
শেষ আপডেট: 5 May 2022 19:21
চৌত্রিশ বছরের ভিক্টোরিয়া আর তেষট্টি বছরের রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore)। ‘অবোধ্য’ সম্পর্ক, অন্তত সাধারণ মানুষের কাছে। বিতর্কও কম নয় আর্জেন্টাইন লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর (Victoria Ocampo) সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সখ্য নিয়ে। গবেষকদের অনেকের মতে, সম্পর্কটি নিখাদ প্রেমের।
সামনেই ২৫শে বৈশাখ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী। তার আগেই শুক্রবার দেশজুড়ে মুক্তি পাচ্ছে ‘থিঙ্কিং অফ হিম’। রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পোর সম্পর্ক নিয়ে সিনেমা। আর্জেন্টিনার স্বাধীন পরিচালক পাবলো সিজার ওই সম্পর্কের রসায়নকে সেলুলয়েডে বুনেছেন। রবীন্দ্রনাথের (Rabindranath Tagore) ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ভিক্টর ব্যানার্জি (Victor Banerjee)।

ছবি শুরু হয় আর্জেন্টিনার ২০১৬ সালের প্রেক্ষাপটে। দেখা যায় একজন ভূগোলের শিক্ষক লাইব্রেরীতে রবীন্দ্রনাথের বই খুঁজতে আসেন। সেখানকার কর্মী তাঁকে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বই 'সান ইসিদ্রোর উপত্যকায় ঠাকুর' বা 'সান ইসিদ্রোর উপত্যকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ বইটি পড়তে বলেন। সেখান থেকেই শুরু হয় ছবির পথচলা। বর্তমান ও অতীত। তাই রঙিন ও সাদাকালো, দু’টি রঙে সমান্তরালভাবে চলতে থাকে দু’টি গল্প।
১৯২৪ সালে ৬ নভেম্বর পেরুর স্বাধীনতা সংগ্রামের শতবর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পেরু যাত্রায় সমুদ্র পথে অসুস্থ হয়ে পড়েন রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে চিকিৎসা ও বিশ্রামের জন্য বুয়েনস আইরেসে থামতে হয়েছিল। ভিক্টোরিয়া জানতে পারেন যে কবির শরীর খারাপ। ততদিনে তিনি গীতাঞ্জলীর ফরাসি অনুবাদ পড়ে নোবেলজয়ীর ভক্ত হয়ে গেছেন। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো কোনোভাবেই এ সুযোগ হাতছাড়া করে চাননি। একদিন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করা জন্য হোটেল প্লাসাতে চলে আসেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো৷ ভিক্টোরিয়ার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর সেক্রেটারি এলমহার্স্ট তাঁকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে দেন।
এরপর অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে (Rabindranath Tagore) হোটেল থেকে তিনি নিয়ে গেলেন তাঁর এক আত্মীয়ের বাড়ি 'মিলারিওতে'। বাড়ির উত্তর দিক দিয়ে বয়ে চলেছে প্লাতা নদী। ওই বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ কাটিয়েছিলেন প্রায় দু’মাস।
রবীন্দ্রনাথ ও ওকোম্পোর কাহিনীর সঙ্গেই সমান্তরালভাবে চলছে ওই আর্জেন্টাইন শিক্ষকের গল্প। ছোটবেলায় তাঁর সঙ্গে ঘটা অনভিপ্রেত ঘটনার কারণে একধরণের মানসিক কষ্টে ভুগছেন তিনি। প্রায়শই দুঃস্বপ্নের মতো ছোটবেলার বিভিন্ন ঘটনা ভেসে ওঠে তাঁর চোখের সামনে। যাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় হ্যালুসিনেসন। যেকারণে ওষুধও খেতে হয় তাঁকে। তিনি রবীন্দ্রনাথের দর্শনে মুগ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নেন শান্তিনিকেতন আসার। এবং একদিন তিনি শান্তিনিকেতন এসে পৌঁছন। এবং সেখানেই দেখা হয়, কমলির সঙ্গে। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাইমা সেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথমে সাতদিন থাকার কথা ছিল আর্জেন্টিনায়। তারপর সেটা বাড়তে বাড়তে এসে দাঁড়ায় বাহান্ন দিনে। সান ইসিদ্রোর সেই বাড়ি মিলারিওর বারান্দায় বসে রবীন্দ্রনাথ এবং ভিক্টোরিয়া একসাথে নদী দেখতেন। ছবিতে দেখানো হয়েছে, ভিক্টোরিয়াই রবীন্দ্রনাথের কবিতার ওপর আঁকিবুকি দেখে ছবি আঁকার পরামর্শ দেন। এবং উৎসাহ জোগান। রবীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়ার নাম দেন বিজয়া।

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা হয় মাত্র দু'বার। ১৯২৪ সালে আর্জেন্টিনায় দেখা হওয়ার পর, আর প্যারিসে। ১৯৩০ সালে। সেবার প্যারিসের বিখ্যাত পিগাল গ্যালারিতে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে দেন ভিক্টোরিয়া। এরপর দেখা না হলেও যোগাযোগ কিন্তু বন্ধ ছিল না। প্রায় নিয়মিতই একজন আরেকজনকে চিঠি লিখতেন। টেলিগ্রামে বার্তা আদান-প্রদান হতো।
রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের মৃত্যুসংবাদ ভিক্টোরিয়া পান তাঁর গাড়িতে বসে, রেডিওর সংবাদে। তবে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরই রেডিওতে খোল–করতাল বাজিয়ে হেঁড়ে গলায় ‘তোমায় হৃদমাঝারে রাখব’ গান বাজানো হয়েছিল কী? পরিচালক কী ভেবে ছবিতে ওই দৃশ্যের ব্যবহার করলেন বোধগম্য হল না।
রবি ঠাকুরের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অভিনেতা ভিক্টর ব্যানার্জি। তাঁর অভিনয় ভালো। তবে অভিব্যাক্তিতে গভীরতার যথেষ্ট অভাব মনে হয়েছে। ভিক্টোরিয়ার চরিত্রে এলিওনোরা ওয়েক্সলার চমৎকার অভিনয় করেছেন। আর্জেন্টাইন শিক্ষকের ভূমিকায় হেক্টর বোর্দোনির অভিনয়ও বেশ ভালো। স্বল্প সময়ে রাইমার উপস্থিতিও স্নিগ্ধ।

ছবির সিনেমাটোগ্রাফি আহামরি কিছু নয়। তবে রঙ বেশ ভালো। মেক আপ এবং কস্টিউম যথাযত। তবে ছবিতে অতিরিক্ত জাম্পকাট বিরক্তিকর লাগতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের দেশে তাঁকে জানতে এসে কমলি, ওরফে রাইমার প্রেমে পড়ে যান আর্জেন্টিনার শিক্ষক। কিন্তু তাঁকে ফিরে যেতে হয়। শেষদৃশ্য। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর আর্জেন্টিনা থেকে আসা একটি টেলিগ্রাম পান রথীন্দ্রনাথ। যাতে লেখা ছিল ‘থিঙ্কিং অফ হিম’। ভিক্টোরিয়া ওকম্পোর শেষ টেলিগ্রাম।
বিচ্ছিন্নতার বিষে উত্তাল নর্থ-ইস্ট! এক অন্য ‘ইন্ডিয়া’র গল্প নিয়ে আসছেন আয়ুষ্মান