সিনেমা মাঝে মাঝে এমন এক বিস্ময় সৃষ্টি করে, যা শুধু একটি চলচ্চিত্রের সাফল্যের গল্প হয়ে থাকে না—বরং হয়ে ওঠে এক উন্মাদনা।

শেষ আপডেট: 13 March 2026 12:45
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সিনেমা মাঝে মাঝে এমন এক বিস্ময় সৃষ্টি করে, যা শুধু একটি চলচ্চিত্রের সাফল্যের গল্প হয়ে থাকে না—বরং হয়ে ওঠে এক উন্মাদনা। সেই বিরল ঘটনাগুলোরই এক নাম ‘ধুরন্ধর’ Dhurandhar। মুক্তির মুহূর্ত থেকে ছবিটি যেন দর্শকের মনে এক অদ্ভুত আগুন জ্বেলে দিয়েছিল। হলভর্তি দর্শক, সোশ্যাল মিডিয়ায় উন্মাদনা, বক্স অফিসে অবিশ্বাস্য সংখ্যা—সব মিলিয়ে ছবিটি দ্রুতই এক ঐতিহাসিক সাফল্যে পরিণত হয়। আর এখন যখন তার সিক্যুয়েল ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ (Dhurandhar: The Revenge) মুক্তির অপেক্ষায়, তখন অনেকেই মনে করছেন এই ছবিই হয়তো ভারতীয় সিনেমার নতুন এক রেকর্ড গড়তে চলেছে।
এই উন্মাদনার শুরুটা অবশ্য একদিনে তৈরি হয়নি। পরিচালক আদিত্য ধর (Aditya Dhar) যখন এই গল্পটি তৈরি করেছিলেন, তখন তাঁর মাথায় ছিল এক আন্তর্জাতিক মানের গুপ্তচর থ্রিলার নির্মাণের স্বপ্ন। তাঁর আগের ছবি উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক (Uri: The Surgical Strike) তাকে জনপ্রিয়তা দিয়েছিল, কিন্তু ‘ধুরন্ধর’ যেন সেই সাফল্যকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। ছবির গল্পে ছিল আন্তর্জাতিক গুপ্তচরবৃত্তি, সীমান্ত রাজনীতি, অপরাধচক্রের অন্ধকার জগৎ এবং এক অসম্ভব বিপজ্জনক অভিযানের গল্প। বাস্তব রাজনীতির আবহে তৈরি এই থ্রিলার দর্শকদের কাছে শুধু উত্তেজনাপূর্ণই লাগেনি, বরং বিশ্বাসযোগ্যও মনে হয়েছে।
এই গল্পের কেন্দ্রে ছিলেন রণবীর সিং (Ranveer Singh)। তাঁর অভিনয় ক্যারিয়ার বরাবরই বৈচিত্র্যে ভরা। কখনও নিষ্ঠুর আলাউদ্দিন খিলজি, কখনও ঐতিহাসিক বাজিরাও, আবার কখনও মুম্বইয়ের র্যাপার মুরাদ। কিন্তু ‘ধুরন্ধর’-এ তাঁর চরিত্র ‘হামজা’ যেন অন্য এক মাত্রা তৈরি করেছিল। পর্দায় তিনি শুধু একজন অ্যাকশন হিরো ছিলেন না; তিনি ছিলেন দ্বন্দ্বে ভরা এক মানুষ, যার চোখে ছিল দায়িত্ব, প্রতিশোধ আর গভীর যন্ত্রণা। সেই আবেগই দর্শকদের ছবির ভেতরে টেনে নিয়েছিল।
তারপর আসে বক্স অফিসের বিস্ফোরণ। মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই ছবিটি ২০০ কোটির বেশি আয় করে ফেলে। খুব দ্রুতই ছবির বিশ্বব্যাপী আয় হাজার কোটির গণ্ডি পেরিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এটি হয়ে ওঠে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় হিন্দি ব্লকবাস্টার। আশ্চর্যের বিষয় হল, ছবির জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে কমেনি—বরং বেড়েছে। দ্বিতীয় সপ্তাহেও এর আয় ছিল অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী, যা প্রমাণ করে দর্শকদের মুখে মুখেই ছবির জনপ্রিয়তা ছড়িয়েছিল।
