অভিনেতা নন, পুরোদস্তুর সুরকার উত্তম কুমারের নির্দেশে কীভাবে গান তুলেছিলেন আশা ভোঁসলে? বম্বের সেই ঐতিহাসিক রেকর্ডিংয়ের রোমাঞ্চকর কাহিনি।

উত্তমকুমার ও আশা ভোঁসলে।
শেষ আপডেট: 12 April 2026 16:03
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাঙালির আড্ডায় তিনি চিরকালই রূপকথার রাজপুত্র। তাঁর এক চিলতে হাসি কিংবা সপ্রতিভ চলন— এই স্টারডমেই দশকের পর দশক বুঁদ হয়ে থেকেছে সিনেপ্রেমীরা। কিন্তু অভিনেতা উত্তম কুমারের সেই বিরাট ছায়ার নীচে কোথাও যেন চাপা পড়ে গিয়েছিলেন এক অসামান্য প্রতিভাধর সংগীত পরিচালক উত্তম কুমার। শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি, পর্দার সেই রোমান্টিক নায়ক যখন হারমোনিয়াম টেনে বসতেন, তখন তাঁর সুরের বিস্তারে মুগ্ধ হতেন বম্বে থেকে কলকাতার দিকপাল সঙ্গীতশিল্পীরা।
সুরকার হিসেবে উত্তম কুমারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালে, 'কাল তুমি আলেয়া' ছবির মাধ্যমে। এই ছবির সংগীত পরিচালনার গুরুদায়িত্ব ছিল খোদ মহানায়কের কাঁধে। আর এই ছবির মাধ্যমেই তৈরি হয়েছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত— সুরকার উত্তমের নির্দেশে গাইতে এসেছিলেন সঙ্গীতের রাজকুমারী আশা ভোঁসলে।
ঘটনাটি ছিল বেশ নাটকীয়। উত্তম কুমার চাইলেন তাঁর সুরে আশা ভোঁসলেকে দিয়ে গান গাওয়াতে। মনের এই ইচ্ছার কথা তিনি জানিয়েছিলেন তাঁর প্রাণের বন্ধু ও প্রখ্যাত গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। পুলকবাবু যোগাযোগ করলেন আশা ভোঁসলের সঙ্গে। অভিনেতা উত্তম কুমারের ভক্ত হলেও, সুরকার উত্তম সম্পর্কে আশার মনে ছিল প্রবল সংশয়। তিনি ভেবেছিলেন, অভিনেতা মানুষ, না জানি কেমন সুর করবেন! তাই তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে, মহানায়ককে নিজে গিয়ে বম্বেতে তাঁর বাড়িতে গান শুনিয়ে আসতে হবে।
নির্ধারিত দিনে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে আশা ভোঁসলের বম্বের বাসভবনে হাজির হলেন উত্তম। শুরু হল গান তোলানোর পর্ব। কিন্তু প্রাথমিক সংশয় কাটাতে আশার খুব বেশি সময় লাগেনি। উত্তম যখন হারমোনিয়ামে আঙুল রাখলেন এবং পেশাদার সুরকারের মতো একের পর এক সুর ভাঁজতে শুরু করলেন, তখন ড্রয়িংরুমের আবহাওয়া বদলে গেল। উত্তম কেবল সুরই শোনাননি, প্রতিটি গানের দৃশ্যায়নে কোথায় কেমন নাটকীয়তা থাকবে, গায়কিতে কতটা ইমপ্রোভাইজেশন প্রয়োজন— সবটা দক্ষ হাতে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। মুগ্ধ আশা ভোঁসলে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন এই নতুন উত্তমের দিকে।
বিস্ময়ের তখনও বাকি ছিল। গান শেখানো শেষ করে উত্তম যখন উঠে দাঁড়াবেন, তখন হঠাৎই বলে বসলেন, "সবই যখন হল, তখন নোটেশনটা আর বাকি থাকে কেন? চলুন ওটাও সেরে ফেলি।" এরপর গীতিকার পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ও আশাকে চরম বিস্ময়ে ফেলে দিয়ে তিনি গানের প্রতিটি শব্দের নীচে নিখুঁতভাবে নোটেশন লিখে দিলেন।
