উত্তমকে সুপ্রিয়ার গভীর ভাবে পাওয়ার স্বাদটা ঠিক কী করম? উত্তম তো বেণুর কাছে নিছক একটা শরীর নন, একটা ইমেজ নন, একজন জীবনসঙ্গী নন। উত্তম সুপ্রিয়ার কাছে একটা জীবনধারা।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 24 July 2025 20:53
সুপ্রিয়ার ঠোঁটে 'আপনাদের দাদা' ডাক বাঙালির কাছে চিরকাল ছিল এক নিষিদ্ধ পরকীয়ার হাতছানি। ভারতীয় চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হয়েও সুপ্রিয়া চিরকাল সমাজের চোখে 'নিষিদ্ধ রমণী'। যে উত্তমকুমারকে শয্যার আশ্লেষে কেউ পায় না, ভরসার আদরে কেউ পায় না, সেই উত্তমকে একলা নারী সুপ্রিয়া জিতেছিলেন। একে বিবাহিত পুরুষ, তারওপর তিনি মহাতারকা, তাই সুপ্রিয়ার প্রতি বাঙালির এই বিদ্বেষের পিছনে লুকিয়ে ছিল এক অতৃপ্ত হিংসা।
মহানায়কের মহাপ্রস্থানে সুপ্রিয়া দেবীকে একঘরে করেছিল সমাজ। যে মানুষটাকে পাগলের মতো ভালবাসা যায়, যার প্রেমের দহনে আত্মঘাতী হতেও দ্বিধা থাকে না, সমাজের সব লাঞ্ছনা-গঞ্জনা নীরবে সহ্য করা যায়, সেই মানুষটাই হঠাৎ এরকমভাবে প্রায় অভিমান করেই এভাবে চলে যাবে কেন?
প্রথম স্বামীর সঙ্গে ঘর ভাঙার পর সেই ছাই ঝেড়ে মুছে উত্তমের ধারাস্নানে স্নাত সুপ্রিয়া উঠে এসেছিলেন ৩ নং ময়রা স্ট্রিটে। এই বাড়িতেই প্রথম সুপ্রিয়ার কাছে আশ্রয় চেয়েছিলেন উত্তম। ৬২ সালের রাত। উত্তম-সুপ্রিয়া দু'জনেই প্রথম সংসার থেকে ক্লান্ত হয়ে এক হয়েছেন রাতবাসরে।
সুপ্রিয়ার বাড়িতে রাতে থেকে গেলেন উত্তম। তবে সুপ্রিয়ার আঁচলে উত্তম বাঁধা পড়েছেন তার আগেই। সুপ্রিয়া দেবী একবার সেই রাত নিয়ে বলেছিলেন 'সেই রাতের মতো আগে উত্তমকে কখনও পাইনি। পরিপূর্ণ ভাবে পাওয়া বলে না! সেটা ঐ প্রথম। চোখে চোখ, হাতে হাত। নিবিড় অন্তরঙ্গতা। আম্রপালির সাজে প্রথম আমাকে বাবির ভাল লেগেছিল। সে কথা প্রায়ই বলত। বাবির অত রূপ গ্ল্যামারের ভারে হাজবেন্ড হাজবেন্ড ব্যাপারটা এতটুকু কমেনি। কিন্তু ভুগলাম শুধু রক্ষিতার অপরাধে।'

উত্তম কিন্তু সুপ্রিয়ার প্রথম বিয়ে ভাঙার বিরুদ্ধে ছিলেন। তিন তিনবার সুপ্রিয়ার ডিভোর্সের কেস উইথড্র করিয়েছিলেন উত্তম। ৬৩ তে ডিভোর্স নিলেন সুপ্রিয়া। কারণ ততদিনে সুপ্রিয়া মনেপ্রাণে উত্তমের হয়ে গিয়েছেন।
অথচ সুপ্রিয়া ভালবাসায় ভেসে নিজের দিকটা ভাবেননি। উত্তম কিন্তু প্রথম স্ত্রী গৌরী দেবীকে ডিভোর্স দেননি। যদিও নারায়ণ শিলাকে সাক্ষী রেখে সুপ্রিয়ার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছিলেন উত্তম।
