
শেষ আপডেট: 3 April 2023 07:15
বাংলা ছবির ইতিহাসে উত্তম-সুচিত্রা জুটির মাহাত্ম্য বা গুরুত্ব নিয়ে আলাদা করে ব্যাখ্যা করার আর প্রয়োজন পড়ে না। সৌন্দর্য ও সম্মোহের প্রতীক যেন তাঁরা। পর্দায় উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন বাঙালির চিরন্তন রূপকথা। পর্দায় তাঁদের প্রেম বা বিরহ-- সবই যেন বাঙালির অবচেতনে লুকিয়ে থাকা ভালবাসাকে সিক্ত করে।
সময়ের নিরিখে দেখলে, পঞ্চাশ-ষাট ও সত্তর— এই তিন দশকে রুপোলি পর্দায় বাঙালিকে মাতিয়ে রেখেছেন উত্তম-সুচিত্রা। কিন্তু আশির দশকে ভাবা হয়েছিল উত্তম কুমারের সঙ্গে কাজ করবেন সুচিত্রার মেয়ে মুনমুন সেন (Moonmoon Sen)। তাঁদেরই মুখ্য চরিত্রে নিয়ে ছবি করার কথা ভাবা হয়। উত্তম কুমার-মুনমুন সেন জুটির ছবি ভেবে চিত্রনাট্যও লেখা হয়। তবে সে ছবি সত্যি হয়নি উত্তম কুমারের অকালপ্রয়াণে। যদিও পরে ছবিটি হয়েছিল। কিন্তু তাতে উত্তমকুমারের ভূমিকায় ছিলেন উৎপল দত্ত (Utpal Dutta)। ছবিটি হয়তো অনেকে দেখেওছেন, কিন্তু জানেন না তার পেছনে থেকে যাওয়া গল্প।

উত্তম-সুচিত্রা জুটির নতুন রূপ পেতে চলেছিল উত্তম-মুনমুন জুটি। মানে উত্তম কুমার ও মুনমুন সেন একই ছবিতে রয়েছেন আর সে ছবির প্রিমিয়ারে গেছেন সুচিত্রা সেন। স্বপ্নের মতোই একটা বিষয়। পরিচালক পার্থপ্রতিম চৌধুরী এই স্বপ্ন দেখেছিলেন। ঠিক যেন নায়ক-নায়িকা নন উত্তম-মুনমুন, কিন্তু সারাছবির চিত্রনাট্য জুড়ে উত্তম আর মুনমুন-- একসঙ্গে দুজন স্ক্রিন শেয়ার করবেন।
বাংলা ছবি এক নতুন ইতিহাস রচনা করার মুখে দাঁড়িয়েছিল, যেখানে উত্তম ছবি করতে চলেছেন সুচিত্রার মেয়ের সঙ্গে। স্বয়ং মুনমুন সেন তখনকার সেই হটকেক খবরকে মান্যতাও দিয়েছিলেন। ওঁরা করতেন শ্বশুর বউমার চরিত্র। কিন্তু চরিত্র দুটো বন্ধুর মতো। যেখানে শ্রদ্ধা থাকলেও ভয় নেই, ভালবাসা ও স্নেহ আছে। উত্তম কুমার পিয়ানো বাজাচ্ছেন আর মুনমুন গাইছেন, “দীনহীনে কেহ চাহে না, তুমি তারে রাখিবে জানি গো। আর আমি যে কিছু চাহি নে, চরণতলে বসে থাকিব।” গাইবেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও অরুন্ধতী হোম চৌধুরী।
https://youtu.be/Z8_H7-igHQY
ছবির নাম রাজবধূ। সব ঠিক হয়ে গেল। দর্শকরাও প্রহর গুনতে লেগেছেন। কিন্তু এক অমোঘ নিয়তি তা হতে দিল না। দর্শকের চোখের জলের শ্রাবণ নামল অন্য ভাবে। ২৪ জুলাই, ১৯৮০। বাংলার প্রিয় মহানায়ক উত্তমকুমারের মহাপ্রয়াণ ঘটল। উত্তমকে নিয়ে পরিকল্পনা করা বহু ছবিই না হওয়া হয়ে গেল। তার মধ্যেই একটি বিশেষ ছবি ছিল পার্থপ্রতিম চৌধুরীর এই ছবিটি, যা উত্তম কুমার ও মুনমুন সেন করতেন। সেটিই হতো উত্তম কুমারের সঙ্গে মুনমুনের নায়িকা রূপে প্রথম বাংলা ছবি। কিন্তু উত্তমের আকস্মিক প্রয়াণ বদলে দিল সব।
পার্থপ্রতিমের আগের ছবি 'যদুবংশ'তে অভিনয় করে উত্তম কুমার নিজের অভিনয়ের নতুন দিক খুঁজে পান। যেখানে নন-মেকআপ, ডিগ্ল্যামারাইজড লুকে প্রথম উত্তম কুমার অভিনয় করে সুখ পেয়েছিলেন। তাই ওঁর পার্থপ্রতিমের 'রাজবধূ' না করার কোনও কারণ ছিলনা। আর যেখানে রমার মেয়ে ওঁর বিপরীতে। কিন্তু মহানায়ক চলে যাওয়ার পরে সেই ভাবা চিত্রনাট্য মুলতুবি থেকে গেল তখনকার মতো।