একজন অভিনেতা যে শাস্ত্রীয় সংগীতে এতটা শিক্ষিত হতে পারেন, তা সেদিন বম্বের সঙ্গীতমহল কল্পনাও করতে পারেনি। সেই সুরের জোরেই ‘মনের মানুষ ফিরল ঘরে’ এবং ‘পাতা কেটে চুল বেঁধে সে টায়রা পরেছে’— গান দুটি আজও বাঙালির কানে অমৃতের মতো বাজে।
উত্তমের এই সুরের জ্ঞান কিন্তু রাতারাতি জন্মায়নি। ভবানীপুরের গিরিশ মুখার্জি রোডের পৈতৃক বাড়িতে ছোটবেলা থেকেই গানের আসর বসত। হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের বাবা শীতল মুখোপাধ্যায়ের টপ্পা শুনে বড় হয়েছেন তিনি। পোর্ট কমিশনার্সে চাকরির পাশাপাশি উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম নিয়েছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী নিদানবন্ধু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে।
এমনকি চলচ্চিত্র জগতে আসার আগে চক্রবর্তী স্কুলের সংগীত শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছিলেন উত্তম কুমার। সুরের প্রতি এই আজন্ম টানই তাঁকে পরবর্তীকালে 'সব্যসাচী' বা 'বনপলাশীর পদাবলী'র মতো ছবিতে সফল আবহ সংগীত এবং সংগীত পরিচালনার শক্তি জুগিয়েছিল।
যদিও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে উত্তমের জুটি ছিল বাংলা ছবির অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু সুরকার উত্তমের অধীনে যখন হেমন্ত গাইতে বসলেন, তখন ছবিটা ছিল অন্যরকম। ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবিতে উত্তমের সুরে ‘আমি যাই চলে যাই’ গানটি রেকর্ড করার পর স্বয়ং হেমন্ত উচ্চকণ্ঠে প্রশংসা করেছিলেন উত্তমের সুরের গভীরতার। আবার ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ছবিতে যখন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রেকর্ডিং বাতিল হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ও উৎপলা সেনকে অবাক করে দিয়ে রেকর্ডিস্টের আসনে বসে পড়েছিলেন উত্তম নিজেই। সেই গানগুলিও সুপারহিট হয়েছিল।
উত্তম কুমার যেন আগে থেকেই জানতেন তাঁর চলে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। তাই তাঁর সুরারোপিত শেষ দিকের গানগুলোতে ছিল এক অদ্ভুত বিদায়ের সুর। ১৯৮০ সালের ২৪শে জুলাই যখন তাঁর শবমিছিল বেরোল, তখন মানুষের হাহাকারের মাঝে বেজে চলেছিল তাঁরই সুর করা সেই অমোঘ গান— "যেটুকু সুরভি ছিল, হৃদয় সবই তো দিল... আমি যাই চলে যাই, আমায় খুঁজো না তুমি।"
সুরকার উত্তম কুমার হয়তো পর্দার উত্তমের কাছে কিছুটা আড়ালেই রয়ে গেলেন, কিন্তু আশা ভোঁসলের কণ্ঠে সেই চিরন্তন সুরগুলো আজও সাক্ষ্য দেয় যে, মহানায়ক কেবল রূপের জাদুকর ছিলেন না, তিনি ছিলেন সুরের এক গভীর উপাসক।
আশা ভোঁসলে প্রয়াত হলেন ভারতীয় সঙ্গীত জগতে অপূরণীয় শূন্যস্থান তৈরি করে। উত্তম চলে গিয়েছেন কয়েক দশক আগেই। তাঁদের গানে আজও জীবন্ত নস্ট্যালজিয়া।