
শেষ আপডেট: 13 February 2024 19:20
শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
ছবি- ভূতপরী
অভিনয়ে – জয়া আহসান,বিষান্তক মুখোপাধ্যায়, ঋত্বিক চক্রবর্তী, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, সুদীপ্তা চক্রবর্তী, অভিজিৎ গুহ প্রমুখ
পরিচালনা– সৌকর্য ঘোষাল
দ্য ওয়াল রেটিং - ৯/১০
এখনকার প্রজন্ম হ্যালোইন ডে উদযাপনে যতটা উৎসাহী, বাঙালির ভূত চতুদর্শী নিয়ে ততটা নয়। ঠিক সেভাবেই বাঙালি ভূতের গল্প, তেনাদের দাপট ছোটদের কাছেও কমে গেছে। আর সেখানেই বিপ্লব ঘটাল সৌকর্য ঘোষালের 'ভূতপরী'। ভূত কথাটার মধ্যে যতটা গা ছমছমে ভাব থাকে, ভূতপরী কথাটা ততটাই রূপকথার রোম্যান্সে মোড়া। আর ঠিক সেই রূপকথার স্পর্শ যেন আমরা পাই 'ভূতপরী'তে। ছোটদের সঙ্গে বড়দের মন ভরানো ছবি 'ভূতপরী'। ছোটদের ছোট না ভেবে বড়দের মতো করেই যদি তাদের গল্প বলা যায় তাহলে সেটা অনেকবেশি কার্যকরী হয়। 'ভূতপরী'তে তেমন ভাবেই গল্প বলেছেন সৌকর্য। যেখানে আজকের তন্ত্র-মন্ত্র রক্তচোষা ড্রাকুলার যুগে বাঙালি ভূত একেবারেই হারিয়ে যেতে বসেছে সেখানে নিখাদ বাংলার এক লাল টুকটুকে বেনারসি পরা ভূতের গল্প বলেছেন পরিচালক। যে ভূত কালরাত্রি যাপন ছেড়ে পরী হয়ে উড়তে চায় অসীমে। ভূতপরীর নামভূমিকায় জয়া আহসান। আঁধার অভিসারিকা জয়া এই ছবির আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
ভূতপরী' একজন শোষিত গ্রাম্য মহিলার গল্প, যার নাম বনলতা (জয়া আহসান)। সে প্রথম যৌবনেই বিধবা। বনলতাকে বিধবা বিবাহ দেবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কিন্তু সমাজের অশুভ শক্তির দাপটে বনলতাকে মারা যেতে হয়। গ্রামে আসা একটি কিশোর সেই মৃত বনলতার অস্থির আত্মার সন্ধান পায়। নিজের মৃত্যুর রহস্য উন্মোচন করতে ছোট্ট ছেলেটির সাহায্য চায় বনলতা। মানুষ মরে ভূত হলে, ভূত মরে কি পরী হয়? এই প্রশ্নের উত্তরই মিলবে ছবিতে। ছবিটি শুধু ভয় এবং ভূতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, নারী হত্যার পিছনের আসল সত্যটি উন্মোচন করার সময় ছবিটি ক্রাইম-থ্রিলার ঘরানাও স্পর্শ করে। ছবির গল্প বলে দিয়ে সিনেমার ম্যাজিক নষ্ট করতে চাই না। ছবির গল্প যেমন মন ভরাবে, গা ছমছম করাবে, তেমন ভূতপরীর কষ্টে চোখের কোণে জল আসবে।
পরিচালক সৌকর্য ঘোষাল মানেই কবিতার মতো ছবি। সে দাবি এবারও রেখেছেন সৌকর্য। ছবির দৃশ্যপটে যেন এবার খুঁজে পেলাম চলচ্চিত্রের কবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর পরিচালনার ছায়া। তেমনই সমাজের প্রান্তিক মানুষেরা কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠল এই ছবিতে। রয়েছে প্রতীকী চরিত্রেরা।
