কেয়া শেঠ
ভারতীয় নারীর ঐতিহ্যের সঙ্গে, আভিজাত্যের সঙ্গে, সৌন্দর্যের সঙ্গে পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বেনারসির গল্প। ইতিহাস থেকে সাহিত্য, পুরাণ-কথা থেকে মা-ঠাকুমার মুখে শোনা রূপকথা-- বেনারসির উল্লেখ পাবেন সর্বত্রই।
রূপকথার দেশের সেই যে রানি, যে বায়না করেছিল আকাশের মতো নীল আর বাতাসের মতো হালকা শাড়ির, যার সারা গায়ে থাকবে সোনালি ফুল আর পাতার কারুকাজ, কী মনে হয়, কী নাম সে শাড়ির! রাজা তার আদরের সুয়োরানির জন্য সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে অনেক খুঁজে নিয়ে এসেছিল যে শাড়ি, হালকা আকাশি রঙের শিফন বেনারসিই নয় কী সেটা! পাশাপাশি আমাদের বাঙালির লোকায়ত পুরাণকথার প্রসঙ্গই ধরুন না! "নীল শাড়ি নিঙাড়ি নিঙাড়ি" রাধা চলেছেন কুঞ্জবনে। কানুর সঙ্গে গোপন অভিসারে। সারা শরীরে সোনালি তারার কারুকাজে ভরা রাত্তিরের মতো ঘন নীল রঙা বেনারসি ছাড়া এসময় তাঁকে মানায় বুঝি!
'জীবনস্মৃতি'র পাতায় পাতায় ঠাকুরবাড়িত অন্দরমহলের যে বর্ণনা সেখানেও তো হিরের কণ্ঠা, সোনার নূপুর আর রুপোর মলের পাশাপাশি বারবার উঠে এসেছে ভারী কাজের বেনারসির প্রসঙ্গ। সেই কবে থেকেই যেন বাঙালির পালাপার্বণের সঙ্গে, দেখনদারির সঙ্গে, বিয়ে বা সাধভক্ষণের মতো অনুষ্ঠানের সঙ্গে একসূত্রে জড়িয়ে গেছে বেনারসির নাম।
রাজপ্রাসাদ হোক, বা আধুনিকার সাজঘর
এককালে বেনারসি ছিল রাজারাজরাদের পোশাক। মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ নাগাল পেতেন না সে সবের। শাড়ি তো নয় যেন এক একটা ক্যানভাস। যেমন সূক্ষ্ম তার বুনন, তেমনই বাহারি রঙ। মহার্ঘ রেশমের সুতোয় বোনা জমির উপরে দিনের পর দিন ধরে অক্লান্ত ধৈর্য নিয়ে শিল্পীরা বুনে তুলতেন সোনালি বা রুপোলি জরির নকশা। জালের মতো ফুল-লতা-পাতায় ভরে উঠত শাড়ির জমি। এক একটা শাড়ির পিছনে লুকিয়ে ছিল নাম না জানা কত কত শিল্পীর রূপদক্ষ চোখ-- আজ ভাবলে অবাক লাগে!
আমাদের প্রতিষ্ঠানেও আমরা চেষ্টা করেছি যাতে এক একটা বেনারসি শাড়ি হয়ে ওঠে শিল্পীর হাতে বোনা এক একটা ক্যানভাস। সোনালি-রুপোলি জরির বুনোটে সত্যিই যার গায়ে সুখ-দুঃখের গল্প লেখা হয়। বেনারসি নিয়ে এরকমই কিছু এক্সক্লুসিভ কাজ করেছি আমরা। বেনারসের মাঝগঙ্গায় দাঁড়িয়ে পুরো শহরটাকে দূর থেকে যেমন দেখায়, হুবহু সে ছবিই ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল বেনারসি শাড়ির ক্যানভাসে। দুধারের মন্দির মসজিদ, ঘাটে ঘাটে মেলে ধরা ছাতা, সিঁড়ি, জলের তরঙ্গ, ভাসমান নৌকা-- সব ছবির মতো ফুটে উঠেছিল শাড়ির বুকে। ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়া সেই শাড়ি নিয়ে আমরা এগজিবিশনও করেছি গতবছর। অনেক মানুষ এসেছেন, দেখে গেছেন, আমাদের সেই এক্সক্লুসিভ কালেকশন।
