
মহানায়িকা সুচিত্রা সেন ও দেব
শেষ আপডেট: 7 April 2024 17:22
শ্মশান থেকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন দেব। রাত্রে ঘুম থেকে উঠে শ্মশানের দৃশ্যগুলো ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে ফিরে দেবের চোখের সামনে আসতে থাকে। কার শেষকৃত্যতে শ্মশানে গেছিলেন দেব? তিনি আর কেউ নন বাংলা ছবির মহানায়িকা সুচিত্রা সেন।
১৭ জানুয়ারি ২০১৪। ঠিক দশ বছর আগে আমাদের ছেড়ে চলে যান বাংলা ছবির সম্রাজ্ঞী সুচিত্রা সেন। সেই ১৭ জানুয়ারির শীতের সকালটা কোন বাঙালি ভুলতে পারবে? সকাল হতেই দুঃসংবাদ! জীবন মৃত্যুর টানাপড়েনে লড়াই করে বেলভিউ হাসপাতালে প্রয়াত হলেন সুচিত্রা সেন। ভিড় জমল বেলভিউ হয়ে সুচিত্রার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়ির সামনে। বাদ গেল না কেওড়াতলা মহাশ্মশান। কালীঘাট ব্রিজের ওপর জনতার ঢল নামল। সবার শেষ আশা অন্তিমশয্যায় যদি একবার সুচিত্রা সেনের মুখ দেখা যায়। অনন্তলোকে তিনি পাড়ি দিলেও তাঁর দেহ তখনও তীব্র আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। যে আকর্ষণ বাদ দিতে পারেননি সেলেবরাও। কিন্তু কন্যা মুনমুন সেন মায়ের অন্তরাল সাধনাকে সম্মান জানিয়ে কফিনবন্দী বার করলেন মায়ের দেহ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সেই নির্দেশ দেওয়া ছিল। না আমজনতা শেষ দেখা দেখতে পাননি স্বপ্নের মহানায়িকাকে। শুধুই ব্রাউন রংয়ের কফিন ঘিরে সব জল্পনা কল্পনা। যার ভিতরে শায়িত রিনা ব্রাউন।
সুচিত্রা সেন নেই। খবর রটতে সে খবর এসে পৌঁছয় অভিনেতা দেব অধিকারীর কাছে। তখনও তিনি সাংসদ হননি। সকালে মুম্বই থেকে দেবের মায়ের ফোন ছেলেকে "শশ্মানে যাস কিন্তু"। দেব বললেন মাকে "নিশ্চয়ই যাব"।
ততদিনে মুনমুন সেনের সঙ্গে অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরীর 'বুনো হাঁস' ছবিতে কাজ করে ফেলেছেন দেব। মুনমুন দেবকে বলেছিলেন একটা দারুণ কথা "মা তোমার নাচ টিভিতে দেখেছেন। রাইমাকে একবার বলেওছেন, এই ছেলেটি ভালো নাচে। তুই ওঁর সঙ্গে সিনেমা করিস।"
দেব বলছেন "সিনেমায় আসার পর বারবার মনে হত। ইশ আমাদের সময় যদি সুচিত্রা সেন থাকতেন। টিভিতে সুচিত্রা সেনের ছবি দেখলে মনে হয়, ওরে দেব তোর তো ফোর্থ হিরো হলেও চলত। কোনওভাবে যদি সুচিত্রা সেনের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করতে পারতিস। রিয়া রাইমার কাছে শুনেছি ওদের দিদিমা খুব স্ট্রং। খুব মুডি। খুব রাগী। দারুণ প্রেজেন্স। আমার মনে হয় ওঁর কাছ থেকে একটা জিনিষ শিক্ষণীয়। নিজেকে কীভাবে ঠিক রেখে প্রেজেন্ট করা উচিত। কীভাবে ইমেজকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।"
হাসপাতাল থেকে বালিগঞ্জের বাড়িতে কিছুক্ষণ রাখা হয়েছিল সুচিত্রার দেহ। তারপর সোজা মহাশশ্মান। কোন স্টুডিওপাড়ায় রাখা হয়নি মহানায়িকার মরদেহ। তাই টলিউডের প্রথম সারির শিল্পীরা হাজির ছিলেন শশ্মানে। প্রসেনজিৎ, দেব, দেবশ্রী রায় , মুম্বই থেকে উড়ে এসেছিলেন মিঠুন চক্রবর্তী। সঙ্গে সুচিত্রার আত্মীয় পরিজন।
সুচিত্রা সেনের শেষ ইচ্ছে ছিল তাঁকে চুল্লিতে নয় চন্দন কাঠে দাহ করা হোক। তাই কফিন থেকে বার করে মুখাগ্নির জন্য চিতার উপর রাখা হয়েছিল দেহ। কন্যা মুনমুন করেছিলেন মায়ের শেষকৃত্য।
দেব জানাচ্ছেন " মুখাগ্নির সময় যখন সুচিত্রা সেনকে কফিন থেকে নামাচ্ছে, আচম্বিতে ওঁকে দেখেন। পর্দায় দেখা আর এই সামনে থেকে দেখা, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা। ওটা ছিল থার্ড পার্সন। এটা থার্ড ফার্স্ট পার্সন। ভাবতেই পারিনি ৮৪ বছর যাঁর বয়স, তাঁর মুখে এতটা মানসিক দৃঢ়তা অবশিষ্ট থাকতে পারে? নিজেকে নিজেই বলেছিলাম ',মাই গড! দেব অধিকারী, এখনও মুখের স্ট্রেংথটা দেখেছ? খুব শার্প ফিচার্স। মুখটা দীর্ঘ রোগভোগে ফুলে গেছিল। কিন্তু প্রেজেন্সটা রাজরানির মতো। আগে মনে হত উনি যদি আমার নায়িকা হতেন। শশ্মানে সুচিত্রা সেনকে দেখার পর থেকে মনে হয়েছিল আমার চিন্তাকে উনি অন্যখাতে বইয়ে দিয়েছেন। আমাদের স্টারদের ওঁকে অনুসরণ করা উচিত। এই যে ইমেজ রেখে চলে যাওয়া, এর জন্যই এত পরিশ্রম, এত সাধনা। ওঁর শবদেহের সামনে দাঁড়িয়ে নীরব প্রতিজ্ঞা করলাম চামড়া ঝুলে যাওয়া, ভুঁড়ি হয়ে যাওয়া, হাঁটতে না পারার অশক্ত চেহারা নিয়ে ফ্যানেদের সামনে কখনও আসবনা। তার আগে যেন আমার মৃত্যু হয়ে যায়।'