যখন সমুদ্র জেগে উঠেছিল, বিশ্বের ইতিহাসে দশ ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের ফিরে দেখা।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 30 October 2025 17:58
তখন রাত ৯টা ১০টা হবে। সমুদ্র ঘুমিয়ে। নোনা জলে চাঁদের আলো পড়েছে। দূরে কোথাও মাছ ধরার নৌকোগুলোর হালকা আলো টিমটিম করছে। কিন্তু সেই শান্ত সমুদ্রের বুকের তলায় তখন জেগে উঠছিল এক অজানা ক্রোধ। জলের গভীরে, যেখানে মানুষের চোখ পৌঁছোয় না, সেখানে নড়ে উঠেছিল এক দানবের নিঃশ্বাস। তারপর ধীরে ধীরে ঢেউগুলো উঁচু হতে থাকল, তেতে উঠল সমুদ্র। আকাশ কালো হতে শুরু করল, বাতাস ভারী হয়ে গেল।
সমুদ্রের বুক থেকে উঠে এল এক দানবীয় ঘূর্ণি। নাম ‘মান্থা’। অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ার মুহূর্তে যেন আকাশ ও মাটি এক হয়ে গিয়েছিল। ঘণ্টায় প্রায় ১৪০ কিলোমিটার বেগে বইছিল হাওয়া, সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি। ঢেউগুলো এমন উচ্চতায় উঠছিল যেন সমুদ্র নিজেই গর্জে উঠেছে রোষে। চোখের পলকে ভেঙে পড়ল গাছ, উড়ে গেল টিনের চাল, অন্ধকারে ডুবে গেল একাধিক গ্রাম।
রাত্রি, ঝড় আর মৃত্যু...
মানুষ দৌড়োচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে, বিদ্যুতের তারে আগুনের স্ফুলিঙ্গ, বাতাসে কেবল আতঙ্ক আর বৃষ্টির ঘ্রাণ। প্রকৃতি যেন হঠাৎ করেই মনে করিয়ে দিল সভ্যতার সব উন্নতি, কংক্রিটের সব প্রাচীর, সবই ক্ষণস্থায়ী। এক নিমেষেই সে সবকিছু ধ্বংস করে দিতে পারে। ঘূর্ণিঝড় ‘মান্থা’ এখন হয়তো শক্তি হারিয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত, কিন্তু তার রেখে যাওয়া চিহ্ন অমোচনীয়। উপকূলের ভাঙা ঘর, কাদা-মাখা মাঠ আর আশ্রয়হীন মানুষের চোখে এখনও সেই ভয় ছাপিয়ে আছে।
এই এক ঝটকায় মনে পড়ে যায় ইতিহাসের অন্য ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়গুলোর কথা। যারা একদিন ঠিক এমনভাবেই তাণ্ডব চালিয়ে গিয়েছিল বিশ্বজুড়ে। ভোলা, নার্গিস, কত্রিনা, আইদাই, ইয়োলান্ডা এক এক করে যেন তারা ফিরে আসে স্মৃতিতে, মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির আসল শক্তি কতটা ভয়ানক হতে পারে। চলুন ফিরে দেখা যাক, বিশ্বের ইতিহাসে সেই দশ ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়, যাদের দাপটে থমকে গিয়েছিল সময়ের ঘড়ি।

১. ভোলা সাইক্লোন (১৯৭০, বাংলাদেশ)
ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ের নামেই শুরু হোক তালিকা। তখনও দেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তান। বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা ভোলা সাইক্লোন তাণ্ডব চালায় উপকূল জুড়ে। ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি বেগে বইতে থাকা হাওয়ায় উড়ে গিয়েছিল গাছ, ঘর। মানুষও ছিল সেই তাকিলায়। প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান। এক রাতে পুরো মানচিত্র বদলে দিয়েছিল এই ঘূর্ণিঝড়।