আসলে আমরা বিশ্বাস করি,বেনারসি শাড়ি শুধু দুএকবার পরে আলমারিতে তুলে রাখার জিনিস নয়। আমাদের পুরাতনি শিল্পধারার একটা অংশ এই 'বয়ন শিল্প', এই সূক্ষ্ম কারুকাজ। আর তাই আমাদের প্রতিটি বেনারসিই নিঃসন্দেহে এক একটি 'ওয়ার্ক অফ আর্ট'।

জরির কনট্রাস্ট কাজের কথা যখন উঠলই তখন বলতেই হয় আমাদের তৈরি আধুনিক মানের 'থ্রি ডি বেনারসি'র কথা। এরকম বেনারসির গায়ে একাধিক রঙে আমরা ফুটিয়ে তুলেছি ত্রিমাত্রিক ছবির আদলে একের পর এক জিওমেট্রিক শেপ। সনাতনি বেনারসির বাইরে যারা একটু অন্যরকম নতুনের খোঁজ করেন, বিশেষত তাঁদের জন্যই আমাদের এই অভিনব সম্ভার। কনট্রাস্ট ব্লাউজের সঙ্গে এই বিশেষ ধরণের রেট্রো শাড়ি শুধুমাত্র আমাদের প্রতিষ্ঠানেই পাবেন আপনারা।
স্বর্ণবস্ত্র- পুরাণ থেকে ইতিহাস
বেনারসির ইতিহাস যে কত প্রাচীন তার নিদর্শন ছড়িয়ে আছে আমাদের দেশীয় পুরাণ লোককথার নানা প্রান্তে। জানেন কি, বাল্মীকি রামায়ণে সোনার ব্রোকেডের উল্লেখ আছে! লঙ্কাপতি রাবণের পোশাক না কি বোনা হত নিখাদ সোনার সুতোয়!উন্নতমানের সিল্কের উপরে দামি ধাতুর কারুকাজ করা সেই পোশাকের নাম ছিল 'স্বর্ণবস্ত্র'। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, সে যুগের স্বর্ণবস্ত্রই যুগের নিয়মে চেহারা পালটে আজকের বেনারসি।
আবার যদি বৌদ্ধ ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব বৌদ্ধযুগেও এমন পোশাকের উল্লেখ রয়েছে। শোনা যায়, নির্বাণের সময় গৌতম বুদ্ধের নশ্বর দেহ যে রেশম কাপড়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল খুব দামি ব্রোকেড জাতীয় কিছু। পালিভাষায় লেখা 'ত্রিপিটক'এও তখনকার রেশম বস্ত্রের উল্লেখ রয়েছে। গাঢ় হলুদ, লাল, নীল রঙের ফেব্রিক। নরম, উজ্জ্বল, নানা কারুকাজে মোড়া। চোখে দেখিনি বটে, তবে কিছুটা তথ্য আর কিছুটা কল্পনার উপর নির্ভর করে আমরা রিক্রিয়েট করেছি সেই বৌদ্ধ আমলের ব্রোকেডের কাজ। তাঁতিদের দিয়ে আমাদের নতুন বেনারসির গায়ে বুনে তোলা হচ্ছে সেই প্রাচীন ব্রোকেড। এই কাজ করার জন্য আলাদা প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে তাঁতিদের। এগুলো এক্সক্লুসিভলি তৈরি করা হয় আমাদের প্রতিষ্ঠানেই৷ যারা ইতিহাস আর শাড়ি, উভয় নিয়ে প্যাশনেট, তাদের ওয়ার্ডরোবে এমন শাড়ি সমাদর পাবে বলেই আমার বিশ্বাস।
বৈদিক যুগ বা মোগল রাজদরবার
'বেনারসি' নামটা থেকেই বোঝা যায় বেনারস বা বারাণসীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই শাড়ি। বেনারস বিখ্যাত তার সিল্ক আর ব্রোকেডের জন্য। এই খ্যাতি আরও বাড়ে মুঘল আমলে। শোনা যায়, বেনারসে প্রথম শাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপিত হয়েছিল সম্রাট হুমায়ুনের আমলে। সোনা আর রুপোর সুতোয় বোনা হত সেইসব শাড়ি। বসানো হত ঠাসা কাজের জরি পাড়।শোনা যায়, সম্রাট আকবরের জন্য প্রতি বছর রেশম আর মসলিনের তৈরি একহাজার পোশাক তৈরি করা হত। পরে তার দাসেদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হত সেসব মহার্ঘ পোশাক। সম্রাট তো বটেই, মুঘল আমলে বড় বড় মনসবদারদের বাড়িতেও নানারঙের রেশম, ব্রোকেড, জরির পাড় বসানো কাপড়ের ছড়াছড়ি ছিল।
