
শেষ আপডেট: 10 January 2024 19:25
ভারতীয় সঙ্গীত তথা বাংলা সঙ্গীত জগতে নক্ষত্রপতন। ৯ জানুয়ারি মঙ্গলবার মাত্র ৫৫ বছর বয়সে চলে গেলেন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত তারকা রশিদ খান। রশিদ খানের জন্ম উত্তরপ্রদেশের বদায়ুতে।নিজের জন্মভূমি ছেড়ে কলকাতাকে তিনি ও তাঁর পরিবার আপন করে নিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে রশিদ খান তাঁর প্রথম কনসার্ট করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি দিল্লিতে আইটিসি কনসার্টে পারফর্ম করেন। ১৯৮০ সালের এপ্রিলে, যখন রশিদের দাদু নিসার হুসেন খান কলকাতায় আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ একাডেমিতে যোগ দেন, তখন রশিদ খানও ১৪ বছর বয়সে একাডেমিতে চলে আসেন। ছেলেবেলা থেকেই রশিদের গলা ছিল তাক লাগানো। তবে জানেন কি, জীবনের প্রথম গানের রেকর্ডিং-এর তারিখ ভুলেই গেছিলেন রশিদ খান। রেকর্ড কোম্পানির লোক রশিদকে ডেকে নিয়ে এসে গান গাইয়েছিলেন। এতটাই আত্মভোলা ছিলেন রশিদ খান।
বাংলা গানের প্রবাদপ্রতিম গীতিকার প্রণব রায়ের পুত্র প্রদীপ্ত রায় শোনালেন সেই অজানা গল্প। তখনও রশিদ খান রশিদ খান হননি। এক নবাগত উদীয়মান গায়ক, যিনি পরবর্তীকালে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতের উজ্জ্বল এক নক্ষত্র হয়ে উঠবেন, তাঁর কেরিয়ার শুরুর কাহিনি জানলে চমকে যাবেন। কেমন ভাবে জহুরির চোখ চিনে নিয়েছিল খাঁটি হিরে, সেই সে গল্পই বলব আজ।
১৯৮৫-৮৬ সাল হবে। তখন কলম্বিয়া ব্রডকাস্টিং সার্ভিসে কাজ করতেন প্রদীপ্ত রায়। একদিন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী তাঁর কাছে এসে বললেন "নতুন একটি ছেলে আছে, ভাল ক্লাসিকাল গায়। টালিগঞ্জে থাকে। ওকে দিয়ে গান রেকর্ড করাতে পারো তোমরা।" অজয় চক্রবর্তী রেকমেন্ড করেছেন মানে নিশ্চিতভাবেই সে ছেলে হিরে!
প্রদীপ্ত রায় জানালেন, "অজয় বলাতে আমি খুব উৎসাহ পেলাম। অজয়কে বললাম, 'তুমি বলছ নতুন ছেলেটির গান রেকর্ড করা যায়?' অজয় বলল, 'আমি তোমাকে দায়িত্ব নিয়ে বলছি রেকর্ড কর।' অজয়কে আমি দাম দিই চিরকাল। আর তখন অজয় চক্রবর্তী গ্রামাফোনের চুক্তিবদ্ধ আর্টিস্ট। ওকে দিয়ে আমাদের কোম্পানিতে গাওয়াতেও পারছি না। তাই নতুন ছেলের খোঁজ খোঁজ।"
চলে গেলাম টালিগঞ্জে ছেলেটির বাড়ি। সেই ছেলেটি হল রশিদ খান। আইটিসির ওখানেই টালিগঞ্জে থাকত। রশিদ ওঁর দাদু নিসার হুসেন খানের ছাত্র ছিল। দাদুর সঙ্গেই রশিদ একই বাড়িতে থাকত। অজয় রশিদকে খুবই ভালবাসত। অজয়দের এক তলায় নিসার হুসেন খান ভাড়া থাকতেন। রশিদকে যেই বললাম তোমাকে দিয়ে গান রেকর্ড করাতে চাই, তোমাকে অজয় চক্রবর্তী রেকমেন্ড করেছেন। রশিদ শুনেই উৎফুল্ল হয়ে বলল "জরুর জায়েঙ্গে"।
