
শেষ আপডেট: 2 December 2023 16:18
ছবি- একটু সরে বসুন
পরিচালক- কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়
অভিনয়ে- ঋত্বিক, পাওলি, ইশা, পায়েল, রজতাভ, মানসী, পরান, খরাজ
প্রযোজক- অসিত ঘোষ, অনিন্দ্য দাশগুপ্ত, শ্রীজিৎ মুখার্জী
দ্য ওয়াল রেটিং- ৯/১০
বনফুল বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্য নিয়ে অনেকদিন পর বাংলা ছবি হল। বনফুলের 'পাশাপাশি' কাহিনি অবলম্বনে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের নতুন ছবি 'একটু সরে বসুন'। তবে সেকালের সময়ে পড়ে নেই ছবিটি। বরং বর্তমান সময়ের জলন্ত দলিল 'একটু সরে বসুন'। তুখোড় কমেডি সংলাপ আর নিখুঁত অভিনয়ের জোরে টানটান ছবি। ছবি দেখে একটুও সরে বসতে হয় না। টলিউডে বহুদিন পর এত বুদ্ধিদীপ্ত গল্প পর্দায় এল। স্যাটায়ার-ধর্মী ছবিটি বুদ্ধিদীপ্ত, তবে দুর্বোধ্য নয়। সাধারণ মানুষের জীবন যুদ্ধের কাহিনি কৌতুক সংলাপে সাজিয়েছেন কমলেশ্বর। কমেডির মোড়কে হলেও তা বোকা হাসি একদমই নয়। এ হাসি শিক্ষিত করে, এ হাসি প্রতিবাদের আগুন জ্বালায়, শেষে এ হাসি চোখও ভেজায়।
'একটু সরে বসুন' ছবিতে হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে বেকারত্বের যন্ত্রণার গল্প। যার কোনও সমাধান নেই। অথচ নেই কোনও প্রতিবাদ। আমরা 'একটু সরে বসুন বলে' শেষ পর্যন্ত মানিয়ে নিচ্ছি। সমাজ কবে বদলাবে? শোষণের দিন কবে শেষ হবে!
বেগুনবাগিচার গুড্ডুর প্যাশন ম্যাজিক। ম্যাজিক দেখাতে সে দারুণ পটু। কিন্তু ম্যাজিক দিয়ে নিজের বাস্তবজীবনের উন্নতি ঘটাতে পারে না সে। গুড্ডু সংস্কৃত ভাষায় গ্র্যাজুয়েট। কিন্তু উচ্চশিক্ষিত হয়েও চাকরি মেলেনি, বেকার জীবনের যন্ত্রণার শিকার সে। ঘরে-বাইরে লোকে তাকে নানা জ্ঞান দিতে থাকে। অকর্মণ্য বলে কথা শোনায়। যদিও গুড্ডু এসব গায়ে মাখে না, কানে তোলে না। কিন্তু লোকজনের নানা কটূক্তিতে খারাপ লাগে গুড্ডুর প্রেমিকা পিয়ার (ইশা সাহা)। দীর্ঘদিন ধরে সবটা মেনে নিলেও একদিন আর সহ্য করতে না পেরে সে বাবা, মা (মানসী সাহা), প্রেমিকা পিয়া ও বেগুনবাগিচা গ্রাম ছেড়ে চাকরির সন্ধানে আসে কলকাতায়।
কলকাতায় গুড্ডু কাউকে চেনে না। কিন্তু মায়ের দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের সূত্রে সে থাকতে চলে আসে এক তুতো দাদা-বৌদির ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটে। ফটকেদা (রজতাভ দত্ত) আর তাঁর স্ত্রী (পায়েল) তাঁদের ফ্ল্যাটের বিনা পয়সার কেয়ারটেকার হিসেবে নিযুক্ত করে গুড্ডুকে। সঙ্গে তাঁদের দুই দুরন্ত ছেলে-মেয়েকে স্কুলে দেওয়া-নেওয়ার কাজ করবে গুড্ডু। সেভাবেই চলছিল। কিন্তু আচমকাই গুড্ডুর জীবনের মোড় ঘুরে গেল। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে টাকা পাচারকারীর গাড়ি ধরতে পুলিশকে সাহায্য করায় বেকার গুড্ডু রাতারাতি হয়ে ওঠে শহরের ভাইরাল সেলিব্রিটি “নতুন ভাই”! বাস্তব শহর হোক বা ভার্চুয়াল থেকে ফেসবুক, সবেতেই পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে সে। সেই সুবাদেই যোগাযোগ ঘটে রোকেয়া (পাওলি দাম) নামের এক ঘোড়েল মনমোহিনী এমপ্লয়মেন্ট দালালের সঙ্গে।
