
শেষ আপডেট: 9 July 2023 14:26
ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কলেজপড়ুয়া ছেলেটি। জন্ম ৯ জুলাই ১৯৭৬। সুঠাম চেহারা, কাটা কাটা মুখশ্রী, দুরন্ত ডান্সার। ছেলেটির নামও ভীষণ সুন্দর, পুষ্পরাগ রায়চৌধুরী (Tota Roychowdhury)। তবে কলেজে পড়ার সময়েও তিনি জানতেন না, কোন পেশা তাঁর জন্য সাজিয়ে রেখেছে জীবন। দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীন ছেলেটিকে দেখে পছন্দ করেন নেন পরিচালক প্রভাত রায়। সব নতুন ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি শুরু করতে চলেছিলেন একটা লাভস্টোরি গল্প। কলেজ প্রেমের বাংলা ছবি। তবে টোটার বেবি ফেস কোনওদিনই ছিল না, বরং বড্ড বেশি সেক্সি। তাই নায়ক নয়, 'দুরন্ত প্রেম' ছবিতে ভিলেনের রোলেই পুষ্পরাগকে নিলেন প্রভাত রায়। কলেজের এক মাস্তান ছেলে।
এই ছবিতেই ছিলেন রচনা ব্যানার্জী, দোলন রায়ের মতো সেযুগের নবাগতা অভিনেত্রীরা। মিস জোজো অর্থাৎ গায়িকা জোজো মুখার্জীকেও এই ছবিতে অভিনয় করান প্রভাত রায়। একঝাঁক নতুন মুখ নিয়ে ছবি।
পুষ্পরাগ নামটা ভীষণ সুন্দর। কিন্তু সব শ্রেণির দর্শকের কাছে হয়তো সমান জনপ্রিয় হত না। তাই পুষ্পরাগ নাম পাল্টে তিনি হয়ে যান টোটা, তিনিই আজকের বিখ্যাত অভিনেতা টোটা রায়চৌধুরী (Tota Roychowdhury)।

টোটা বিখ্যাত স্বর্ণ ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে। কিন্তু তাও তিনি স্বতন্ত্র পেশায় যেতে চেয়েছিলেন। ইন্ডিয়ান আর্মিতে না গেলেও ভাগ্য তাঁকে নিয়ে গেল রূপোলি পর্দার দুনিয়ায়। প্রভাত রায়ের পরের ছবি 'লাঠি'তেও বখে যাওয়া কলেজপড়ুয়া হিসেবে দেখা গেছিল টোটাকে। বিপরীতে নবাগতা জুন মালিয়া।
টোটাকে হিরো হিসেবে পর্দায় আনলেন অঞ্জন চৌধুরী। 'পূজা' ছবিতে অঞ্জন কন্যা রিনা চৌধুরীর নায়ক হিসেবে দেখা গেল টোটাকে। টোটা বাড়ির ছোট ছেলে, যে তাঁর মেজ বৌদির বাড়ির ঝিকে বিয়ে করে। প্রতিবাদী চরিত্রে তাক লাগিয়েছিলেন টোটা।

তবে শুরুর দিকে বেশিরভাগই ভিলেন গোছের চরিত্রে বারবার কাস্ট করা হত তাঁকে। অথচ নায়ক হওয়ার সব রকম যোগ্যতা তাঁর ছিল। টেলিভিশনে নায়ক রূপে টোটা অনেক ভাল কাজ করেছেন, কিন্তু ফিল্মে কম। প্রসেনজিৎ-পরবর্তী ও জিৎ-দেবের উত্তর যুগে নায়কোচিত অভিনেতা ছিলেন টোটা। তাঁর মতো নাচের শিক্ষা সেসময় কোনও অভিনেতারই ছিল না। শুধু তাই নয়, টোটা ছিলেন ভীষণ ভাবে শরীরচর্চার সাধক। সে অভ্যাস টোটা আজও অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। কিন্তু বড় পর্দা টোটাকে ঠিকমতো ব্যবহার করতেই পারেনি।

পরে টোটাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর 'শুভ মহরৎ' ছবিতে এক পুলিশ অফিসারের চরিত্রে টোটাকে কাস্ট করেন ঋতুপর্ণ। এই ছবিতেই ছিলেন রাখী গুলজার। টোটাকে রাখীর এত ভাল লাগে যে তিনি ঋতুপর্ণকে বলেন পরের ছবি 'চোখের বালি'তে বিহারীর চরিত্রে টোটাকে নিতে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ভাগ্য বদলে যায় টোটার। জীবনের শ্রেষ্ঠ একটি চরিত্র করা হয়ে যায় তাঁর। কিন্তু 'চোখের বালি'র পরেও টোটাকে বাণিজ্যিক ছবির পরিচালকরা দূরেই রাখতেন। আর্ট ফিল্মেও ডাক আসছিল না।

কিন্তু প্রায় দশ বছরের খরা যুগ কাটিয়ে টোটা বড় পর্দা থেকে ছোট পর্দা, সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ফেলুদা থেকে লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের রোহিতদা-- সব রোলেই সব প্রজন্মের কাছে আজ জনপ্রিয়। এভাবেও ফিরে আসা যায়, দেখালেন টোটা। কাজ করেছেন সুজয় ঘোষ থেকে করন জোহরের বলিউড ছবিতেও।

তবে এই দীর্ঘ যাত্রাপথে টোটার পুষ্পরাগ নামটা একেবারেই হারিয়ে গেছে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে। যদিও একজন কিংবদন্তি অভিনেতা টোটাকে তাঁর আসল নাম পুষ্পরাগ বলেই ডাকতেন। তিনি হলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সুজয় ঘোষের শর্টফিল্ম 'অহল্যা'তে সৌমিত্রর সঙ্গে কাজ করার সময় টোটার থেকে তিনি জানতে পারেন, তাঁর ভাল নাম পুষ্পরাগ। এই নামটা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের টোটার থেকেও ভাল লেগে যায়। তাই তিনি টোটাকে পুষ্পরাগ বলেই ডাকতেন।

নাম টোটা যতটা অ্যাকশন বেসড, পুষ্পরাগ কিন্তু ততটাই রোম্যান্টিক। তাই পুষ্পরাগ নামে তিনি চলচ্চিত্র দুনিয়াতে পা রাখলেও হয়তো মন্দ হত না!
সঞ্জীব কুমারকে 'মোটু' বলে ডাকতেন সুচিত্রা, মুনমুনকে বিয়েতে সম্প্রদান করেছিলেন তিনিই