Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরগরমে মেজাজ হারালেন কর্মীরা! চুঁচুড়ায় নিজের দলের লোকেদেরই বিক্ষোভের মুখে দেবাংশুবার্নল-বোরোলিন বিতর্ক, ‘লুম্পেনদের’ হুঁশিয়ারি দিয়ে বিপাকে ডিইও, কমিশনকে কড়া চিঠি ডেরেক ও’ব্রায়েনেরভাঁড়ে মা ভবানী! ঘটা করে বৈঠক ডেকে সেরেনা হোটেলের বিলই মেটাতে পারল না 'শান্তি দূত' পাকিস্তানসরকারি গাড়ির চালককে ছুটি দিয়ে রাইটার্স থেকে হাঁটা দিলেন মন্ত্রী

প্রথম ছবিতে কমেডি দিয়েই সংসারে বিপ্লবে ঘটালেন মানসী, অপরাজিতা-শাশ্বত জুটির বাজিমাত

মানসী সিনহা পরিচালনা করলেন তাঁর প্রথম ছবি 'এটা আমাদের গল্প'।

প্রথম ছবিতে কমেডি দিয়েই সংসারে বিপ্লবে ঘটালেন মানসী, অপরাজিতা-শাশ্বত জুটির বাজিমাত

মানসী সিনহার প্রথম ছবি 'এটা আমাদের গল্প'

শেষ আপডেট: 29 April 2024 13:29

ছবি - এটা আমাদের গল্প


দ্য ওয়াল রেটিং -৭/১০ 

পরিচালনা - মানসী সিনহা


অভিনয়ে - শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, অপরাজিতা আঢ্য, সোহাগ সেন, খরাজ মুখোপাধ্যায়, কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবদূত ঘোষ, আর্য দাশগুপ্ত প্রমুখ


প্রযোজনা - ধাগা প্রোডাকশন 


শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় 

'লোকে কী বলবে' এই ভেবে আমরা জীবনে নিজেদের সাধপূরণ  থেকে চিরকাল বিরত থাকি। অথচ লোকের ভয়ে আরো খারাপ থাকার যাপনেই কেটে যায় আমাদের দিন। একটু সাহস, একটু মনের জোর রাখলে, আর পাশে সঠিক বন্ধু পেলে আমরা সহজেই খুঁজে নিতে পারি নিজেদের সুখের চাবিকাঠি। সুখ কী শুধু অর্থ,বৈভব আর সম্পত্তি দিয়ে হয়! না! খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবুজের মাঝে পুকুরের জল দেখা আর পাখির কলতান শোনার মধ্যেও থাকতে পারে সুখ। আর সাথে যদি থাকে প্রিয় মানুষের ভরসার হাত।' 

মানসী সিনহা পরিচালনা করলেন তাঁর প্রথম ছবি 'এটা আমাদের গল্প'। মঞ্জু দে, অরুন্ধতী দেবী, অপর্ণা সেন, শতাব্দী রায়, উর্মি চক্রবর্তীর মতো এ যুগের আরো এক পোড় খাওয়া অভিনেত্রী এলেন পরিচালনায়। তবে আগে যারা অভিনেত্রী থেকে পরিচালিকা হয়েছেন তাঁরা কেউই কমেডি রোলে খুব বেশি জনপ্রিয় ছিলেন না।  তাঁরা নায়িকা। মানসীর লড়াইটা এখানে। তিনি দমফাটা হাসির কৌতুকাভিনেত্রী যেমন, তেমনই দাপুটে চরিত্রাভিনেত্রী। আর প্রথম পরিচালিত ছবিতে এই কমেডি দিয়েই সহজ করে কঠিন কথাগুলো বলে দিয়েছেন মানসী। একাকীত্ব, চাপা কষ্ট, চোখের জল সব রকমের অনুভূতি ছবিতে থাকলেও কমেডির বাঁধনে ছবিটি দেখলে মন ভাল করে। 'এটা আমাদের গল্প'। আমার থেকে আমাদের কথাটা যেখানে বড়। দুটো মানুষের মিলন শুধু নয় দুটো পরিবারের মিলন দেখিয়েছেন মানসী। 


