মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়, কোনও দিনই রেডিওর বাইরে কাজ করেননি। তিনি চিরকালই রেডিওর মগ্ন মৈনাক।

মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়, তখন এখন
শেষ আপডেট: 19 May 2025 19:42
'নিঝুম অন্ধকারে তোমাকে চাই
রাতভোর হলে আমি তোমাকে চাই
সকালের কৈশোরে তোমাকে চাই
সন্ধের অবকাশে তোমাকে চাই...'
ছয় সাতের দশকে প্রতিটি ঘরে ঘরে একান্ত আপন ছিল রেডিও। সংবাদ থেকে বিনোদন, সকাল থেকে রাত, রেডিও ছাড়া ভাবতেই পারতেন না তখনকার মানুষেরা। যা আজ রূপকথার গল্প মনে হবে। রেডিওর স্বর্ণযুগ থেকে নয়ের দশক অবধিও এক পুরুষ কণ্ঠ ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল বঙ্গজীবনে। তিনি ঘোষক, সঞ্চালক মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়। গত ১৬ মে শুক্রবার নীরবে প্রয়াত হলেন এই বর্ষীয়ান শিল্পী। যে মানের শিল্পী উনি ছিলেন শেষ বিদায়ে সেই মর্যাদা উনি পেলেন না। যদিও জীবদ্দশাতেই তিনি বিনোদন মাধ্যম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। কিন্তু তাঁর সময়ের শ্রোতাদের কাছে মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়, আজও নস্টালজিক নাম।

মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়, নামটার বৈশিষ্ট্য তিনি রেডিওতেই চিরকাল ছিলেন। আকাশবাণীর অন্যান্য ঘোষক, সঞ্চালক, সংবাদ পাঠকরা অন্য মাধ্যম দূরদর্শন বা মঞ্চকেও বেছে নিয়েছিলেন রোজগারের তাগিদে। স্বভাবতই তাঁরা বেশি জনপ্রিয় মুখ হয়ে ওঠেন রেডিওর বাইরে। কিন্তু মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়, কোনও দিনই রেডিওর বাইরে কাজ করেননি। তিনি চিরকালই রেডিওর মগ্ন মৈনাক। প্রচারের পাদপ্রদীপে আসতে তিনি কখনও চাননি। শুধুমাত্র রেডিও থেকে আপন হয়ে ওঠা একজন মানুষের এই কৃতিত্ব, অনেকের থেকে বেশি। রেডিও কিংবদন্তি মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলা হলেও, তা অক্ষুন্ন হয় না।
আকাশবাণীর ঘোষক বা সঞ্চালকদের পুরুষালি ভারী কন্ঠ হবে এতো চিরাচরিত ব্যাপার ছিল। কিন্তু মিহির তাঁর সঞ্চালনায় রাখতেন প্রচুর হোমওয়ার্ক। তাঁর সঞ্চালনায় যে কোন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান সব শ্রেণীর দর্শকদের মন ভরিয়ে দিত। মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাই বলা হত রেডিওর চলমান এনসাইক্লোপেডিয়া ।

নয়ের দশকে রেডিওতে কিন্তু বিপ্লব ঘটিয়েছিল এফ এম। বিবিধ ভারতী, কলকাতা ক, কলকাতা খ চ্যানেলের অনুষ্ঠান শোনা ছেড়ে দেওয়া বাঙালি হঠাৎই সে সময় রেডিওমুখো হয়েছিল। 'সন্তোষ রেডিও'র জনপ্রিয়তা নয়ের দশকে খুব বেড়েছিল। প্রতিদিন 'আজ রাতে'র অনুষ্ঠান ভীষণ ভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। আর যেদিন সঞ্চালক হিসেবে মিহির বন্দ্যোপাধ্যায় থাকতেন, সেদিন অনুষ্ঠানের মান আরও বেড়ে যেত। বিশেষত, কোনও স্বর্ণযুগের গান শোনানোর সময় সেই গান তৈরির গল্প এত সহজ করে বলতেন তিনি যা শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যেত। আঙুরবালা, ইন্দুবালা, কাননবালা থেকে হেমন্ত, শ্যামল, সন্ধ্যা, মান্না হয়ে ইন্দ্রাণী, হৈমন্তী, সুমনের গানে আলাদা মাত্রা যোগ করত মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়ের বলা তথ্যের সংযোজন। শ্রোতাবন্ধুরা তাঁর কণ্ঠ শুনতে রেডিওর পাশে কান খাড়া করে রাখতেন। বাংলা সিনেমার পুরোনো গানের অনুষ্ঠানগুলোতে তাঁর উপস্থাপনার ধরণ শ্রোতাদের এক আলাদা আবেশে ডুবিয়ে রাখত। তবে এই সময়ে দাঁড়িয়ে জীবদ্দশাতেই তিনি বুঝে যান তাঁর যুগ শেষ, তাই তাঁকে আর কিছুই টানত না।

মৃত্যুর কয়েক বছর আগে মিহির বন্দ্যোপাধ্যায় বই লিখে যান 'স্মৃতিকোঠায় আকাশবাণী'। আজ সেই মানুষ নিজেই স্মৃতির কোঠায় জায়গা করে নিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়, একটা যুগ। অথচ দুর্ভাগ্য আজও বিশাল সংখ্যক মানুষ এই কণ্ঠশিল্পীর নাম জানেন না, তাঁর কণ্ঠ শোনেননি। মিহির বন্দ্যোপাধ্যায় কখনও রেডিওর বাইরে দৃশ্যমাধ্যমে এলেন না বলেই কি তাঁকে মানুষ মনে রাখল না। তবে এ দৈণ্যতা মিহির বন্দ্যোপাধ্যায়ের নয়, যাঁরা গুণীর কদর করতে পারল না তাঁদের।