যা হওয়ার কথা ছিল, তা কিন্তু হল না। উল্টে রোকেয়া ক্রমশ গুড্ডুর সংস্পর্শে এসে তার সততার প্রেমে পড়ে গেল। ইতিমধ্যে বেগুনবাগিচা থেকে ফেসবুক দেখে গুড্ডুর মা, প্রেমিকা আর গ্রামতুতো মাষ্টারমশাই গুড্ডুর খোঁজে কলকাতায় চলে আসেন। এরপর ঘটতে থাকে নানা বিচিত্র কাণ্ডকারখানা। ছবির পরতে পরতে হাস্যরস আর বিপ্লবের আগুন। পরিচালক স্যাটায়ারধর্মী সংলাপে সাজিয়ে দিয়েছেন হাসির উপকরণ। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সেগুলোর যোগসূত্র খুঁজে নেওয়ার দায়িত্ব অবশ্য দর্শকের।
কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনা যতখানি উঁচুদরের, ততখানিই চোখা চোখা কমেডি মিশ্রিত সংলাপ রচনা করেছেন তিনি। ফেলে আসা দিনের ছোটগল্পকে বর্তমান সামাজিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন পরিচালক। কখনও ফেসবুক নিয়ে দারুণ কমেডি কখনও বর্তমানের জাল জুয়াচুরি, ভগ্নপ্রায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উঠে এসছে সংলাপে। এতটুকু গুরুগম্ভীর ব্যাপার নেই, অথচ হাসতে হাসতেও দুরন্ত প্রতিবাদ সম্ভব, তা প্রমাণ করে দিয়েছেন পরিচালক।
'একটু সরে বসুন' ছবির আসল রত্ন ঋত্বিক চক্রবর্তী। গুড্ডুর ভূমিকায় তুলনাতীত অভিনয় করেছেন ঋত্বিক। যে চরিত্রটি করতে টলিউডের আর কোনও বর্তমান অভিনেতাই সম্ভবত পারতেন না। ছবির শুরু থেকে শেষ মুগ্ধনয়নে দেখতে হয় তাঁকে। বেকার জীবনের যন্ত্রণা- অপমানকেও যে হাসি আর স্বপ্ন দেখা চোখ দিয়ে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে পারে। কমলেশ্বরেরএই ছবিতে অভিনয় ঋত্বিক চক্রবর্তীর অন্যতম সেরা পারফরমেন্স। সংলাপ থেকে অভিব্যক্তি, বলে বলে ছয় মেরেছেন ঋত্বিক। প্রেমিকা পিয়ার চরিত্রে সপ্রতিভ অভিনয়ে ঈশা খুবই সুন্দর। ঋত্বিক-ইশার রসায়ন বেশ জমাটি।
পাওলি দাম তাঁর মোহিনীবিদ্যা ছবির শুরু থেকেই ছড়িয়ে দিয়েছেন। কালো সাহসী পোশাকে পাওলির প্রথম আবির্ভাব চোখ ঝলসে দেয়। রোকেয়া চরিত্রটা যত এগোতে থাকে, তত তার রং-রূপ খোলতাই হতে থাকে। পাওলি কিছু জায়গায় অতি অভিনয় করলেও রোকেয়ার চরিত্রটা যেহেতু গ্ল্যামারাস, তাই বেখাপ্পা লাগেনি কোথাও। কিন্তু পাওলির শেষ দিকের নো মেক আপ লুক রোকেয়া চরিত্রের অন্তরটা দেখিয়ে দেয়। সে গুড্ডুকে ভালবাসলেও তার প্রেম কি সফল হয়? সেটা জানার জন্য ছবিটা দেখতে হবে।
রজতাভ দত্ত পর্দায় যখনই এসেছেন, হাসিয়েছেন। রজতাভর মুখে সংলাপ দুর্দান্ত। আবার ছবির শেষে এই রজতাভই দর্শকের চোখে জল এনে দেন। এমন এক নিষ্ঠুর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করায় এই ছবি যা ভীষণ আশঙ্কাজনক। পায়েল গ্ল্যামারাস আধুনিকা বৌদির চরিত্রে যথাযথ। দাদা-বৌদির দুই বাচ্চার চরিত্রে দুই শিশুশিল্পী বড্ড মিষ্টি অভিনয় করেছে।