রেকর্ডিং-এর ডেট ঠিক হল। রেকর্ডিং এ সব বড় বড় মিউজিশিয়ান এসছেন। সারেঙ্গি তবলায় সব নামীদামি বাজনদার। কিন্তু রশিদের দেখা নেই। আমরা সবাই অপেক্ষা করে করে বিরক্ত হয়ে গেলাম, তবু রশিদ এল না। ভাবলাম অজয় এত ভুল রেকমেন্ড করল? অজয়কে ফোন করে বললাম 'রশিদ তো আসেনি।' অজয় বলল, তুমি চলে যাও সরাসরি টালিগঞ্জে। শেষমেষ নিজেই চলে গেলাম গাড়ি নিয়ে টালিগঞ্জ। রশিদের বাড়ি। ওঁর দাদুর ব্যবহার খুব রুক্ষ ছিল। নাতি কোথায় গেল সেই নিয়ে অত তৎপর ছিলেন না। বললেন 'কে জানে কোথায় গেছে। আমায় বিরক্ত করবেন না।' শেষমেষ দারোয়ান বলল 'রশিদকে একটু আগে দেখেছি লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে ওদিকে চায়ের দোকানের দিকে যেতে। ওখানে ও আড্ডা দেয়। দেখুন তো।'
গিয়ে দেখি, ঠিক। টালিগঞ্জের ঠিক মোড়ে রশিদ একেবারে মগ্ন হয়ে বেঞ্চে বসে চা খাচ্ছে ভাঁড়ে করে। আমার দেখেই মাথায় রাগ উঠে গেল। বললাম 'একী আজ তোমার রেকর্ডিং! তুমি এখানে বসে চা খাচ্ছ।' তখন রশিদের খেয়াল হয়েছে। ধড়মড়িয়ে উঠে বলে 'সচ বাত হ্যায় দাদা!' তারপর তাকে আবার গাড়ি করে নিয়ে এলাম স্টুডিওতে। অজয় বলল আমিও যাচ্ছি।
স্টুডিওতে এসে পা মুড়ে বসে রশিদ খান প্রথম যে গলার আওয়াজটা দিল, তা অনির্বচনীয়। আমার এবং রেকর্ডিস্ট লাল্টু দাশগুপ্ত দুজনেরই মনে হল আমরা কি তরুণ বয়সের আমির খাঁ-কে শুনছি! অসাধারণ গাইল। এই হল রশিদ খান। এতটাই আত্মভোলা ছিল রশিদ খান। ওর জীবনের প্রথম রেকর্ডিংয়ে ক্লাসিকাল রাগ গেয়েছিলেন রশিদ খান। তখন ক্যাসেটের যুগ। সেই ক্যাসেট রশিদকে প্রথম পরিচয় দিয়েছিল। তারপরই রশিদ গ্রামাফোনের চুক্তিবদ্ধ শিল্পী হল। যেখানে অন্য নতুন শিল্পীরা জীবনের প্রথম রেকর্ডিং করতে জুতোর সোল খুইয়ে ফেলে, সেখানে রশিদের কোনও বিকার ছিল না। এতটাই আত্মভোলা শিল্পী ছিলেন ওস্তাদ রশিদ খান।
এরপর যখনই ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে আমায় দাদা বলে জড়িয়ে ধরেছে। কখনও ভোলেনি ওঁর সেই প্রথম গান রেকর্ডিং এর কথা। শুধু নিজের পারিশ্রমিক নিয়েই নয়, আমি কতটা পারিশ্রমিক পেলাম সেটাও খোঁজ নিত। ওঁর মতো মানুষ হবে না। এত সহজ সরল সাধাসিধে মানুষ। ভীষণভাবে মনে রেখেছিল প্রথম দিনের রেকর্ডিং-এর কথা। ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্সে আমাকে দেখে হাঁটু ছুঁয়ে প্রণাম করে জড়িয়ে ধরেছিল। বললাম 'তু তো কামাল কর দিয়া'। লোকের জানা উচিত কত সহজ সরল মানুষ ছিল রশিদ খান।"