মুঘল ঘরানার সেই পুরোনো ঐতিহ্যকে আবার নতুন করে তুলে এনেছি আমরা। মুঘল আমলের হারিয়ে যাওয়া জাফরির নকশা, দেওয়ালে আর্চের গঠন, মুঘল স্থাপত্য আর সুক্ষ্ম কারুরীতি আমরাই আবার ফিরিয়ে এনেছি এক্সক্লুসিভলি আমাদের বেনারসিতে। মোঘল স্কাল্পচার থেকে ওয়াল পেইন্টিং, হারিয়ে যেতে বসা সেসব নকশা সরাসরি তুলে এনেছি বেনারসির শরীরে। শিল্পীদের দিয়ে ডিজাইন বানিয়ে তাঁতিদের দিয়ে বুনিয়েছি সেসব। বাজারচলতি আর পাঁচটা বেনারসির থেকে একেবারে আলাদা ঘরানার এই শাড়ি। বিয়ের রাতে একটু বনেদি সাজ ভালবাসেন যারা, হাল্কা ওজন আর রাজকীয় কারুকাজের এই বেনারসি তাদের জন্য একেবারে পারফেক্ট।
সোনা-রুপোর সুতো
একথা ঠিকই যে, বেনারসি শাড়ির মূল ডিজাইনের ধারা সৃষ্টি হয়েছে মোগল ঘরানা থেকে। ফুল-লতা- আল্পনার মোটিফ, কলকা, পানপাতা, তারার মতো বুটি-- প্রাচীন বেনারসির কারুকাজে প্রাধান্য পেত এসবই। শাড়ির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ঠিক করা হত জরির রঙ কেমন হবে। জরি বলতে সেসময় সোনা বা রুপোর পাতলা সুতো, ছোটো ছোটো তবককেই বোঝাতো। এদেশের পুরোনো রাজপরিবারগুলোর সংগ্রহশালায় ঢুঁ মারলে এখনও চোখে পড়বে সোনার জরির কাজ করা মহামূল্যবান সেইসব শাড়ি।
পোশাকে ধাতুর ব্যবহার অবশ্য অনেক আগে থেকেই চলে আসছে এ দেশে। সোনার সুতোয় বুনে পোশাক তৈরির কথা বেদেও আছে। মহার্ঘ সুতোর সঙ্গে সোনা, রুপো বা দামি ধাতুর মিশেলে তৈরি হত সে সব পোশাক। দামি ধাতুর তৈরি ফ্যাব্রিক করা হত পোশাকে। আভিজাত্য বাড়াতে ক্ষেত্রবিশেষে বসানো হত মূল্যবান পাথরও। আর্য জাতির মধ্যে এই পোশাক হিরণ্য বস্ত্র নামে পরিচিত ছিল। সিল্ক আর তাঁতের মিশ্রণে না কি তৈরি হত সেই পোশাক! এখন অবশ্য এসব গল্পকথা।
আমার নিজের ইচ্ছে ছিল বিশেষ ভাবে সেই সোনারুপোর কাজ করা হিরণ্য শাড়িকে আবার ফিরিয়ে আনার৷ হন্যে হয়ে খুঁজেও তেমন একটাও ধাতুর সুতোয় বোনা শাড়ি সংগ্রহ করতে পারিনি আমি। শেষমেশ পিসি চন্দ্র-সহ দুএকটি স্বনামধন্য সোনার দোকানে কথা বলে নিজের উদ্যোগে তৈরি করালাম খুব সরু সোনার সুতো। কিন্তু শাড়িতে বসাতে গিয়ে দেখলাম সে সুতোও ভেঙে যাচ্ছে। আবার শুরু হল খোঁজ। বেনারসের অলিতে-গলিতে তল্লাশ চালিয়ে শেষে খোঁজ পাওয়া গেল এক তাঁতি পরিবারের। ওই একটিই পরিবার জানে সোনার সুতোর কাজ। তাঁদের সঙ্গে নিয়েই নতুন করে রিক্রিয়েট করার স্বপ্ন দেখছি বৈদিক যুগের হারিয়ে যাওয়া সেই হিরণ্য শাড়ি। একেবারে আজকের আধুনিকাদের জন্য আধুনিক মোটিভ দিয়েই আমাদের ওয়ার্কশপে তৈরি হচ্ছে সেইসব হিরণ্য বেনারসি।