সে সময়ে মুনমুন সেনের ছবির জগতে আসা সমর্থন করেননি সুচিত্রা। তাই অনেক পরে, বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরে ফিল্ম লাইনে এসেছেন মুনমুন। কিন্তু মা সুচিত্রা যদি দেখতেন তাঁর নায়ক ‘উতু’র সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করছে মেয়ে মুনমুন, মন কি গলত না মহানায়িকার? জানার সুযোগ রইল না।
যাই হোক, শেষমেশ পার্থপ্রতিম চৌধুরীর সেই 'রাজবধূ' ছবির শ্যুট হল, রিলিজ করল ১৯৮২সালে। উত্তম কুমার মারা যাওয়ার কারণে তাঁর না করা চরিত্রটি করলেন উৎপল দত্ত। আর ছবিতে তাঁর পুত্রবধূর রোল করলেন মুনমুন। এছাড়াও ছিলেন ছায়া দেবী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, রঞ্জিত মল্লিক ও শমিত ভঞ্জ। টিমটা দেখলে বোঝা যায়, এঁরা সকলে ছিলেন উত্তমের সহকর্মী, সহযোদ্ধা, বন্ধু বা অভিভাবক। সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়।

উৎপল দত্ত 'রাজবধূ' ছবিতে অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন বনেদী বাড়ির কর্তা ও শ্বশুরের ভূমিকায়। দীর্ঘকাল বিপত্নীক বৃদ্ধটি বনেদী বড়লোক, রক্তে ঐতিহ্যের স্রোত, রুচির ছাপ সাজপোশাকে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী অকালে মারা যাবার পরে গোটা বাড়ি ছন্নছাড়া। বিধবা দিদি ছায়া দেবী এই ভদ্রলোকটিকে দেখাশোনা করেন। একমাত্র পুত্র বাইরে। আর আছেন বাল্যকালের বাঙাল বন্ধু ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।
ছবিতে উৎপল দত্ত আর ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়-- দুই বন্ধুর সখ্য ও কমেডি দৃশ্যগুলো অমলিন নিখাদ হাস্যরসে পরিপূর্ণ। আসলে দুজনেই তো তুখোড় অভিনেতা। সেই বাঙাল বন্ধুর নতুন পুত্রবধূ খুব ভাল-ভাল বাঙাল পদ রান্না করে। সেই সব দেখে এই বৃদ্ধটি, যে রোলে উৎপল দত্ত অভিনয় করছেন, তাঁরও ইচ্ছে হয় নতুন বৌমা আনার। ছেলে আর তার দাদা এই ইচ্ছের কথা শুনে তাঁদের অফিসের পিএ-কে বৌমা সাজিয়ে বাবার কাছে হবু বৌমা বলে নিয়ে চলে যান এবং উৎপল তাঁকেই নিজের বৌমা ভেবে বসেন। সেই রোলেই মুনমুন অভিনয় করেন। এভাবেই এগোয় গল্প।
https://youtu.be/XwWkoss4c8c
মজার মোড়কে একটা সুন্দর বাঙালি পরিবারের গল্প উঠে আসে। পরিচালক পার্থপ্রতিম, তপন সিনহার মতোই আর এক পরিচালক যিনি মুনমুনকে ঠিক ভাবে বাংলা ছবিতে ব্যবহার করেছিলেন। মুনমুনের প্রথম ছবি ছিল 'রবি সোম'। সেখানে ছোট রোল ছিল, নায়িকা নয়। 'রাজবধূ'তে প্রথম নায়িকা। মুনমুন প্রথম ছবিতে কিছুটা আড়ষ্ট, কিন্তু সদ্য ফোটা ফুলের মতোই ফ্রেশ এবং সুন্দর।

