমা বড় ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু চরমতম দুঃখের হল, শেষ জীবনে কী দুর্দশায় না কাটালেন! বেলাদি বলেছিলেন, ‘‘হঠাৎ ওঁর জামাই মারা গেল! সে এক অসহনীয় শোক! তার সঙ্গে অর্থাভাব। চাকরি নেই। পেনশন নেই। বেতারে রামায়ণ পড়ে, ক’টা নাটক পরিচালনা করে, এপাড়া-ওপাড়া ‘সভাপতি’ হয়ে তো পেট চলে না! ক্রমে স্মৃতিই হারিয়ে ফেললেন বীরেনদা। সে আর এক বিপর্যয়!’’
৩ নভেম্বর, ১৯৯১। তাঁর ‘বীরেনদা’র চলে যাওয়ার খবর এল। গিয়েছিলেন বাড়ি। তখন দালানে শোয়ানো তাঁর নিষ্প্রাণ দেহ। প্রণাম জানিয়ে এক বুক শূ্ন্যতা নিয়ে ফিরে এসেছিলেন নিশ্চুপে।