২০০৫ সালে সম্প্রচারিত সেই বিজ্ঞাপনই বদলে দিয়েছিল মহিলাদের সৌন্দর্যপণ্যের প্রচারের ধরন। সেই প্রথম কোনও পুরুষ, বলিউডের কোনও মেগাস্টার লাক্স সাবানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হলেন।

শেষ আপডেট: 20 September 2025 15:24
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘আজ ম্যায় আপকো বাতানোওয়ালা হুঁ মেরি খুবসুরতি কা রাজ’— বাথ টবে ছড়িয়ে রয়েছে গোলাপের পাপড়ি। তারই মধ্যে অর্ধনগ্ন হয়ে আধ শোয়া শাহরুখ খান (Shah rukh khan) । চারপাশে বলিউডের চার অভিনেত্রী— হেমা মালিনী, জুহি চাওলা, করিনা কাপুর ও শ্রীদেবী। মাইলফলক এভাবেই তৈরি হয়। এভাবেই ভেঙে যায় প্রচলিত গত বা ছক। ২০০৫ সালে সম্প্রচারিত সেই বিজ্ঞাপনই বদলে দিয়েছিল মহিলাদের সৌন্দর্যপণ্যের প্রচারের ধরন। সেই প্রথম কোনও পুরুষ, বলিউডের কোনও মেগাস্টার লাক্স সাবানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর (Brand Ambassador) হলেন।
লাক্সের ক্যাম্পেইন (Lux) বরাবরই ঘিরে থেকেছে বলিউড অভিনেত্রীরা। ১৯৪২ সালে প্রথম বার লাস্ক সাবানের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডর করা হয়েছিল লীলা চিটনিসকে। সেই শুরু, পরে মধুবালা থেকে শুরু করে ঐশ্বর্য রাই, আলিয়া ভাট— প্রায় সব বলিউড তারকাকেই দেখা গিয়েছে লাক্স বিজ্ঞাপনে। কিন্তু শাহরুখকে বাথটাবে বসানো ছিল একেবারেই অচেনা চিত্রনাট্য। লাক্সের ৭৫তম বর্ষপূর্তিতে ‘হার স্টার লাকি স্টার’ প্রচারে এমন বিজ্ঞাপন বাজারে এনে হইচই ফেলে দেয় হিন্দুস্তান ইউনিলিভার।
বিজ্ঞাপন বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, ভাবনাটা কোনওমতেই ভুল ছিল না। বরং ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বাস্তব। মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে সাবান ব্যবহারে ছেলেমেয়ে বাধবিচার থাকে না। সবাই এক সাবানই মাখে। অর্থাৎ পুরুষরাও মাখত লাক্স সাবান। কিন্তু লাক্সের বিজ্ঞাপনে তার আগে কোনও পুরুষ চরিত্র দেখা যায়নি। সেদিক থেকে ভাবনাটা ছিল অভিনব। পুরুষদের সাবানের বিজ্ঞাপনে প্রথমবার সাড়া ফেলে দিয়েছিল গোদরেজের সিন্থল। টিভির পর্দায় সেই সাবানের বিজ্ঞাপনে ঝড় তুলেছিলেন বিনোদ খান্না। তবে শাহরুখের সেই বিজ্ঞাপন প্রকাশের পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। অনেকেই বলেছিলেন, একজন পুরুষ তারকা দিয়ে মেয়েদের সাবানের প্রচার অস্বাভাবিক এবং ‘মেট্রোসেক্সুয়াল’ ইমেজ তুলে ধরার চেষ্টা। সমালোচকরা একে কখনও “হতাশার কৌশল”, আবার কখনও “অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ” বলে উল্লেখ করেছিলেন।আইআইএম কোঝিকোড়ের গবেষক সতীশ পাইয়ের মতে, “শাহরুখকে বাথটাবে দেখানো বিজ্ঞাপন লাক্সের আগের সব প্রচারের থেকে আলাদা। মহিলা তারকাদের কেন্দ্র করে চলা প্রচারভঙ্গি থেকে সরে এসে সরাসরি চমক দেওয়ার চেষ্টা।”
বিজ্ঞাপনকে সফল করে তোলার পেছনে মূল কারণ হিসেবে ধরা হয় শাহরুখের ব্যক্তিত্বকে। বিজ্ঞাপন দুনিয়ার অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন, এ ধরনের কাজ শাহরুখ ছাড়া আর কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না। নিজেও তিনি টাইমস অফ ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, “আমি চাইনি কেবল দাঁড়িয়ে থেকে একজন মহিলাকে বাথটাবে দেখব। আমি নিজে নেমে পড়েছিলাম, মনে হয়েছিল সেটাই ঠিক কাজ হবে।”পরবর্তীকালে শাহরুখকে আরও কয়েকটি লাক্স বিজ্ঞাপনে দেখা যায়— কখনও ক্যাটরিনা কাইফের সুবাসে ‘বেকাবু’ হয়ে, কখনও শ্রীদেবী, দীপিকা, মাধুরী, শর্মিলা ঠাকুরদের সঙ্গে লাক্স গোল্ডেন রোজ অ্যাওয়ার্ডসের মঞ্চে।
ভারতে ১৯২৯ সালে যাত্রা শুরু করা লাক্স— নামের মধ্যেই রয়েছে ‘লাক্সারি’র ছোঁয়া। মধ্যবিত্তের হাতে সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছে দেওয়া হোক গ্ল্যামারের স্বাদ, এটাই ছিল ব্র্যান্ডের কৌশল। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সাবানের বাইরে গিয়ে বডিওয়াশ, হ্যান্ডওয়াশ, সুগন্ধি, লিকুইড জেল— নানা পণ্য বাজারে আনে লাক্স। ব্র্যান্ড বিশেষজ্ঞ হরিশ বিজুরের কথায়, “লাক্স মানেই সিনেমার তারকাদের সাবান। পুরুষেরা তখনও লাক্স ব্যবহার করতেন, তবে প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন নায়িকারা। শাহরুখকে দিয়ে ব্র্যান্ড সেই প্রচলিত ধারা ভাঙতে চেয়েছিল।”
২০০৫ সালের সেই বিজ্ঞাপন বিপুল চর্চা তৈরি করলেও মুনাফা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেনি। ওই বছর কোম্পানির বিক্রি কিছুটা বাড়লেও মুনাফার অঙ্ক আগের তুলনায় কমেছিল। কিন্তু বিজ্ঞাপন জগতে আলোড়ন জাগানো সেই ছবি এখনও ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে।সাবেক লাক্স ব্র্যান্ড ম্যানেজার শিল্পা মদন পরে এক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, “৭৫ বছরের ইতিহাসে এই বিজ্ঞাপন ছিল সময়ের অনেকটা আগে। প্রথমবার একজন পুরুষকে ইচ্ছের বস্তু হিসেবে দেখানো হয়েছিল। আর শাহরুখ ছিলেন সেই কাজের জন্য একেবারে সঠিক মানুষ।” লাক্সের এই বিজ্ঞাপন ভারতীয় বিজ্ঞাপনী দুনিয়ায় এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। লাক্স আজও বলিউড তারকাদের সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে বাজারে জায়গা ধরে রেখেছে। তবে ২০০৫ সালের শাহরুখ খানকে বাথটাবে বসানো সেই বিজ্ঞাপনই থেকে গেছে সাহসী প্রচারের মাইলফলক হিসেবে।