পঞ্চাশ বছরে দূরদর্শনের জন্মদিনে কিছু করতে পারছি না। তোমরা 'দ্য ওয়াল' ডাকছ, বাইরের বিভিন্ন সংস্থা ডাকছে কিন্তু কলকাতা দূরদর্শন থেকে কোনও প্রাপ্য মর্যাদা দিয়ে ডাক এল না।

গ্রাফিক্স -দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 10 August 2025 17:46
১৯৭৫ সালের ৯ অগস্ট। শুরু হল কলকাতা দূরদর্শন। আকাশবাণীর রোজকার গ্ল্যামার কমে গেল কলকাতা দূরদর্শনের আগমনে। শোনা থেকে এবার দেখা আর শোনা একসঙ্গে। টিভি যেন তখন এক বিস্ময় বাক্স। পাড়ায় একটা বাড়িতে টেলিভিশন থাকা মানে সবাই সেই বাড়িতে সেখানে টিভি দেখতে চলে যেত। আর কলকাতা দূরদর্শন টিভিতে নিয়ে এল শিক্ষা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান। যা হল ভীষণ জনপ্রিয়।
যে দুই সুদর্শনা ও সুকন্ঠী নারীর হাত ধরে আমরা কলকাতা দূরদর্শনকে চিনলাম, তাঁরা হলেন চৈতালি দাশগুপ্ত ও শাশ্বতী গুহঠাকুরতা। দূরদর্শনের ৫০ বছর উপলক্ষে নস্টালজিক গল্প বলতে দ্য ওয়াল বিনোদন আড্ডায় হাজির ছিলেন লিভিং লেজেন্ড সঞ্চালিকা চৈতালি দাশগুপ্ত।

গল্পে গল্পে চৈতালি দাশগুপ্ত যেমন বললেন পুরনো সোনার দিনের গল্প, তেমনই জানালেন তাঁর খারাপ লাগার কথা। কলকাতা দূরদর্শনকে নিজের ঘর বলেই চিরকাল ভেবে এসেছেন চৈতালি দাশগুপ্ত। কিন্তু সেই ঘর থেকেই এল খারাপ লাগা। কলকাতা দূরদর্শনের জন্মদিনে যথার্থ স্বীকৃতি ও প্রাপ্য মর্যাদা পেলেন না চৈতালি। দ্য ওয়াল এক্সক্লুসিভ ভিডিও সাক্ষাৎকারে চৈতালি প্রথম মুখ খুললেন এই খারাপ লাগা নিয়ে। কলকাতা দূরদর্শনের জন্মদিনের আগে ঠিক কী ঘটে চৈতালির সঙ্গে?
চৈতালি দাশগুপ্ত বললেন 'আমি যতই অস্বীকার করি না কেন খারাপ লাগা মনে তৈরি হচ্ছে না। খারাপ লাগা মনে তৈরি তো হচ্ছেই। পঞ্চাশ বছরে দূরদর্শনের জন্মদিনে কিছু করতে পারছি না। তোমরা 'দ্য ওয়াল' ডাকছ, বাইরের বিভিন্ন সংস্থা ডাকছে কিন্তু কলকাতা দূরদর্শন থেকে কোনও প্রাপ্য মর্যাদা দিয়ে ডাক এল না।

দূরদর্শন কর্তৃপক্ষ যে আমায় ডাকেনি তা নয়। একদম শেষ প্রহরে ডেকেছে। পয়লা অগস্ট দূরদর্শনের জন্মদিন উপলক্ষে সায়েন্স সিটি অডিটোরিয়ামে বিশেষ অনুষ্ঠানে দূরদর্শন থেকে আমার কাছে ফোন আসে। দূরদর্শনের প্রথমে যারা ছিলেন তাঁদেরকে সম্মান জানানো হবে। কিন্তু একদম শেষে সেটা। তার আগে লা মার্টিনিয়ার স্কুলে একটি বাংলা ক্লাব আছে সেখানে আমাকে সংবর্ধনা জানানো হয়। কিন্তু দূরদর্শনের সায়েন্স সিটির অনুষ্ঠান ঠিক সেইসময়ই ছিল। পরে হলেও আমি যেতে পারতাম। কিন্তু সঠিক ভাবে তো আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।'
চৈতালি আরও জানান 'দূরদর্শনের ফিরে দেখা নিয়ে একটি অনুষ্ঠান হয়। সেই অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্ব ওঁরা শাশ্বতীকে দেয়। আমাকে ডাকেনি। তখন আমার খারাপ লাগা আসেনি। মনে হল যাক আমায় না ডাকুক, তবু শাশ্বতীকে তো ডেকেছে। সেটাই আমার ভাল লাগা। এরআগে দূরদর্শন থেকে একটি অনুষ্ঠানে আমাকে আর শাশ্বতীকে দর্শকাসনে বসতে বলা হয়।
বাইরে সম্মান আছে, ঘরে সম্মান নেই, কলকাতা দূরদর্শনের জন্মদিনে কিছু করতে পারলাম না। খারাপ লাগা তো একটা থাকেই। অথচ ৫০ বছর ধরে কলকাতা দূরদর্শনের ৯ অগস্ট জন্মদিনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে প্রতি অনুষ্ঠানে কাজ করেছি। অবসর নেবার পরও শান্তিনিকেতন থেকে লাইভ করেছি, ২৫ শে বৈশাখে স্টুডিও থেকে লাইভ করেছি, ২০২১ এর নারীদিবসের অনুষ্ঠান বা লতা মঙ্গেশকরের প্রয়াণের পর বিশেষ অনুষ্ঠান, সবেতেই আমি ছিলাম। কিন্তু ৫০ বছরের জন্মদিনে ডাক পেলাম না।'
চৈতালি দাশগুপ্তর কাছে দ্বিতীয় সংসার, দ্বিতীয় বাড়ি কলকাতা দূরদর্শন। কিন্তু সেই সংসারেই তিনি কদর পেলেন না। যেখানে বাংলার দর্শকরা দূরদর্শন মানেই আজও চৈতালি-শাশ্বতী বোঝেন সেখানে দূরদর্শন সঠিক মূল্যায়ন দুই সঞ্চালিকার পঞ্চাশ বছরে করলেন না। চৈতালি দাশগুপ্ত সবথেকে ব্রাত্য রইলেন। অথচ তাঁর অবদান তো কম নয়। দর্শকের দরবারে, ঘরে-বাইরে তাঁকে ছাড়া হত না। অথচ সেই 'সাপ্তাহিকী দিদি' প্রাপ্য মর্যাদা পেলেন না।
যদিও এসবে চৈতালি দাশগুপ্তর মতো ব্যক্তিত্বর কিছু এসে যায় না। কারণ তাঁর মনেপ্রাণে দূরদর্শন। এত দর্শক দূরদর্শন বলতে তাঁকেই চেনে। দূরদর্শনের গল্প নিয়ে চৈতালি দাশগুপ্তর বই আসছে 'কেয়ার অফ দূরদর্শন'।