
শেষ আপডেট: 30 January 2024 19:20
সদ্য প্রয়াত হয়েছেন অভিনেত্রী শ্রীলা মজুমদার। শ্রীলা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন আড়ালেই রেখেছিলেন চিরকাল। এমনকী ইন্ডাস্ট্রির লোকেদের সঙ্গেও শ্রীলা তাঁর ব্যক্তিগত কথা কখনও ভাগ করে নেননি। ঠিক যেমন গোপন রেখেছিলেন নিজের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার খবর। কেন এই আড়াল? কেন এই রহস্য!
অভিনেতা অভিনেত্রীরা রুপোলি জগতের মানুষ। তাঁদের বাইরের চাকচিক্যটুকুই আমরা দেখি। জানতেও পারিনা তাঁদের মনের খবর। শ্রীলা মজুমদার শুধুমাত্র বাংলার অভিনেত্রী নন, তিনি আন্তর্জাতিক অভিনেত্রী। আশির দশকের শেষে বম্বের ফিল্মফেয়ার পত্রিকা সর্বভারতীয় ৫০ জন সেরা নায়িকার তালিকা প্রকাশ করেছিল। বাংলার থেকে ছিল দুজন অভিনেত্রীর নাম একজন সুচিত্রা সেন অন্যজন শ্রীলা মজুমদার। এতটাই ছিল বম্বের ডিরেক্টরদের কাছে শ্রীলার ক্রেজ। কিন্তু নব্বই দশকে এসেই চিত্রটা বদলে যায়। বম্বের ছবি থেকে কমতে থাকে শ্রীলা মজুমদারের নাম। কমতে থাকে ভাল ছবির সংখ্যা।
মৃণাল সেনের 'পরশুরাম' ছবির নায়িকা হয়ে শুরু হয়েছিল শ্রীলা মজুমদারের অভিনয় জীবন। একদিন প্রতিদিন, খন্ডহর, আকালের সন্ধানে, খারিজ সহ মৃণাল সেনের প্রচুর ছবিতে অভিনয় করেন শ্রীলা। মৃণাল সেনের ছবির হাত ধরেই শ্রীলার কাছে আসতে থাকে বম্বের আর্ট ফিল্মে অভিনয় করার সুযোগ। শ্যাম বেনেগল থেকে প্রকাশ ঝার ছবির নায়িকা শ্রীলা। প্রকাশ ঝার প্রথম ছবি 'দামুল' এর নায়িকা ছিলেন শ্রীলা। রোলটি প্রথমে করার কথা ছিল শাবানার। জগমোহন মুন্দ্রার 'কমলা' ছবিতে কাজ করার কথা ছিল তাঁর। রোলটা চলে যায় দীপ্তি নাভালের কাছে।
পাশাপাশি বাংলাতেও অপর্ণা সেনের পিকনিক, নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের চপার, গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের নাগমতী ছবিতে কাজ করেন তিনি। নাগমতী সেরা বাংলা ছবির জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিল। বম্বেতে শাবানা আজমি,স্মিতা পাতিল,দীপ্তি নাভালদের সঙ্গে শ্রীলা মজুমদারের নামটাও আসত সবার মুখে। কিন্তু বম্বের সেই দারুণ ভাল কেরিয়ার ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসেন শ্রীলা। কারণ ভালবাসা ও বিয়ে।
শ্রীলা মজুমদার তথাকথিত রোম্যান্টিক নায়িকার রোলে কোনকালেই সুযোগ না পেলেও তাঁর জীবনের রোম্যান্টিক কাহিনী কিন্তু খুব বর্ণময়। তিনি ভালবেসেছিলেন এক মুসলিম পুরুষকে। প্রথিতযশা সাংবাদিক লেখক এস এন এম আবদিকে বিয়ে করেছিলেন শ্রীলা। তিনি তাঁর পদবি নামেই বেশি পরিচিত। দীর্ঘদিন ইংরাজি দৈনিকে সাংবাদিকতা করেছেন আবদি।
মৃণাল সেন, শ্যাম বেনেগালের কাছে খুব দুঃখজনক ছিল শুধুমাত্র বিয়ের জন্য শ্রীলার বম্বে ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় চলে আসা বিষয়টা। সেসময় শ্রীলার দরজায় পৌঁছতে ভয় পেতেন মূলধারার ছবির পরিচালকরা। এতটাই অল্টার্নেট সিনেমায় হাই ডিম্যান্ডে অভিনেত্রী ছিলেন শ্রীলা। তাঁর কণ্ঠ ছিল সবার কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু স্বামীকে ভালবেসে কেরিয়ারে আপোস করেন শ্রীলা। সব মেয়েই দিনের শেষে একটা ঘর চায়। শ্রীলাও তাই চেয়েছিলেন। কিন্তু তখনই নিজের কেরিয়ারের জলাঞ্জলি হয় তাঁর। তবে আবদি কখনও তাঁর ইচ্ছে শ্রীলার উপর চাপিয়ে দেননি। শ্রীলার ইন্টারভিউ নিতে গিয়েই তাঁর সঙ্গে প্রেম। কিন্তু স্বামী মুসলিম হলেও শ্রীলা ধর্মান্তরিত হননি। দুজন শিক্ষিত মানুষের বিয়েতে ধর্ম বড় হয়ে ওঠেনি। তবে আশির দশকের শেষে এই ভিন ধর্মে বিয়ে সংবাদের শিরোনাম হতেই পারত। তেমন ভাবে তা হয়নি।