থিয়েটারের মেয়ে মানসী। যার মা 'নিম অন্নপূর্ণা' খ্যাত অভিনেত্রী মণিদীপা রায়। তিনিও থিয়েটার কন্যা ছিলেন। থিয়েটার থেকে মানসীকে আবিষ্কার করেন তরুণ মজুমদার। তরুণ মজুমদার হাতে ধরে মানসীকে ক্যামেরাটা বুঝিয়ে ছিলেন। সেই গুরুদক্ষিণাই মানসী যেন দিলেন তাঁর পরিচালিত ছবি দিয়ে। মানসী আর্ট ফিল্ম করার ধার মাড়াননি। একেবারেই বিনোদনমূলক পারিবারিক ছবি বানিয়েছেন । কিন্তু যে গল্পে আছে অনেকখানি সাহস। সমাজে যা নিষিদ্ধ ভাবা হয় আজও, তাই মানসী বৈধ স্বাভাবিক করতে শেখালেন। 

মানসী সিনহা তাঁর পরিচালিত প্রথম ছবি উৎসর্গ করেছেন প্রয়াত কিংবদন্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে। ছবির শুরু হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আবৃত্তি দিয়ে। এক লহমায় পরাবাস্তব থেকে এতদিন পর বাস্তবে যেন ফিরে এলেন সৌমিত্র।

আমরা যখন সবাই প্রায় হাসতে ভুলে গেছি তখন নিয়ম মেনে হেসে যদি একটু বিশুদ্ধ অক্সিজেন নেওয়া যায় মন্দ কী? শ্রীতমা দত্ত (অপরাজিতা আঢ্য) মর্নিং ওয়াকে গিয়ে রোজ লাফিং ক্লাবে হেসে আসেন। কিন্তু বাড়ি ফিরে ছেলে বৌমার সংসারে শ্রীতমা দেবীর হাসি উধাও। বিধবা শ্রীতমা দেবী যেন দায়দায়িত্ব পালন করতে করতে আজ শুধুই শরীরটাকে বয়ে বেড়াচ্ছেন। ঘটনাচক্রে লাফিং ক্লাবের আরেক সদস্য পাঞ্জাবি প্রৌঢ়  প্রবীণ শর্মা (শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়), প্রেমে পড়ে যান শ্রীতমার। হ্যাঁ এই বয়সেই। প্রৌঢ় প্রৌঢ়ার প্রেম নিয়েই জমে উঠেছে মানসীর ছবির গল্প। বাস্তবে এমন বয়সে প্রেমে পড়লে সে আর বলা হয়ে ওঠে না। তিন দশক আগে 'শ্বেত পাথরের থালা' তে বন্দনা দেবী আর সোমনাথ বাবুর প্রেম ভাবুন। সোমনাথের দেওয়া রঙিন শাড়ি পরতে বন্দনাকে নিভৃতে গাছের আড়াল বেছে নিতে হয়েছিল। সময় এগিয়েছে এখন আমরা যেন আর কয়েক ধাপ এগিয়েছি। তাই শ্রীতমার রঙহীন জীবনে রঙের পরশ নিয়ে আসে অবাঙালি প্রবীণ শর্মা। দুজন দুই বিপরীত মেরুর মানুষ। শ্রীতমা শান্ত গভীর ব্যক্তিত্বময়ী অন্যদিকে প্রবীণ শর্মা সৌখিন ব্যাচেলর। চুলে পাক ধরলেও সে আজও হিরো। আর এই হিরো বিধবা বিবাহ করে পঞ্চাশ অতিক্রান্ত শ্রীতমাকে তাঁর ঘরে জায়গা দিতে চান। প্রবীণ শ্রীতমাকে প্রপোজ করার জন্য বেছে নেন সমাজের তুচ্ছ ফুল নয়নতারা। শ্রীতমার জীবনে ঐ নয়নতারা যেন গোলাপের থেকে কম কিছু নয়। সেই নয়নতারা সে যত্ন করে রেখে দেয় ডায়েরির ভেতর, যা আবিস্কার করে শ্রীতমার নাতনি। নতুন প্রজন্ম কি  মেনে নেয় ঠাকুমার প্রেম? নাকি শ্রীতমা আর প্রবীণ এর সংসারে ঝড় ওঠে এই প্রেম নিয়ে? কারণ শ্রীতমা-প্রবীণ বিয়ে করে ছাদনাতলায় সাত পাক ঘুরবে ঠিক করে নেয়। এমন সাহসী বিষয়কে কমেডি মোড়কে দারুণ ধরেছেন পরিচালক মানসী সিনহা। 

