উত্তমদা আমায় ওঁর প্রোডাকশানের ছবিরও অফার দেন। ছবির নাম 'গৃহদাহ'। সেটা আর হয়ে ওঠেনি। ওঁর কাছের এক অভিনেত্রীকে নিতে বাধ্য হন। সেটা আমি আমার ভাগ্য বলেই মেনে নেব।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 24 July 2025 17:16
তিনি লিলি ফুলের মতোই মিষ্টি। তেমনি আন্তরিক তাঁর ব্যবহার। স্নিগ্ধতার আর এক নাম যেন লিলি চক্রবর্তী। বেশিরভাগ ছবিতেই তিনি উত্তমকুমারের সহ-অভিনেত্রী। কিন্তু যখনই তিনি উত্তমকুমারের পাশে পর্দায় দাঁড়িয়েছেন তখনই দর্শক মনে দাগ কেটেছেন। আজও লিলি চক্রবর্তীর অভিনয় বড় পর্দা থেকে ছোট পর্দায় হিট।
উত্তমকুমারের প্রয়াণ দিনে দ্য ওয়াল-এ অকপট গল্পে লিলি চক্রবর্তী। আলাপচারিতায় শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।

শুরুর দিনের গল্পে লিলি বললেন, "বিপাশা ছবিতে আমি মিসেস সেনের বান্ধবীর রোল করলাম। সেখানে আমি উত্তম কুমারকে দেখেছি, কিন্তু ওঁর সঙ্গে তখনও স্ক্রিন শেয়ার করিনি। তার পরে প্রথম আমি উত্তমদার সঙ্গে কাজ করলাম 'দেয়া নেয়া' ছবিতে। কিন্তু আমার একবারের জন্য মনে হল না, উনি উত্তম কুমার। এমন ব্যবহার করতেন, মনে হত আমি যেন ওঁর কতদিনের চেনা! উনি আমার ন্যাচারাল অ্যাক্টিং খুব পছন্দ করতেন। হয়তো উত্তমদা, বুড়োদা,আমি একসঙ্গে বসে গল্প করছি ব্রেকে, যখন লাইট কানেকশান হচ্ছে, ডায়লগ মুখস্থ করা হয়ে গেছে আমার, তখন হঠাৎ উত্তমদা গল্পের মধ্যে একটা কথা বললেন আমিও তার উত্তর দিয়ে দিলাম। পরে দেখলাম আরে এ তো আমাদের ছবির ডায়লগ! উত্তমদা তখন বললেন, 'এই ভাবে স্বাভাবিক অভিনয় করতে হয়, এভাবেই রির্হাসাল করতে হয়। মনেই হবে না তুমি অভিনয় করছো।' এগুলো শেখা ওঁর কাছ থেকে।
দেয়া নেয়া ছবিতে আমি বুড়োদার (তরুণ কুমার) বউ। তো সেই যে বৌঠান বলা উত্তমদা শুরু করলেন, যেখানেই দেখা হত আমায় বৌঠান বলেই ডাকতেন।

উত্তমদা আমায় ওঁর প্রোডাকশানের ছবিরও অফার দেন। ছবির নাম 'গৃহদাহ'। সেটা আর হয়ে ওঠেনি। ওঁর কাছের এক অভিনেত্রীকে নিতে বাধ্য হন। সেটা আমি আমার ভাগ্য বলেই মেনে নেব। ঈশ্বরের কৃপায় এখনও আমার কাজের অভাব নেই। আজকালকার ছেলেমেয়েরাও আমায় যা ভালবাসে, এত ভালবাসা বোধহয় আমি আমার অল্প বয়সে পাইনি। অথচ সেই অভিনেত্রী বলছেন এখন তাঁর হাতে কাজ নেই।'
উত্তমকুমারের সাংস্কৃতিক দিক নিয়ে লিলি বললেন
'একবার শিল্পী সংসদের একটা প্রোগামে উত্তমদা ঋতুরঙ্গ নিয়ে গীতিনাট্য মঞ্চস্থ করলেন। তাতে আমি, বাসবী নন্দী আর রাজশ্রী বসু তিন জন হিরোইন আর উত্তমদা হিরো। আমরা গান গেয়েছিলাম শ্যামলদার (শ্যামল মিত্র) ডিরেকশনে। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত-- তিন নায়িকা করেছিলাম। গান তখন গাইতাম আমি, এখন আর দম পাই না গান গাওয়ার। খুব ভাল হয়েছিল অনুষ্ঠানটা, সবাই খুব প্রশংসাও করেছিল। এটার রিহার্সাল করবার জন্য আমরা ময়রা স্ট্রিটে যেতাম, সেখানে বেণুদি খুব আদর-যত্ন করতেন। তার পর তো দুই পুরুষ ছবিতে কল্যাণীর রোল করেছি উত্তমদার সঙ্গে। আর বেণুদি করেছিলেন বিমলা। তার পরে আমি বম্বে চলে গেলাম। বলিউডে তো অনেক ছবিই করেছি। পরে আবার কলকাতা ফিরলাম, 'ভোলা ময়রা' করতে। তাতে আমিই উত্তমদার স্ত্রীর ভূমিকায়। উত্তমদা যেদিন মারা গেলেন, আমি কলকাতাতেই। তখন আমি একটা ছবি করছিলাম ইন্দর সেনের, তাতেও আমি উত্তমদার হিরোইন ছিলাম। ছবিটার নাম ছিল 'হার মানিনি'। চার-পাঁচ দিন শ্যুটিংও হয়েছিল ছবিটার।'
২৪ জুলাই ১৯৮০ সালের দিনটা লিলি আজও ভুলতে পারেন না। বর্ষীয়ান অভিনেত্রী জানালেন
'আমি সেদিন ঘুম থেকে উঠে তখনও খবরের কাগজ দেখিনি। একটা ফোন পেলাম আমাদের থিয়েটারের একটি মেয়ের। বলল, 'শুনেছিস উত্তম কুমার নেই।' আমি তো একদম আঁতকে উঠেছি। তখন আমার গাড়ির ড্রাইভারও আসেনি। আমার বর আমাকে একটা ট্যাক্সিতে তুলে দিলেন আমি চলে গেলাম গিরিশ মুখার্জী রোডের বাড়িতে। সারাটা দিন আমি উত্তমদার শেষ যাত্রার মিছিলে ছিলাম। সন্ধ্যেবেলা বাড়ি ফিরেছি। ৪৫ বছর কেটে গেল দেখতে দেখতে, মনে হয় এই তো সেদিন। এত অকালে উত্তমদা চলে গেলেন। উনি আরও কিছু দিন থাকলে ওঁর সঙ্গে আরও কাজ করতে পারতাম, আরও অনেক ছবি হত আমাদের, এটাই মনে হয়। এত অকালে ওঁর যাওয়ার কথা তো ছিল না। খুব কষ্ট হয়। তবে একটা কথা বলার, উত্তমদা বহু শিল্পী-টেকনিশিয়ানদের অর্থ পাঠাতেন। বহুদিন পর্যন্ত উত্তমদার পাঠানো খাম যেত তাঁদের বাড়ি বাড়ি। এ জন্যই তিনি মহানায়ক।"