আজ সৃজিতের জন্মদিনে তাঁরই ছবিতে তাঁরই হাতে নবকলেবরে গড়া পাঁচ সৃজিতার গল্প। জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত অভিনেত্রীকে যেমন সৃজিত এনেছেন অন্য রূপে, তেমনই মেনস্ট্রিম ছবির চকোলেট নায়িকাকে পর্দায় করে তুলেছেন সিরিয়াস অভিনেত্রী।

গ্রাফিক্স দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 23 September 2025 22:37
অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষের পর বাংলা ছবির বাঁকবদল ঘটে যে পরিচালকের হাত ধরে তিনি সৃজিত মুখোপাধ্যায়। অর্থনীতি নিয়ে পড়া প্রেসিডেন্সি কলেজ, জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়ে গেলেন টলিউডের নামকরা পরিচালক। নবীন যুগের চলচ্চিত্রকার রূপে সৃজিতের ভিতর সেই আগুন ছিল। আজ তিনি মহীরুহ। 'অটোগ্রাফ' থেকে 'লহ গৌরাঙ্গের নাম রে', ১৫ বছরের সফরে আজও তিনি টলিউডের ফার্স্টবয়।
আজ সৃজিতের জন্মদিনে তাঁরই ছবিতে তাঁরই হাতে নবকলেবরে গড়া পাঁচ সৃজিতার গল্প। জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত অভিনেত্রীকে যেমন সৃজিত এনেছেন অন্য রূপে, তেমনই মেনস্ট্রিম ছবির চকোলেট নায়িকাকে পর্দায় করে তুলেছেন সিরিয়াস অভিনেত্রী।

নন্দনা সেন
ঐতিহ্যশালী পরিবারের মেয়ে নন্দনা। বাবা নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেন ও মা নবনীতা দেবসেন। গৌতম ঘোষের 'গুড়িয়া' ছবিতে প্রথম অভিনয়ে হাতেখড়ি। নন্দনার নাম প্রচারে আসে সঞ্জয়লীলা বনশালীর 'ব্ল্যাক' ছবিতে অভিনয় করে। প্রথম বাংলা ছবি 'কালের রাখাল'। তবে বাংলা ছবিতে নায়িকার ভূমিকায় প্রথম পাদপ্রদীপের আলোয় নন্দনাকে আনেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়। ২০১০ র ছবি 'অটোগ্রাফ'। একেবারে টলিউড বাদশা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের বিপরীতে নন্দনা। সঙ্গে ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত। সৃজিতের পরিচালক হয়ে ওঠার প্রেরণা ছিলেন সত্যজিৎ রায়। তাই প্রথম ছবি 'অটোগ্রাফ' ছিল সত্যজিৎ রায়ের 'নায়ক' ছবির নির্যাসেই তৈরি। প্রসেনজিতের চরিত্রটি তেমনই এক সুপারস্টার নায়কের। অনুপম রায়ের সুরে শ্রেয়া ঘোষালের কণ্ঠে 'উঠছে জেগে সকালগুলো' গানে নন্দনার আগুন যৌবন পর্দায় ঝড় তুলেছিল। নন্দনার অভিনয় প্রতিভাকে একমাত্র বাংলা ছবিতে সফলতা দিয়েছেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়।

ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত
'রাজকাহিনি' ছবির অবিস্মরণীয় চরিত্র 'বেগমজান'। নামভূমিকায় ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত। ঋতুপর্ণ ঘোষের হাত ধরে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন ঋতুপর্ণা। তারপর সব ধারার ছবিতেই তিনি অভিনয় করেছেন। কিন্তু এক নতুন সাহসী ঋতু যেন আবিষ্কৃত হলেন সৃজিতের হাতধরে। যৌনকর্মীর চরিত্রে এমন দাপট, কোঠার মালকিন রূপে ঋতুপর্ণা নিজেকে একদম বদলে ফেলেন। কণ্ঠস্বর থেকে বাচনভঙ্গী সবেতেই অন্য ঋতু। যা করে দেখান সৃজিত। বেগমজান এতখানি জনপ্রিয়তা পায় যে রাজকাহিনির হিন্দি ভার্সনে এই চরিত্র করতে আসেন বিদ্যা বালান এবং ছবির নাম হয় 'বেগমজান'। তবু ঋতুপর্ণা ঋতুপর্ণাই। বেগমজান মানেই তিনি।
কোয়েল মল্লিক
একদম মূলধারার নায়িকা কোয়েল মল্লিককে 'হেমলক সোসাইটি' তে এনে ফেললেন সৃজিত। এ ছবি করবার সময় নিন্দুকরা বলেছিল কোয়েল পারবেন না এমন ছবি করতে। কিন্তু কোয়েলের কেরিয়ারে মাইলফলক হয়ে গেল মেঘনা সরকার চরিত্র। মেঘনা চরিত্র করে 'বিএফজেএ' পুরস্কারে সেরা অভিনেত্রীর সম্মান পান কোয়েল। সৃজিতের এই ছবি যতখানি মেনস্ট্রিম ততখানি মননশীল। দুই ধারার দর্শক কোয়েল-পরমব্রত জুটিকে আজও মনে রেখেছে
'এখন অনেক রাত,তোমার কাঁধে আমার নিঃশ্বাস/
আমি বেঁচে আছি তোমার ভালোবাসায়'।

স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়
সাহিত্যিক শঙ্করের সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’ অবলম্বনে ১৯৬৮-তে নির্মিত উত্তমকুমারের কালজয়ী ছবি ‘চৌরঙ্গী’র রিমেক ‘শাহজাহান রিজেন্সি’ যখন সৃজিত মুখোপাধ্যায় বানিয়ে ফেললেন তখন এই ছবি যেন কাহিনির অন্তরাত্মাকে জাগিয়ে তুলল। ছয়ের দশকের ছবির অবিকল রিমেক সৃজিত করেননি। বরং আধুনিক করে চরম সত্যের সামনে দর্শককে দাঁড় করালেন সৃজিত। স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় এই ছবির এক প্রধান প্রহেলিকা। যে চরিত্রে আমরা আগে দেখেছিলাম সুপ্রিয়া দেবীকে। কমলিনীর লাস্য থেকে সাহসী জবাবে স্বস্তিকা ছাড়া ভাবাই যায় না। বিশেষত কমলিনী স্বস্তিকা আর মিসেস পাকড়াশীর চরিত্রে মমতা শঙ্করের বাদানুবাদ যেভাবে পর্দায় রচনা করলেন সৃজিত, তা কাল্ট।

জয়া আহসান
জয়া আহসান আজ দু পার বাংলাতেই সফল নায়িকা। তবে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের 'এক যে ছিল রাজা' ছবিতে মৃন্ময়ী দেবীর চরিত্রে জয়া অদ্বিতীয়া। ভাওয়াল রাজার অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে উত্তমকুমারের 'সন্ন্যাসী রাজা' ছবির হয়েছিল। কিন্তু সেখানে সত্যেন ঘটনা আড়াল করা হয়েছিল রাজাকে নিষ্কলুষ দেখাতে। সৃজিত সেখানেই সাহস দেখালেন। রাজার বোন মৃন্ময়ী প্রথম গুরুত্ব পেলেন সৃজিতের ছবি। যে চরিত্রটি উত্তমের ছবিতে জায়গা পায়নি।
মৃণ্ময়ী দেবীর যৌবন থেকে জরা সবটাই দুরন্ত ভাবে জয়া পেশ করেছেন। জয়া আহসানের শ্রেষ্ঠ চরিত্রের মধ্যে রাজার ভরসার বোন মিনু থাকবেই। জয়া আহসানের এই চরিত্র দেখে দুই বাংলার মানুষ তাঁর জয় জয়কার করে আজও।

প্রতিটি নায়িকা আরও বহু পরিচালকের ছবিতে বহু চরিত্র করলেও সৃজিতের এই চরিত্রগুলিতে তাঁরা আইকনিক হয়ে রইবেন।