সুপ্রিয়া কখনওই গৌরীদেবীর সংসার দখল করার বা অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি করেননি। বরং অসুস্থ গৌরীদেবীকে রান্না করে পাঠাতেন সুপ্রিয়াই। কিন্তু আবেগ ও স্নেহের বশে সুপ্রিয়া যে ভুল করেছিলেন, সুচিত্রা সেন সেই ভুল করেননি। হয়তো তাই সুচিত্রা 'দেবী' হয়ে রয়ে গেলেন জনমানসে, আর সুপ্রিয়া 'দেবী' হয়েও তা রইলেন না।
সে সময়ে বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ বছর বছর সন্তান উৎপাদন করত, শাশুড়ি-বউমা একসঙ্গে সুতিকাগৃহে থাকত, একসঙ্গে দুজনের সন্তান প্রসব হত। আর সেই সমাজেই আবার সুপ্রিয়ার সমালোচনা চলত। সুপ্রিয়া অবশ্ সমাজের মুখে পরপর বুড়ো আঙুল দেখান। তবে সুপ্রিয়া উত্তমের ঘর ভেঙেছে এইটা যতটা রটে, ততটা আলোচনা হয় না চলচ্চিত্রে সুপ্রিয়ার অবদান নিয়ে।
উত্তমকুমার বলতেন, তিনি চারটে জিনিস খেতে ভালবাসতেন। চা, চিংড়ি, চুমু, আর বিশেষ একজনের হাতের রান্না। এই বলে বেণুর দিকে তাকিয়ে চোখটা স্লাইট মেরে দিতেন উত্তমভঙ্গিতে। আসলে, প্রথম দেখাতেই যেন দুজনের ভালবাসা হবে, ঈশ্বর জানতেন।
সব ভালবাসা, সব প্রেম, সব বৈভব শেষ হয়ে গিয়েছিল উত্তমের অকাল প্রস্থানে। সুপ্রিয়া নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন। কী ভাবে সংসার চালাবেন জানতেন না। ফিল্মের ডাক পেতেন না। উত্তমের শেষ না হওয়া ছবিগুলো করতে চেয়েছিলেন। তাও ফলপ্রসূ হয়নি। সুপ্রিয়া বলতেন 'আমার কোথায় কী টাকা আছে জানেন জানি না। টাকাপয়সার কোনও হিসেব আমার নেই। কোনদিনই ছিল না। বাবিকে ভালবেসেছিলাম টাকার জন্য নয়। অথচ সমাজ আমাকে সেই অপবাদ দিল।'
উত্তমকে সুপ্রিয়ার গভীর ভাবে পাওয়ার স্বাদটা ঠিক কী করম? উত্তম তো বেণুর কাছে নিছক একটা শরীর নন, একটা ইমেজ নন, একজন জীবনসঙ্গী নন। উত্তম সুপ্রিয়ার কাছে একটা জীবনধারা।
'উত্তমের ঐ বেণু বেণু ডাক, উত্তমের গোটা সংসারকে ধরে রাখার দায়িত্ব, উত্তমের সন্ধ্যেবেলার গান, উত্তমের হেমন্ত-জর্জ বিশ্বাসের প্রতি অনুরাগ, নিভৃত অভিমান আর অন্তরঙ্গ দ্বন্দ্ব - সহসা সরে গেল সুপ্রিয়ার জীবন থেকে। তাও অকস্মাৎ, বিনা নোটিশে। এই দুঃসহ শূন্যতা সারাজীবন সুপ্রিয়ার স্মৃতি। 'আপনাদের দাদা' ডাকের মধ্যেই ছিল সুপ্রিয়ার অশেষ নিঃসঙ্গতা।