রণবীর নয়, দর্শকদের মুখে শুধু অক্ষয়! ‘ধুরন্ধর’-এর রহস্যময় ভিলেনই কি তবে আসল হিরো?
.jpeg.webp)
ধুরন্ধর-এর আসল ‘ধুরন্ধর’
শেষ আপডেট: 17 December 2025 15:40
শেষ হইয়াও হইল না শেষ...
প্রচারের শোরগোল নেই, সোশ্যাল মিডিয়ার হইচই নেই, তবু অন্ধকার হলঘর থেকে বেরিয়ে আসার পর যে মুখটা মাথায় ঘুরতে থাকে, সেই মুখটাই আসল 'নায়ক'। 'ধুরন্ধর' মুক্তির আগে সবাই ভেবেছিল, এটা রণবীর সিংয়ের বড় স্পাই-অ্যাকশন ছবি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গেল, এই গল্পের সবচেয়ে গভীর ছাপ রেখে যাওয়া মানুষটি দুর্দান্ত এক অভিনেতা। নাম অক্ষয় খান্না। যিনি স্টারডমে মাতেন না, প্রচার চান না, অথচ পর্দায় এলেই সমস্ত আলো যেন নিজে থেকেই তাঁর দিকে ঘুরে যায়।
বিরাট বাজেটের স্পাই–অ্যাকশন, চোখ ধাঁধানো রণবীর সিংয়ের এন্ট্রি। সব মিলিয়ে ধুরন্ধর মুক্তির আগে যে ছবি ঘিরে প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু মুক্তির প্রায় দু’সপ্তাহ পর হিসেবটা বদলে গেছে। ছবির বক্স অফিস ইতিহাস লেখার মাঝেই দর্শকের আলোচনার কেন্দ্রে একটাই নাম, তা হল অক্ষয় খান্না। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেই, প্রচারের আলো থেকেও দূরে থাকেন যিনি, সেই মানুষটিই এখন ধুরন্ধর-এর আসল ‘ধুরন্ধর’।

ছবির 'আলো' অক্ষয়
আদিত্য ধর পরিচালিত ধুরন্ধর–এ লিয়ারি গ্যাংস্টার রহমান ডাকাতের চরিত্রে অক্ষয় খান্না যে প্রভাব ফেলেছেন, তা উপেক্ষা করা অসম্ভব। তাঁর স্টাইল, সংলাপ বলার ভঙ্গি, এমনকি এখন ভাইরাল হয়ে যাওয়া গান FA9LA–তে অনায়াস নাচ, সব মিলিয়ে ৫০ বছর বয়সি এই অভিনেতাই এখন মরশুমের ‘টোস্ট’। তাই ২০২৫ সালকে অক্ষয় খান্নার জন্য একেবারে ল্যান্ডমার্ক ইয়ার বলা মোটেই বাড়াবাড়ি নয়।
‘ছাবা’ থেকে ‘ধুরন্ধর’: অক্ষয়ের বছরের শুরু ও শেষ
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পিরিয়ড অ্যাকশন ড্রামা ছাবা দিয়ে শুরু করেছিলেন অক্ষয়। সেখানে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের শেষ জীবনের চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি ছিল মূলত একটি দীর্ঘ গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্স। তবু দাক্ষিণাত্য দখলের বাসনায় উন্মত্ত, কার্যত ‘হেঁটে চলা মৃত মানুষ’-এর মতো এক সম্রাটকে তাঁর ঠান্ডা দৃষ্টিতে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা দর্শকের মনে দাগ কেটে যায়।
ডিসেম্বরে এসে ধুরন্ধর যেন সব আলোচনা নিজের দখলে নিয়ে নেয়। কেউ এটাকে সাময়িক সোশ্যাল মিডিয়া হাইপ বলে উড়িয়ে দিতে পারেন, কিন্তু যারা একবার বা একাধিকবার ছবি দেখেছেন, তাঁদের উচ্ছ্বাসের গভীরতা অন্য কথা বলছে। অনলাইনে যা দেখা যাচ্ছে, সেটাই আসলে বাস্তব প্রতিক্রিয়া।
ছবিতে রহমান ডাকাতের সংলাপ “রহমান ডাকাত কি দিয়া মউত বড়ি কসাইনুমা হোতি হ্যায়”। এই কথাগুলোকে আপনি বিশ্বাস করেন। ধুরন্ধর দেখলে বোঝা যায়, এগুলো নিছক হুমকি নয়।

পর্দার 'রহমান ডাকাত' ভয়ংকর, কিন্তু মানবিকও
ধুরন্ধর ছবিতে রহমান ডাকাত করাচির লিয়ারি এলাকার এক প্রভাবশালী গ্যাংস্টার। ওই এলাকায় গ্যাংদের দাপটে পুলিশ কার্যত অসহায়। সেখানে রহমান ডাকাত ভয় আর সম্মানের মিশেলে সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করেন। বাস্তবের এক গ্যাংস্টারকে অবলম্বন করে তৈরি এই চরিত্রটি অনেকটা রবিন হুডের মতো, নিজের বালুচ সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে দাঁড়ান, দান-খয়রাত করেন, রাজনীতিতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন এবং ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সংঘাতে যেতে একটুও পিছপা হন না।
ছবির অন্যতম শক্তিশালী মুহূর্ত তাঁর এন্ট্রি সিন। হাসপাতালে এক অসহায় বাবা হিসেবে প্রবেশ, যার ছোট ছেলেকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। নিঃশব্দ সেই দৃশ্যেই অক্ষয়ের অভিনয়ের জোর বোঝা যায়।