উৎপল দত্ত কিন্তু ১৯৭১ সালে সুচিত্রা সেনের বিপরীতে তুখোড় ভিলেনের রোল করেছিলেন বিজয় বসুর 'ফরিয়াদ' ছবিতে। সেই ভিলেন উৎপল যখন 'রাজবধূ'তে সুচিত্রার মেয়ে মুনমুনের শ্বশুর হয়ে এলেন, তখন যেন তিনি মুনমুনের নিজেরই পিতা। এই দুই ভিন্নধর্মী চরিত্র উৎপল দত্ত বলেই সম্ভব হয়েছিল। উৎপল দত্তর এই ছবিতে অভিনয় আজও দেখলে মন ভাল হয়ে যায়। রাজবধূ ছবির আসল আকর্ষণ মুনমুনের চেয়েও বেশি উৎপল দত্ত। উত্তমের বিকল্প হিসেবে উৎপল যেন এই ছবিতে যথার্থ।
উৎপল ও মুনমুনের 'রাজবধূ' ছবি দর্শকরাও ভালই গ্রহণ করেছিল। মূল কারণ একটাই, আশির দশকে সুচিত্রা সেন রুপোলি পর্দা থেকে সরে গেছেন। তাঁর মেয়ে কেমন? মায়ের মতো দেখতে? অভিনয় পারে? অনেকে আবার সুচিত্রাকেই দেখছে ভেবে হলে ভিড় করেছিল।
মুনমুন সেনের সঙ্গে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের একটা গানও ছিল ছবিতে। তবু ছবিটা ল্যান্ডমার্ক হয়নি প্রচারে। পরবর্তীকালেও জায়গা পায়নি ইতিহাসে। কিন্তু উত্তম এবং মুনমুন এই ছবিটি করলে তা আরও ল্যান্ডমার্কিং হতো হয়তো।

উত্তমকুমার ও উৎপল দত্তের মধ্যে আরও একটা সম্পর্ক ছিল আগে। অজয় করের 'সপ্তপদী'তে ওথেলো করার অফার যখন উত্তম কুমারের কাছে এল, উনি বেশ চাপে পড়ে গেছিলেন। কারণ নাটকীয় ভাবে ইংরেজি উচ্চারণ করা! সেই প্রতিভা তখন উত্তমের দখলে ছিল না। তখন উত্তম মধ্যগগনে সুপারস্টার, তবু তিনি ওথেলো করতে উৎপল দত্তের স্মরণাপন্ন হলেন। ইংরেজি নাটক ও সাহিত্য পড়তে এবং শিখতে লাগলেন। সেসময় উত্তম ভেবেছিলেন ওথেলোর ভয়েস নিজেই দেবেন ছবিতে। তাই রোজ কিংবদন্তী উৎপল দত্তের কাছে ইংরেজির সঠিক উচ্চারণ ও নাটকের ভাব শিখতেন।
তখন মহানায়ক যেন উৎপল দত্তের ছাত্র। উত্তম শ্যুটিং সেরে সোজা চলে যেতেন উৎপল দত্তের বাড়ি। চলত কত কিছু শেখা। সেসব বাড়ি এনেও রাত জেগে পায়চারি করতে করতে অনুশীলন করতেন মহানায়ক। কিন্তু তাতেও উত্তম সফল হননি। অজয় কর ওথেলোর সেই গম্ভীর ভয়েস ও তীক্ষ্ণ উচ্চারণ উত্তমের গলায় পেলেন না। শেষ অবধি ময়দানে নামলেন উৎপল দত্ত নিজেই। 'সপ্তপদী'তে ওথেলো নাটকের দৃশ্যে উত্তমের কণ্ঠ ডাবিং করলেন উৎপল দত্ত। তারপর তো ইতিহাস।
https://youtu.be/CfMo0ifr_dM
সুপ্রিয়ার কন্যা সোমা চৌধুরী চ্যাটার্জীর শ্বশুর হয়ে একবার অভিনয় করেছিলেন উত্তম কুমার, “কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী” ছবিতে। সেটা স্বল্প সময়ের রোল ছিল। কিন্তু সুচিত্রা কন্যার সঙ্গে মহানায়ক লিড রোলে অভিনয় করলে, 'রাজবধূ' একটা ঐতিহাসিক ছবি হত। সে আর হল না, সে ছবিতে উৎপলের অভিনয় সম্পদ হয়ে রইল।
রঞ্জাবতীর মৃত্যু আজও রহস্য! কুয়াশায় মোড়া ব্যর্থ প্রেমিক উত্তীয় ও প্রাক্তন স্বামী স্যমন্তকের মৃত্যুও