শ্রীলা মজুমদার এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন "এই বিয়ের জন্য বম্বে ছেড়ে আসা আমার কেরিয়ারে ছিল বড় ভুল। মধ্যগগনে বম্বের কেরিয়ার ছেড়ে দিয়েছিলাম ভালবাসার জন্য। কলকাতায় সংসার করতে এসে দেখলাম সব দায়িত্ব আমার একার কাঁধে পড়ে যাচ্ছে। সমস্ত সিদ্ধান্ত আমাকে একাই নিতে হত। আবদি শুধু প্রতিমাসে একবার অতিথির মতো আমার কাছে আসত। আবদি তখন সাংবাদিকতার কারণে দিল্লিতে থাকত। সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব আমার। আবদি স্বামী হিসেবে খুব ভাল কিন্তু সংসারের সব সিদ্ধান্ত আমার কোর্টেই ফেলে দিত। একটা সময়ের পর দূরত্ব বাড়ল। তখন আমাদের একমাত্র ছেলে সোহেল নয় বছরের। সোহেলের বাবা মায়ের দায়িত্ব একাই পালন করে গেছি আমি। আমি বেছে নিয়েছিলাম আমার কলকাতা আর আমার বিয়েকেই।"
স্বামীর সঙ্গে এক ছাদের তলায় আর থাকা হয়নি। কলকাতায় বাণিজ্যসফল ছবিতেও অবশ্য দুখী কালো মেয়ের চরিত্রে শ্রীলা হয়ে উঠেছিলেন আইকনিক মুখ। বাস্তব জীবনের কথাই কী ফুটে উঠত পর্দায়? সংসার চালানোর জন্য মূল টাকা তো এসব ছবি করেই আনতে হত শ্রীলাকে। কমার্শিয়াল ছবির বন্ধুরা-তাপস পাল থেকে রিনা চৌধুরী অনেকেই শ্রীলাকে বকাবকি করতেন তাঁর এই ভুল সময়ে বম্বে ছাড়ার সিদ্ধান্তের জন্য। শ্রীলাকে ওঁর মায়ের দায়িত্বও সামলাতে হত। যে কারণেবম্বে ফিরে যাবার কথা আর ভাবেননি শ্রীলা।
আসলে জল আর জীবন কারও জন্যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। শ্যাম বেনেগাল শ্রীলাকে মজা করে বলতেন 'বাংলা কী বেটি'। এইসব উঁচুদরের পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাগুলোই শ্রীলার স্মৃতিতে সবসময় ভাসত। কিন্তু ফিরে যাওয়ার উপায় ছিলনা।
দীর্ঘ সময় একাই নিজের সংসার, মায়ের সংসার, ছেলেকে মানুষ করার দায়িত্ব সামলে পাশাপাশি সিনেমা থিয়েটার যাত্রা করে গেছেন তিনি। আর্ট ফিল্ম থেকে তো আর টাকা আসেনা? টাকার দরকার খুব ছিল ওঁর জীবনে। মায়ের চলে যাওয়া, ছেলের কর্মসূত্রে বাইরে থাকার কারণে একাই শেষ জীবন কাটান অভিনেত্রী। সঙ্গে শুধু পরিচারিকা। কিন্তু কখনও নিজের না পাওয়া নিয়ে বিলাপ করতে শোনা যায়নি ঠাকুরভক্ত শ্রীলাকে। ঈশ্বরের পায়ে নিজেকে সমর্পণ করে দেন তিনি।
তবে শেষ দিকে আবদির সঙ্গে দূরত্ব কাটে শ্রীলার। জীবনের শেষ দিনগুলিতে মেঘ কেটে রোদের উঁকিঝুঁকি শুরু হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে শরীরে ক্যান্সার থাবা বসিয়েছে। শেষ সময়ে স্বামী ছেলে পাশে ছিলেন অভিনেত্রীর।
মুসলিম বিবাহ করলেও শ্রীলা ধর্মান্তরিত হননি। তাই শেষশয্যায় হিন্দু সধবার মতোই তাঁর সিঁথি ভরা ছিল লাল সিঁদুরে। সিঁদুর আলতায় চিতায় উঠলেন আকালের সন্ধানের দুগ্গা।