গল্পটা রণবীরের, কিন্তু অক্ষয়ের 'দখলে'
রণবীর সিং অভিনীত নায়কের চরিত্র, প্রথমে হিন্দুকুশের দরিদ্র কিন্তু দৃঢ়চেতা ভবঘুরে হামজা আলি মাজারি, পরে প্রকাশ পায় তিনি ভারতীয় গোয়েন্দা জস্কিরত সিং রাঙ্গি। তাঁর যাত্রা শুরু হয় রহমান ডাকাতের গ্যাংয়ে ঢুকে পড়ার মাধ্যমে।
এখানে ব্যবহৃত হয়েছে আশির দশকের পরিচিত ফিল্ম ট্রোপ, এক বহিরাগত গ্যাংস্টারের মানবিকতা ও কমিউনিটি রাজনীতিকে হাতিয়ার করে বিশ্বাস অর্জন করে, উসকে দেয় এবং শেষে বৃহত্তর পরিকল্পনায় বিশ্বাসঘাতকতা করে। শত্রু দেশে আন্ডারকভার থাকা হামজাকে তাই আবেগে সংযত, স্থির থাকতে হয়। আর যেহেতু নায়কের যাত্রা সরাসরি জড়িয়ে রহমান ডাকাতের পরিণতির সঙ্গে, তথাকথিত ‘সাপোর্টিং কাস্ট’-এ থেকেও অক্ষয় খান্না পান যথেষ্ট স্ক্রিন টাইম ও একের পর এক দৃশ্যকেড়ে নেওয়া মুহূর্ত।
/filters:format(webp)/mayapuri/media/media_files/2025/12/10/akshaye-khanna-danced-like-his-father-vinod-khanna-in-fa9la-stole-the-show-at-dhurandhar-event-2025-12-10-17-56-25.webp)
'FA9LA'-এ হঠাৎ আসা, মন জয় করা
‘FA9LA’ গানটি বাহরাইনি র্যাপার ফ্লিপারাচির, যার সুরে রয়েছে আরবি প্রভাব। ধুরন্ধর ছবিতে রহমান ডাকাতকে ‘শের-এ-বালুচ’ হিসেবে তুলে ধরার সময় এই গানটি বাজে। আগেই ছবির সব গান প্রকাশ পেয়ে যাওয়ায়, হঠাৎ এই গানটির ব্যবহার দর্শকদের কাছে একেবারে চমক হয়ে আসে।
অল-ব্ল্যাক পোশাক, সানগ্লাস পরে এক ডেবোনেয়ার রহমান ডাকাতের ঢোকা, অলস অথচ তালময় হাঁটা সব মিলিয়ে দর্শক দেখলেন এমন কিছু, যার বিট নতুন না হলেও প্যাকেজিং একেবারে টাটকা। আর যখন সেই গ্যাংস্টার হঠাৎ বালুচ নাচে মেতে ওঠেন, ঠোঁটে চওড়া হাসি নিয়ে ‘সিংহাসন’ গ্রহণ করেন, তখনই হৃদয় গলে যায়। মনে হয়, পর্দায় হোক বা বাস্তবে, তিনি নিজের এই মুহূর্তটা উপভোগ করছেন। আর সেখানেই দর্শকের সঙ্গে সরাসরি 'কানেকশন' তৈরি হয়।

প্রচার ছাড়াই আলো কেড়ে নেওয়া এক ‘ধুরন্ধর’
সব মিলিয়ে ধুরন্ধর শুধু আরেকটা বড় বাজেটের স্পাই–অ্যাকশন ছবি নয়, বরং অক্ষয় খান্নার অভিনয়জীবনের এক নতুন অধ্যায়। রণবীর সিংকে সামনে রেখে বলা গল্পের ভেতরে ঢুকে তিনি এমনভাবে নিজের ছাপ রেখে যান, যে ছবির রেশ কাটে অনেক পরে। রহমান ডাকাতের ভয়ংকর উপস্থিতি, আবার তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবিকতা, এই দুইয়ের ভারসাম্যটাই চরিত্রটাকে আলাদা করে তোলে।
হইচই করা প্রচার ছাড়াই, সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে থেকেও অক্ষয় প্রমাণ করে দেন, ভাল অভিনয়ের জন্য আলাদা 'স্লট' লাগে না। একটা সংলাপ, একটা দৃশ্য বা ‘FA9LA’ গানে সেই একরাশ হাসিই দর্শকের মনে দাগ কেটে যায়। তাই ধুরন্ধর শেষ হলেও আলোচনা থামে না। থেকে যায় একটাই অনুভূতি। যা আগামী দিনেও মনে করাবে, এই ছবির আসল চমক ছিলেন অক্ষয় খান্না, আর সেই কারণেই তিনি আজ ধুরন্ধর-এর আসল ‘ধুরন্ধর’।