পরিচালক মানসী ছবির প্রথমার্ধ কিছুটা অগোছালো হলেও দ্বিতীয়ার্ধ থেকে তিনি ছবির রাশ টেনে ধরেন। সঙ্গে কৌতুক আর আবেগের মিশ্রণে সঙ্গ দেয় দেবপ্রতিম দাশগুপ্তর চিত্রনাট্য। পরিবারের মধ্যে থেকে এমন বৈপ্লবিক গল্প দারুণ এঁকেছেন মানসী ও দেবপ্রতিম।

অভিনয়ে অপরাজিতা আঢ্যকে দুর্দান্ত ভাবে ছবিতে ব্যবহার করেছেন মানসী। অপরাজিতা এ ছবির প্রাণপ্রতিমা। সবথেকে বড় ব্যাপার অপরাজিতা মানেই আমাদের ধারণা উচ্ছল হাসি আর জমাটি উপস্থিতি। কিন্তু এই ছবিতে অপরাজিতার অভিনয়কে কী দুর্দান্ত ভাবে সংযমে  বেঁধেছেন মানসী। স্থিতধী অপরাজিতাকে  কেন্দ্রীয় চরিত্রে পাওয়া বেশ বিরল। ছবির নায়ক শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় নেচে গেয়ে কালারফুল অভিনয়ে মন ভরিয়েছেন। আবেগ দৃশ্যেও শাশ্বত অসাধারণ । কখনও তিনি দেব আনন্দ স্টাইলে কখনও বা তিনি ধুতি-পাঞ্জাবিতে মিসেস সেনের (শ্রীতমা সেনকে এই নামেই ডাকে তাঁর নাতনি) উত্তম। তবে শাশ্বতর কিছু জায়গায় অতি অভিনয় যেন একটু বেশি লাউড। হয়তো অপরাজিতার স্থিতধী রূপের পাশে শাশ্বতর জমাটি কনট্রাস্ট করতে চেয়েছেন। শাশ্বতর সংস্পর্শে অপরাজিতার সাদা শাড়ি হয়ে উঠতে থাকে ক্রমশ রঙিন। সাদা থেকে লালে উত্তরণ মানসী সুন্দর এনেছেন। শাশ্বত-অপরাজিতা জুটি পর্দায় কিন্তু দর্শকদের মন ভরাবে গল্পের জোরে। কনীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি এতটুকু অতি অভিনয়ের ধার মাড়াননি। বড়লোক বাড়ির বউয়ের একাকীত্ব কনীনিকার অভিনয়ে বিশ্বাসযোগ্য। তেমনই সুন্দর হিন্দি সংলাপ উচ্চারণ। শাশ্বতর ভাই কনীনিকার স্বামীর চরিত্রে অমিত কান্তি ঘোষ সাবলীল অভিনয়ে প্রশংসনীয়। দুজনের শুকিয়ে যাওয়া দাম্পত্যকে সুজলা সুফলা করে তোলে শাশ্বত-অপরাজিতার বিয়ের সিদ্ধান্ত। একটা বিয়ে কতগুলো সম্পর্ক ঠিক করে দিতে থাকে। অন্যদিকে অপরাজিতার ছেলে-বৌমার চরিত্রে দেবদূত ঘোষ ও ইয়াসমিন জাহান তারিণ চমৎকার। বাংলাদেশের অভিনেত্রী তারিণ জাহান আপাত ধূসর চরিত্রে বেশ দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। তাঁর মেয়ের চরিত্রে পূজা কর্মকার মন ভরিয়েছেন। তারিন ও পূজার মুখের মিল মা-মেয়ে বেশ মানিয়েছে কিন্তু। যা চট করে মেলেনা ছবিতে। একী টেলিপ্যাথি?
শাশ্বতর ভাইপো অর্থাৎ কনীনিকার ছেলের চরিত্রে আর্য দাশগুপ্ত প্রাণবন্ত। সোহাগ সেন বুয়া অর্থাৎ পিসির চরিত্রে এভাবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করলেন। অপরাজিতার মেয়ে-জামাইয়ের চরিত্রে জুঁই সরকার ও যুধাজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় মানানসই। 

