সত্যজিৎ রায়ের জয় বাবা ফেলুনাথ থেকে শুরু করে অপর্ণা সেনের পরমা— বহু বাংলা ছবিতে দুর্গাপুজো কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপাদান হয়েছে।

বাংলা সিনেমায় দুর্গাপুজো।
শেষ আপডেট: 24 September 2025 16:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলা সিনেমা ও দুর্গাপুজো (Durga Puja)— এই দু’টি শব্দ যেন অবিচ্ছেদ্য। পুজোর আবহ, প্রতিমা দর্শন, ঢাকের শব্দ কিংবা উৎসবের ভিড়— এগুলি শুধু উৎসবের নয়, বাঙালি সংস্কৃতিরও প্রতীক। সত্যজিৎ রায়ের জয় বাবা ফেলুনাথ থেকে শুরু করে অপর্ণা সেনের পরমা— বহু বাংলা ছবিতে দুর্গাপুজো কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উপাদান হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়েও পরিচালকরা এই থিমকে তাঁদের ছবির কেন্দ্রে এনেছেন। আজ আমরা তুলে ধরছি গত কয়েক বছরের ছ’টি উল্লেখযোগ্য বাংলা ছবি, যেখানে দুর্গাপুজো কাহিনির মূল সুরে বাঁধা।
দুর্গাপুজো ঘিরে তৈরি সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত বা সাড়া ফেলে দেওয়া ছবি হল রক্তবীজ (Raktabeej)। এবার পুজোতেও রিলিজ হচ্ছে সিক্যুয়েল রক্তবীজ ২ (Raktabeej 2)। প্রথম ছবিতে গল্প বলা হয়েছে রাজনীতির আঁতুড়ঘর, প্রশাসনিক টানাপোড়েন ও সন্ত্রাসবাদের প্রেক্ষাপটে। ছবিতে দুর্গাপুজোর ভিড়, প্রতিমা দর্শন, আর শঙ্খ-উলুধ্বনির মধ্যে জড়িয়ে আছে ভয়, উত্তেজনা এবং থ্রিলারের আবহ। পরিচালক যুগল দেখিয়েছেন, দুর্গাপুজো শুধু আনন্দের প্রতীক নয়, বাস্তব সমাজে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে অন্ধকার রাজনৈতিক চালচিত্রও। বাঙালি রাষ্ট্রপতির ভূমিকায় ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় বা স্পেশাল ফোর্সের অফিসারের ভূমিকায় আবীর চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় ছিল অনবদ্য।

তিন প্রজন্মের তিন নারীর গল্প একসূত্রে বাঁধা হয়েছে এই ছবিতে। মালিনী (অপরাজিতা আঢ্য), তাঁর মা (অলোকনন্দা রায়) এবং দুই মেয়ে শিলা (সৌরসেনী মৈত্র) ও পিঙ্কি (অনন্যা সেন)— সকলে মিলিত হন তাঁদের পৈতৃক বাড়িতে দুর্গাপুজো উপলক্ষে। উৎসবের হাসিখুশি পরিবেশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে সম্পর্কের টানাপোড়েন, গোপন যন্ত্রণা আর অব্যক্ত অভিমান। এই সময় তাঁদের জীবনে আসে অভ্রদীপ দত্ত (কৌশিক সেন), এক চলচ্চিত্র নির্মাতা, যিনি তাঁদের জীবনে নতুন দিশা ও প্রশান্তির হাওয়া বইয়ে দেন। এই ছবির মাধ্যমে পরিচালক দেখিয়েছেন, দুর্গাপুজোর মিলনমেলা অনেক সময় পরিবারে লুকিয়ে থাকা দ্বন্দ্বকে প্রকাশ করে, আবার একসঙ্গে থাকার শক্তিও জোগায়।