লাল বেনারসি আর সোনার গয়না পরা প্রতিমা মুখ জয়াকে দেখলে মহুয়া রায়চৌধুরীর কথা মনে পড়ে। জয়ার অভিনয় কেরিয়ারে সৌকর্য ঘোষালের ভূতপরী নতুন পালক যোগ করল। ভূতপরীর সংলাপে যেমন মজা আছে,ছন্দ আছে তেমন আছে নীরব বিদ্রোহের আর্তনাদ। তাঁর প্রতি হওয়া বঞ্চনার প্রতিবাদ যা ভূত হয়ে সে করতে চায়। জয়াকে সবসময় কঠিন চরিত্রের অফার দেন পরিচালকেরা তাঁর অভিনয় প্রতিভার কথা ভেবেই। ভূতপরী'তেও এক নতুন রূপে জয়া। জয়া ছোটদের কাছেও ভালবাসা পাবেন এই ছবি দিয়ে। ছবির আরো এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী। মাখন চোর। এক দেহাতি চোরের ভূমিকায় ঋত্বিক, যার আস্তানা গ্রামের সুড়ঙ্গে। কতটা সাবলীল অভিনেতা হলে এমন চরিত্র দাপটের সঙ্গে করা যায় দেখিয়েছেন তিনি। চোরের চরিত্র করলেও ঋত্বিক জানেন কীভাবে গল্পের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে হয়। আর আছে কিশোর নায়ক বিষান্তক মুখোপাধ্যায়। বিষান্তক এখন কিশোর হলেও ছবিটি শ্যুট করেছিল আরো কয়েক বছর আগে। এতটাই সহজাত অভিনয় করেছে সে যা সবার মন জয় করে নেবে। কিশোর নায়ক হয়ে ওঠার সাহস আর জানার আগ্রহ তার অভিনয়ে প্রকাশ পায়। সৌকর্য দারুণ অভিনয় করিয়ে নিয়েছেন বিষান্তককে দিয়ে। পরবর্তী কোনও ছবিতে বিষান্তক ভাল চরিত্র পেলে ভাল লাগবে।
'ভূতপরী' ছবিতে জয়ার পাশাপাশি নজরকাড়া অভিনয় করেছেন সুদীপ্তা চক্রবর্তী। কিশোর ছেলেটির মা শিলালিপির চরিত্রে তিনি। সুদীপ্তা ছবিতে একজন সাংবাদিক লেখিকা, যে একটি বই লেখা শেষ করতে ছেলে বরকে নিয়ে তাদের গ্রামের বাড়িতে আসে। ছেলে নিজেই একাএকা কথা বলতে থাকে ভূতপরীর সঙ্গে। ছেলের জন্য মায়ের দুশ্চিন্তার ছাপ সুদীপ্তার মতো মগ্ন অভিনেত্রীর অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠেছে। জয়া সুদীপ্তার শেষ দৃশ্যটি দেখলে গায়ে কাঁটা দেয়। দাপিয়ে কাজ করলেন দুই বাংলার জয়া-সুদীপ্তা। তবে সুদীপ্তার বরের চরিত্রের অভিনেতা একেবারেই দুর্বল অভিনয় করে গেলেন। সুদীপ্তার দাপুটে অভিনয় অনেকটা সামলে দিল স্বামীর দুর্বল চরিত্রটিকে। অনেকদিন পর দুর্দান্ত চরিত্রে শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়। সারা ছবির কেন্দ্রে তিনি, কালো ঠাকুর। শান্তিলাল কত ভাল অভিনেতা তা প্রমাণ করার সুযোগ পেলেন। অভিজিৎ গুহ মন ভরিয়েছেন নিজের ছন্দে। অনেকদিন পর প্রবীণ অভিনেতা কল্যাণ চট্টোপাধ্যায়কে দুর্দান্ত রোলে ব্যবহার করলেন পরিচালক।
গা ছমছমে আবহসঙ্গীত দুর্দান্ত। তেমনই উন্নত অর্ঘ্যকমল মিত্রের সম্পাদনা। অলক মাইতির সিনেমাটোগ্রাফি ছবিটিকে রূপকথার মতো পর্দায় তুলে ধরেছে। রামপ্রসাদী 'মায়ের এমনই বিচার বটে' ছবিতে দুর্দান্ত প্রয়োগ। তেমনই সুন্দর সংগীত পরিচালনা। ছবিতে রঙের ব্যবহার থেকে আলোর ব্যবহার যেভাবে হয়েছে তা খুব কম বাংলা ছবিতে দেখা যায় ।
সৌকর্য তাঁর আগের ছবি 'রেনবো জেলি'র মতোই 'ভূতপরী'তেও এক রূপকথা গড়েছেন। খুঁত খুব কিছু বলার প্রয়োজন নেই। কারণ আজকাল পর্দা থেকে ওটিটি সবেতেই এত হিংসা,রক্ত আর অপরাধমূলক কাজের ছবির জমানা সেখানে দর্শকদের দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, লীলা মজুমদারের যুগে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন সৌকর্য