আর যার কথা বলতে হয় তিনি খরাজ মুখোপাধ্যায়। খরাজ এখানে চায়ের দোকানের মালিক। যার দোকানে দু দণ্ড বসতে আসেন শাশ্বত-অপরাজিতা। খরাজের সংলাপ "এখানেও তো আপনারা ধান্দায় আসেন, ভাল থাকার ধান্দা" মন ছুঁয়ে যায়। এ ছবিতে শাশ্বতর লিপে খরাজ গানও গেয়েছেন। যদিও এই গানের দৃশ্যায়ন বড্ড চড়া। 

গানের কথা যখন উঠল তখন বলতেই হয় 'তুমি একটু কেবল বসতে দিও' রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রয়োগ পর্দায় অসাধারণ। শ্রীকান্ত আচার্য ও জয়তী চক্রবর্তী দুজনেই একই গান গাইলেও দুজনের গানই মেল ফিমেল ভার্সনে বুকে এসে লাগে। অনবদ্য গায়কী, সংগীত পরিচালনা ও পরিচালকের দৃশ্যায়ন। কমেডি থেকে আবেগ সবেতেই মানসী সিনহা চমৎকার। ছবির টাইটেল গানটিও মন্দ নয়।ছবির মধ্যেই 'শহর' ব্যান্ডের অনিন্দ্য বসুর গান উপস্থাপন মন ভরায়। 

মানসীর এ ছবি নিখাদ বিনোদনের পারিবারিক ছবি। যা একসময় দেখতে ভালবাসত বাঙালি। তবে বাঙালি পাঞ্জাবি দুটি সম্প্রদায়কে এই ছবিতে এক করেছেন মানসী, যা ছবিটির গল্পকে আরো আধুনিক করে তোলে। মানসীর পরিচালনায় যেন ২০ বছর আগের সুদেষ্ণা রায় ও অভিজিত গুহ পরিচালক দ্বয়ের ছায়া খুঁজে পেলাম। কৌতুক রসের সংলাপে আবহে বিপ্লব ঘটায় এ ছবি। দেবপ্রতিমের চিত্রনাট্য আর মানসীর পরিচালনা কিছু জায়গা তবে মোটা দাগের করে তোলে। যে চড়া দাগের অংশ এই সময়কার দর্শক নিতে পারলে ভালই। অন্যধারার এ গল্পে আরো সুযোগ ছিল কাহিনী  ও চিত্রনাট্যের বুনোট আরো দৃঢ় করার। তবে এ ছবির বার্তা ভীষণ সৎ। যে সততার জোরে ছবির শেষটা এক অন্য স্তরে নিয়ে যায় দর্শককে। যা খুঁত আছে তার জন্য ছবি দেখা জলে যায় না। মন প্রসন্ন করে এ ছবি। চাপা দেওয়া সত্যি সামনে আনে এ ছবি। বিয়ে যে বয়সেই হোক সেটা শুধু জুটির গল্প নয়, দুই পরিবারের গল্প। যা সবাই মিলে বলে 'এটা আমাদের গল্প'।


```