ছোটবেলায় অভিভাবকদের ‘ভয় দেখানো’ শব্দ—‘ছেলেধরা’। সেই শব্দ রূপ নিচ্ছে বড় পর্দার এক জটিল অথচ আবেগঘন থ্রিলারে। আগামী ১ মার্চ, অরুণাচল প্রদেশ-এর পাহাড়ি আবহে শুরু হচ্ছে পরিচালক শিলাদিত্য মৌলিক-এর নতুন বাংলা ছবি ‘ছেলেধরা’-র শুটিং।

শেষ আপডেট: 27 February 2026 16:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছোটবেলায় অভিভাবকদের ‘ভয় দেখানো’ শব্দ—‘ছেলেধরা’। সেই শব্দ রূপ নিচ্ছে বড় পর্দার এক জটিল অথচ আবেগঘন থ্রিলারে। আগামী ১ মার্চ, অরুণাচল প্রদেশ-এর পাহাড়ি আবহে শুরু হচ্ছে পরিচালক শিলাদিত্য মৌলিক-এর নতুন বাংলা ছবি ‘ছেলেধরা’-র শুটিং। এই ছবির কেন্দ্রে রয়েছেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়। (Swastika Mukherjee, Shieladitya Moulik)
ইন্দো-আমেরিকান যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবি হবে অরুণাচলের অচেনা দুটি জায়গায়—রাজধানী ইটানগর এবং সবুজে মোড়া জিরো ভ্যালি। এই অনাবিষ্কৃত ভূদৃশ্য শুধু ছবির প্লটেই নয়, গল্পের আবহ ও মানসিক টানাপড়েনেরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।
পরিচালক শিলাদিত্য, এবার ফিরছেন একেবারেই অন্য ঘরানায়। তাঁর নতুন ছবিটি নিছক থ্রিলার নয়, বরং নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বাংলা ছবিতে এমন দ্বিধাগ্রস্ত, নৈতিকভাবে জটিল নারী চরিত্র এখনও বিরল, মনে করেন পরিচালক।
গল্পের মূল চরিত্র বৃষ্টি, এক বিবাহবিচ্ছিন্ন মা। মেয়ের জন্মদিনে তাকে নিয়ে বেরোনোর একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত হঠাৎ করেই ভয়ংকর মোড় নেয়, যখন মেয়েটি সত্যিই অপহৃত হয়। এই অপহরণ শুধু বাহ্যিক নয়, বরং মানসিক এবং সামাজিক স্তরেও মানুষ কীভাবে একে অপরকে বন্দি করে রাখে, সেই গভীর বাস্তবতাও উঠে আসে গল্পে।
শিলাদিত্য বলছিলেন, ছোটবেলা থেকেই “ছেলেধরা আসবে”—এই ভয়টাই যেন আমাদের বেড়ে ওঠার অংশ। তাঁর মতে, ‘অপহরণকারী’ শব্দটা হয়তো অভিধানগতভাবে সঠিক, কিন্তু ‘ছেলেধরা’ শব্দের মধ্যে যে ভয়, রহস্য এবং লোকজ স্মৃতি আছে, তা অনেক বেশি শক্তিশালী। সত্যজিৎ রায়ের ‘ফটিকচাঁদ’ দেখার অভিজ্ঞতাও তাঁর এই ভাবনাকে প্রভাবিত করেছে। তাঁর কথায়, এই ছবিতে শুধু একটি শিশুর অপহরণ নয়, বরং মানুষের সম্পর্ক, অধিকার এবং নিয়ন্ত্রণের সূক্ষ্মতাও উঠে আসবে।
এই গল্পের আবেগের উৎসও ব্যক্তিগত। সম্প্রতি বাবাকে হারিয়েছেন শিলাদিত্য। তাঁর জীবনে এখন মায়ের উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় আশ্রয়। তিনি উপলব্ধি করেছেন, মা তাঁর সন্তানের জন্য কতটা অসম্ভবকেও সম্ভব করে তুলতে পারেন। সেই অনুভূতিই এই ছবির মা-মেয়ের সম্পর্ককে আরও বাস্তব ও তীব্র করে তুলেছে।