২০১৫ সালে কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কে বিশ্বের বৃহত্তম দুর্গামূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল। সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, সেটিই অসুর ছবির পটভূমি। তবে ছবিটি কেবল উৎসবের গল্প নয়, বরং ভিন্ন মাত্রায় এক প্রেমকাহিনি। তিন বন্ধু কিগান (জিত), অদিতি (নুসরত জাহান) ও বোধি (অবির চট্টোপাধ্যায়)— তাঁদের বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার জটিল টানাপোড়েনের মধ্যে দুর্গাপুজো এখানে প্রতীকের মতো কাজ করে। পাশাপাশি এই ছবিটি ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজকে শ্রদ্ধা জানায়। দুর্গাপুজোর উৎসব আর শিল্পের অভিব্যক্তি মিশে তৈরি হয়েছে এক অন্যরকম আবহ।
‘সোনাদা’ সিরিজের দ্বিতীয় ছবি এটি। সোনাদা (অবির চট্টোপাধ্যায়), আবির (অর্জুন চক্রবর্তী) ও ঝিনুক (ঈশা সাহা) পৌঁছন ছাত্র ডোমরুপাণি দেব রায়ের পৈতৃক বাড়িতে, যেখানে পরিবারিক দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়। পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক গুপ্তধনের কাহিনি ঘিরে এগোয় রহস্য। জানা যায়, দাম্বরুপাণির প্রপিতামহ দুর্গাগতি দেব রায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের কাছ থেকে বিপুল ধনরত্ন পেয়েছিলেন। সেই গুপ্তধন খুঁজে বের করার দায়িত্ব পড়ে সোনাদার উপর। এই ছবিতে পুজোর ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে রহস্য সমাধানের চাবিকাঠি।
১৯৩১ সাল থেকে মহালয়ার ভোর সমার্থক হয়ে আছে অল ইন্ডিয়া রেডিওর মহিষাসুরমর্দিনী সম্প্রচারের সঙ্গে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মন্ত্রপাঠ বাঙালির হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। কিন্তু জরুরি অবস্থার সময় সরকার চাইছিল ভদ্রর কণ্ঠস্বরের বদলে উত্তম কুমারের কণ্ঠ ব্যবহার করতে। এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই তৈরি হয় মহালয়া। ছবিতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর চরিত্রে অভিনয় করেছেন শুভাশিস মুখোপাধ্যায় এবং উত্তম কুমারের ভূমিকায় ছিলেন যিশু। এই ছবি কেবল এক রেডিয়ো অনুষ্ঠানের ইতিহাস নয়, বরং বাঙালির আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।

একটি সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়েছিল উমা। কানাডার ইভান লেভারসেজ নামের এক ক্যান্সার আক্রান্ত বালক শেষবারের মতো ক্রিসমাস দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর জন্য শহরের মানুষরা এগিয়ে এসে আগেভাগেই বড়দিনের উৎসব আয়োজন করেছিলেন। সেই কাহিনি থেকেই জন্ম নেয় উমার গল্প। এখানে উমা (সারা সেনগুপ্ত) এক মরণাপন্ন মেয়ে, যে সুইজারল্যান্ডে বাবার (জিৎ) সঙ্গে থাকে। বাবার মুখে শোনা দুর্গাপুজোর গল্প শুনে তার ইচ্ছে হয় কলকাতায় এসে পুজো দেখার। মেয়ের শেষ ইচ্ছা পূরণে বাবা এগিয়ে আসেন এবং কলকাতার কিছু সহৃদয় মানুষের সাহায্যে তৈরি হয় এক ‘কৃত্রিম দুর্গাপুজো’। ছবিটি দেখায় উৎসব কেবল আনন্দ নয়, কখনও কখনও আশা ও ভালোবাসার প্রতীক।

অরিন্দম শীলের এই থ্রিলার-ড্রামা ছবিতে দুর্গাপুজো পটভূমি হয়ে উঠেছে রহস্যময় কাহিনির আবহ। ধনী বসাক পরিবারে মহালয়ার দিন প্রবেশ করে দুর্গা (সোহিনী সরকার) নামের এক তরুণী। তিনি গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে আসলেও ধীরে ধীরে পরিবারে সকলের আস্থা অর্জন করেন, বিশেষত মানসীর (তনুশ্রী চক্রবর্তী)। কিন্তু দুর্গা আসলে কে? তিনি কি সত্যিই নিরীহ মেয়ে, নাকি তাঁর অন্য উদ্দেশ্য আছে? দশমীর দিনেই মেলে তার উত্তর। উৎসবের আনন্দ আর নাটকীয় ঘটনার টানাপড়েন মিলিয়ে এই ছবিটি হয়ে ওঠে স্মরণীয়।