কাঞ্জিভরম নয়, এ বছর সেজে উঠুন কাঞ্জিরোসিতে
দক্ষিণের কাঞ্জিভরম সিল্কের কথা কে না জানে! দক্ষিণী সিল্ক নিয়ে বাঙালির দুর্বলতাও কম নয়। সেই ঐতিহ্যবাহী কাঞ্জিভরমের সঙ্গে বেনারসিকে মিলিয়ে দেওয়ার আইডিয়াটা কিন্তু শুধুমাত্র আমাদের। দক্ষিণী সিল্কের উপর বেনারসির ফ্যাব্রিক; পাড়ে আর আঁচলে ঠাসবুনোট খানদানি কাজ অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে এই শাড়িকে।
বেনারসির পাড় আঁচলের কাজ অনেক নিখুঁত, আবার হালকা ওজনের কাঞ্জিভরমের শরীরে নকশার কাজ খোলে বেশি। আমি চেয়েছিলাম এই দুটো ব্যাপারকে মিলিয়ে দিতে। নিঃসন্দেহে এটি একটি অভিনব প্রয়াস। আর একমাত্র আমাদের প্রতিষ্ঠানেই পাবেন এই অসামান্য ফিউশন সিল্ক। কারুকাজে আকর্ষণীয়, ওজনে হাল্কা এই কাঞ্জিরোসি ইতিমধ্যেই বেশ সাড়া ফেলেছে ক্রেতাদের মধ্যে। দামও খুব একটা আকাশছোঁয়া নয়, মধ্যবিত্তের ধরাছোঁয়ার ভিতরেই। আমাদের নিজস্ব ওয়ার্কশপে তৈরি কনট্রাস্ট রঙ ও কাজের এই কাঞ্জিরোসি শাড়ি এর মধ্যেই ফ্যাশনিস্তাদের ওয়ার্ডরোবে জায়গা করে নিতে শুরু করেছে।

শুধু বিশেষ দিনের বিশেষ অনুষ্ঠানে নয়, বাঙালির প্রতিদিনের ফ্যাশনে বেনারসিকে জড়িয়ে দিতে চাই আমরা। শুভদিনে কনের সাজ হোক, বা রোজকার কর্মব্যস্ত জীবন - সবেতেই আছে সে। এমনকি আজকাল পুরুষদের ফ্যাশনেও জায়গা করে নিয়েছে বেনারসি। বেনারসি পাড়ের শেরওয়ানি, বেনারসি কাপড়ের পোশাক, হটপ্যান্ট -স্কার্ট থেকে শুরু করে যেকোনও ওয়েস্টার্ন, এমনকি লঁজারিও আমরা তৈরি করছি বেনারসি কাপড়ে। তৈরি হচ্ছে বেনারসি কাপড়ের নাগরাই জুতো, পুরুষ-নারীর গয়নাও। আর এখানেই আমাদের প্রতিষ্ঠানের অভিনবত্ব।
বেনারসি কার্নিভাল
এই সব রকম গল্প, পুরাণ ইতিহাসের সঙ্গে বাস্তবের মেলবন্ধন ঘটিয়ে, ৬০ রকমের প্রায় ৪০ হাজার বেনারসি শাড়ির কালেকশন নিয়ে শুরু হচ্ছে আমাদের কার্নিভাল। শীতকাল মানেই তো কার্নিভালের মরসুম। কত রকমের কার্নিভালই তো হয় এই সময়ে। আমরা কার্নিভাল সাজিয়েছি, বেনারসি দিয়ে। আগামী কাল অর্থাত ২০ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে আমাদের কার্নিভাল। চলবে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। হাজারো বেনারসি দেখতে আসতেই পারেন আমাদের 'কেয়া শেঠ এক্সক্লুসিভ', কালীঘাটে। শুধু চোখের দেখা নয়, বেনারসি শাড়ি নিয়ে হাজারো তথ্যও জানে পারবেন কার্নিভালে এসে। আর পছন্দ হলে তো সংগ্রহ করতেই পারবেন, যে কোনও ধরনের বেনারসি। তবে শুধু শাড়ি নয়, সম্ভারে রয়েছে বেনারসি দিয়ে তৈরি নানান ইন্দো-ওয়েস্টার্ন এবং ওয়েস্টার্ন পোশাকও। রয়েছে বেনারসি দিয়ে তৈরি ছেলেদের পোশাকও। বেনারসি নিয়ে এই অভিনব কার্নিভালে আপনাদের সকলকে স্বাগত।