স্বস্তিকার অভিনয়জীবন দীর্ঘদিনের। অসংখ্য চরিত্রে নিজেকে ভেঙে গড়ে তিনি প্রমাণ করেছেন তাঁর বহুমাত্রিকতা। তবু তাঁর লক্ষ্য আরও স্পষ্ট—তিনি চান এমন জায়গায় পৌঁছতে, যেখানে কোনও চরিত্রের কথা ভাবলেই নির্মাতাদের মনে প্রথম নাম হিসেবে উঠে আসবে তাঁর নামই। তাঁর নিজের কথায়, তিনি কখনও চান না তাঁকে সহজে প্রতিস্থাপন করা যাক। তাঁর অভিনয়ের স্বাতন্ত্র্যই হোক তাঁর পরিচয়।
এই ভাবনাতেই সায় দিয়েছেন পরিচালকও। তাঁর কথায়, এই চরিত্রটি লেখার সময় থেকেই স্বস্তিকার কথাই মাথায় ছিল। যারা গল্প শুনেছেন, তারাও মনে করেছেন, এই চরিত্রের জন্য স্বস্তিকার চেয়ে উপযুক্ত আর কেউ হতে পারে না। তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং চরিত্রের আবেগ যেন এক জায়গায় এসে মিশেছে।
বলিউডে মা ও সন্তানের সম্পর্ক নিয়ে বহু থ্রিলার তৈরি হয়েছে, যেমন ‘মর্দানি’ ফ্র্যাঞ্চাইজি। তবে শিলাদিত্য স্পষ্ট করেছেন, তাঁর ছবি কোনওভাবেই সেই ধারার পুনরাবৃত্তি নয়। এখানে অপহরণের ঘটনাটি শুধু গল্পের একটি অংশ, এর পাশাপাশি মানুষের মানসিক, সামাজিক চাপ এবং সম্পর্কের জটিলতাও সমান গুরুত্ব পাবে।
স্বস্তিকা নিজেও মনে করেন, চরিত্রটি এমন একজন নারী, যাকে সহজে ভাল লাগবে না। তিনি আবেগপ্রবণ, আঘাতপ্রাপ্ত এবং অসম্পূর্ণ। কিন্তু একজন মা হিসেবে তাঁর ভালোবাসা তীব্র এবং নিঃশর্ত। এই চরিত্র তাঁকে নিজের ভেতরের বহু অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
সমাজের ভেতরে থাকা অপরাধবোধ, অবহেলা এবং অভিভাবকত্বের জটিলতা—এই ছবির মূল সুর। নির্মাতাদের লক্ষ্য শুধু সাধারণ দর্শক নয়, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চেও এই গল্পকে পৌঁছে দেওয়া।
ছবিটি প্রযোজনা করছেন প্রতীক মজুমদার এবং অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়। প্রযোজনায় রয়েছে হ্যান্ডিম্যান এবং সীতা২২ ফিল্মস। ক্যামেরার দায়িত্বে ইতালির সিনেমাটোগ্রাফার ভিনসেনজো কনডোরেলী। ক্রিয়েটিভ প্রডিউসার হিসেবে কাজ করছেন জিতিন হিঙ্গোরানি এবং লাইন প্রডিউসার শুভেন কুমার দাস। ছবির ভিজ্যুয়াল জগত নির্মাণ করছেন প্রোডাকশন ডিজাইনার সোমান্বিতা ভট্টাচার্য, আর চরিত্রগুলির পোশাকের দায়িত্বে রয়েছেন অজোপা মুখোপাধ্যায়। মার্চের শেষ পর্যন্ত চলবে শুটিং, এবং শীঘ্রই ঘোষণা করা হবে বাকি অভিনেতা ও কলাকুশলীদের নাম।