গুড্ডুর মায়ের চরিত্রে মানসী সাহা আবার তাঁর সেরা অভিনয়টা করলেন। যে মা ভীষণ রসিকা। তিনি এই বয়সেও ফেসবুকে ভীষণ অ্যাক্টিভ। আবার রাতে তাঁর একটু গুড়াকুর নেশা না হলে ঘুম আসে না। মানসীর মুখের সংলাপ দর্শককে হাসিয়েই ছাড়বে। মানসীর স্বামীর চরিত্রে লোকনাথ দে নিজ ছন্দে যথাযথ। তবে বরের থেকেও পাড়ার মাস্টারের সঙ্গে মানসীর ভাব বেশি। যে মাস্টার (খরাজ মুখোপাধ্যায়) গুড্ডুর ছেলেবেলার শিক্ষক। খরাজ এই কমেডি চরিত্রে অভিনয়ে ও কণ্ঠে নিজেকে নতুন ভাবে উপস্থাপন করেছেন।
পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় একই রকম ভাল এই ছবিতেও। তবে দেবপ্রতিম দাশগুপ্তকে সেভাবে সংলাপ দেওয়া হল কই? পরাণের সহকারী হিসেবে পর্দায় দেবপ্রতিমের উপস্থিতি থাকলেও বেশি কিছু করার সুযোগ পেলেন না। কম সংলাপেই যদিও তিনি জাত চিনিয়েছেন। আর ছবিতে বিশ্বনাথ বসু একেবারেই সুযোগ পাননি। এতই স্বল্প তাঁর উপস্থিতি। তবে এই ছবি তো প্রায় সব কমেডি অভিনেতাদের সমন্বয়, তাই সুযোগ অল্প পেলেন কিছুজন। বনফুলের ছোটগল্পে পরিসর ছোট বলে চরিত্র কম ছিল, কিন্তু চলচ্চিত্রের দীর্ঘ সময়ে কিছু কাল্পনিক চরিত্র আনতেই হয়েছে পরিচালককে।
পার্থসারথী চক্রবর্তী রাজ চক্রবর্তীর ইউনিটের পর কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ইউনিটেও জমিয়ে দিলেন।
ছবির গান মন টানল। রাতপার্টিতে রাতপরী পাওলির আগমনের সঙ্গে সুনিধি চৌহানের গান 'নেশা নেশা' সত্যি নেশা ধরাল। বিশেষত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের লেখা গানের কথা মন ছুঁল, 'নেশা নেশা মৌতাত জমেছে এ রাতে একুশে আইন/ চোখে চোখে মৌচাক জমেছে ঠোঁটেতে জিনজার ওয়াইন'। আদা চা নয়, আদা মদ ছবিতে দারুণ রূপক।
রূপঙ্করের কণ্ঠে 'টগবগ টগবগ পক্ষীরাজের ঘোড়া' একসময়ের হিট গান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে অমল মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া 'টগবগ টগবগ ঘোড়া ছুটিয়ে' গানটি মনে করাল। ছবির সেরা গানে অন্বেষা রণজয়ের সঙ্গে অরিজিৎ সিং আবারও সিগনেচার মার্ক রাখলেন, 'নিষ্পলক'। গানটির আসল জাদুকর রণজয় ভট্টাচার্য তাঁর কলম আর সুরে কী নরম পরশ দিলেন মনে। এ গান রয়ে যাবে ছবির রেশ কাটার পরেও। অর্ঘ্যকমল মিত্রের সম্পাদনা অসাধারণ।
সবশেষে বলব, এই ছবিতে কোন তথাকথিত স্টার নেই। যে কারণে সর্বস্তরে ছবিটা হয়তো গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না। একই কারণে প্রেক্ষাগৃহ হাউসফুল হতেও অসুবিধে হচ্ছে। কিন্তু সাহস করে হলে গিয়ে দেখুন ছবিটি। এতটুকু ঠকবেন না। বর্তমান টালিগঞ্জ পাড়ার সেরা অভিনেতা অভিনেত্রীরা কাজ করেছেন এই ছবিতে। তাঁদের যেন নতুন ভাবে আবিস্কার করলেন কমলেশ্বর। আর ঋত্বিক তো যেন পাশের বাড়ির ছেলে, যার সঙ্গে তরুণ প্রজন্ম অসম্ভব রিলেট করতে পারবে। আবার রজতাভর চরিত্র বুঝিয়ে দেবে, সে নয়, ভিলেন আসলে এই সমাজ- পরিস্থিতি। ছবি দেখে মনে হবে সেকালের তপন সিনহা ঘরানার ছবি দেখে ফিরলাম। অনেকদিন পর টলিউডে এত বুদ্ধিদীপ্ত কমেডি ছবি হল। মেকি হাসি নয়, প্রাণ খুলেই হাসবেন। কিন্তু হাসি দিয়েই প্রতিবাদের বিপ্লব গড়ল 'একটু সরে বসুন'।