২. ১৯২২ সালের চিনের টাইফুন
প্রায় এক শতাব্দী আগের ঘটনা। ১৯২২ সালে চিনের উপকূলে আছড়ে পড়া টাইফুনে ধ্বংস হয়েছিল অসংখ্য গ্রাম ও জাহাজ। বলা হয়, এটি ছিল চিনের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সামুদ্রিক বিপর্যয়গুলির একটি।
৩. ফ্লোরিডার হারিকেন (১৯৩৫)
আমেরিকার ইতিহাসে ‘লেবার ডে হারিকেন’ নামে পরিচিত। ঘণ্টায় ৩২০ কিমি বেগে বইতে থাকা ঝড়ে ফ্লোরিডার উপকূল প্রায় মুছে গিয়েছিল। বেঁচে থাকা লোকজনের কথায়, “এমন শব্দ জীবনে শুনিনি।”

৪. ১৯৪২ সালের বঙ্গোপসাগর সাইক্লোন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, যখন মানুষ যুদ্ধের ভয়েই ক্লান্ত, তখনই বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসে এক দানবীয় ঝড়। বাংলার উপকূলে আছড়ে পড়ে সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়। প্রাণহানি, খিদের তাড়না, রোগ সব মিলিয়ে সে সময় যেন এক বিভীষিকার সময়কাল।

৫. ১৯৮৭ সালের টর্নেডো আউটব্রেক (আমেরিকা-কানাডা)
অল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ডজনখানেক টর্নেডো ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ এলাকা। বিদ্যুৎ নেই, জল নেই, রাস্তা নেই। কেবল ধ্বংসস্তূপ। প্রকৃতির এক জটিল প্রদর্শনী যেন।

৬. মিচ (১৯৯৮, মধ্য আমেরিকা)
‘মিচ’ নামটি মধ্য আমেরিকার লোকজন এখনও ভুলতে পারেননি। প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড় ভেঙে পড়ে গ্রামগুলো চাপা পড়ে গিয়েছিল। হন্ডুরাস ও নিকারাগুয়ায় মৃত্যু হয়েছিল ১১,০০০ মানুষের। এই ঘূর্ণিঝড় যেন প্রকৃতির বদলা হয়ে নেমে এসেছিল।

৭. আইদাই (২০১৯, আফ্রিকা)
আফ্রিকার একাধিক দেশ মোজাম্বিক, জিম্বাবুয়ে, মালাউই জুড়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল ঘূর্ণিঝড় আইদাই। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ভেসে গিয়েছিল শহর, ক্ষেতে ধান। জীবনের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে গিয়েছিল। এটি আফ্রিকার আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক ঝড়।

৮. ইয়োলান্ডা বা হাইয়ান (২০১৩, ফিলিপিন্স)
স্থানীয়রা বলত ‘ইয়োলান্ডা’। সমুদ্র থেকে উঠে এসে যেন পুরো দেশটিকে গ্রাস করে নিয়েছিল এই টাইফুন। ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল ২৫ ফুট পর্যন্ত। হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন, মৃতের সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি। এখনও ফিলিপিন্সে ‘ইয়োলান্ডা’ মানেই ভয় আর বেদনার আরেক নাম।

৯. নার্গিস (২০০৮, মায়ানমার)
ইরাবতী ডেল্টা যেন হয়ে উঠেছিল মৃত্যুফাঁদ। নার্গিস আছড়ে পড়ার পর জল ঢুকে গিয়েছিল গ্রাম-শহর-চাষের জমিতে। গাছের মাথায় ঝুলে ছিল ঘরবাড়ির কাঠামো। সরকারি হিসেবেই মৃত্যু হয়েছিল ১,৩০,০০০-র বেশি মানুষের। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসে এটি অন্যতম ভয়াবহ দুর্যোগ।

১০. কত্রিনা (২০০৫, আমেরিকা)
একটি দেশের বুকের ওপর দিয়ে কেটে যাওয়া দাগ। ‘কত্রিনা’ যেন নিউ অরলিন্সকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। শহরের রাস্তাগুলি জলমগ্ন, মানুষ আশ্রয়হীন। কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি, অসংখ্য প্রাণহানি। আজও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি এক অমোঘ স্মৃতি।
প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়, প্রতিটি বাতাসের ঝাপটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সভ্যতা যতই বড় হোক, প্রকৃতির সামনে আমরা এখনও তুচ্ছ। আজকের ‘মান্থা’ হয়তো সেই অতীতের দানবদের তুলনায় কিছুটা দুর্বল, কিন্তু প্রকৃতির বার্তা একই- “আমি আছি, আমাকে শ্রদ্ধা করো...”