এই সাফল্যের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করেছিল। প্রথমত, ভারতীয় দর্শক দীর্ঘদিন পর এমন একটি বড় বাজেটের স্পাই থ্রিলার পেয়েছিলেন, যার অ্যাকশন, প্রযুক্তি এবং গল্প বলার ধরন আন্তর্জাতিক মানের। দ্বিতীয়ত, ছবিটি কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। উত্তর ভারত থেকে দক্ষিণ ভারত, এমনকি বিদেশের ভারতীয় দর্শকদের মধ্যেও এর সমান জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল। তৃতীয়ত, ছবির ভেতরের আবেগ—দেশপ্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, বন্ধুত্ব এবং আত্মত্যাগ—দর্শকদের হৃদয়ে গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল।
এই সব কারণেই ‘ধুরন্ধর’ শুধু একটি সফল সিনেমা নয়, এক ধরনের সিনেমাটিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। আর তাই যখন সিক্যুয়েলের ঘোষণা আসে, তখন প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই আকাশ ছুঁয়ে ফেলে।
ঠিক এখানেই শুরু হয় ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ নিয়ে নতুন উত্তেজনা। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ছবিটি আগেরটির চেয়েও বড় সাফল্য পেতে পারে। কারণগুলোও যথেষ্ট শক্তিশালী।
প্রথমত, আগের ছবির শেষটা এমন এক জায়গায় থেমেছিল, যেখানে গল্পের পরবর্তী অধ্যায় নিয়ে দর্শকদের কৌতূহল তুঙ্গে পৌঁছেছিল। এই অসমাপ্ত আবেগই সিক্যুয়েলের জন্য এক বিশাল আগ্রহ তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, নির্মাতারা আগের ছবির চেয়ে বড় বাজেট, বড় স্কেল এবং আরও আন্তর্জাতিক লোকেশন ব্যবহার করেছেন বলে জানা যাচ্ছে। ফলে ছবির ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা আরও বিস্ময়কর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তৃতীয়ত, ছবিটির মার্কেটিং কৌশল অত্যন্ত পরিকল্পিত। মুক্তির আগে প্রথম ছবিটিকে আবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, যাতে নতুন দর্শকরাও গল্পের জগতে ঢুকে পড়তে পারেন এবং পুরনো দর্শকেরা আবার সেই উত্তেজনা অনুভব করতে পারেন। এই কৌশল ইতিমধ্যেই ছবির চারপাশে নতুন করে উন্মাদনা তৈরি করেছে।
চতুর্থত, রণবীর সিং-এর জনপ্রিয়তা এখন আগের চেয়েও বেশি। দর্শকরা জানেন তিনি চরিত্রে ঢুকে পড়তে কতটা পরিশ্রম করেন। তাই তাঁর নতুন অবতার দেখার কৌতূহলও প্রচণ্ড।
সবশেষে রয়েছে দর্শকের আবেগ। যখন কোনও ছবির প্রথম অংশ এত গভীরভাবে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়, তখন তার সিক্যুয়েল শুধুই আরেকটি সিনেমা থাকে না—তা হয়ে ওঠে এক প্রত্যাশা, এক প্রতীক্ষা, এক আবেগের পুনর্মিলন।
হয়তো সেই কারণেই অনেকেই বিশ্বাস করেন, Dhurandhar: The Revenge শুধু একটি বড় হিট হবে না—এটি হয়তো ভারতীয় সিনেমার বক্স অফিস ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় লিখবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত সিনেমা কেবল সংখ্যার খেলা নয়। সিনেমা হলো অনুভূতির ভাষা। আর যখন কোনও গল্প দর্শকের হৃদয়ে এমন গভীর ছাপ রেখে যায়, তখন তার প্রত্যাবর্তনও হয়ে ওঠে উৎসবের মতো।
হয়তো খুব শিগগিরই অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে আলো জ্বলে উঠবে, পর্দা উজ্জ্বল হবে, আর আবারও প্রতিধ্বনিত হবে সেই নাম—‘ধুরন্ধর’।